যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে গোলান মালভূমি নিয়ে আলোচনার সময় সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা মজা করে বলেছিলেন, ইসরায়েলকে গোলান মালভূমির বদলে নিউ জার্সি দিয়ে দেওয়া হোক। তাঁর যুক্তি ছিল, গোলান মালভূমির মালিকানা ট্রাম্পের নেই, কিন্তু নিউ জার্সি যুক্তরাষ্ট্রের অংশ।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে নিউইয়র্কে আটলান্টিক কাউন্সিলের এক আলোচনায় আল-শারা ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর সাম্প্রতিক বৈঠকের ওই কথোপকথনের কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ইসরায়েলের গোলান মালভূমির ওপর সার্বভৌমত্বকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে প্রশ্ন করেছিলেন।
আল-শারা বলেন, তিনি ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘ইসরায়েলিদের নিউ জার্সি দিয়ে দেন না কেন?’ তাঁর ব্যাখ্যা ছিল, ট্রাম্প গোলান মালভূমির মালিক নন যে সেটি ইসরায়েলকে দিয়ে দেবেন। কিন্তু নিউ জার্সি যুক্তরাষ্ট্রের অংশ। পাশাপাশি তিনি রসিকতা করে বলেন, নিউ জার্সিতে অনেক ডেমোক্র্যাট বাস করেন এবং তারা ট্রাম্পকে ভোট দেন না। তাই ইসরায়েলকে নিউ জার্সি দিয়ে দেওয়া ট্রাম্পের জন্য ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে।
তবে এই মন্তব্যের পেছনে আল-শারা একটি গুরুতর রাজনৈতিক প্রশ্নও তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, কোনো দেশের প্রেসিডেন্ট একটি ভূখণ্ড শাসন করতে পারেন, কিন্তু সেই ভূখণ্ডের ব্যক্তিগত মালিক নন। একইভাবে একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের অন্য দেশের ভূখণ্ড অন্য রাষ্ট্রকে দেওয়ার অধিকারও নেই।
গোলান মালভূমি নিয়ে সিরিয়ার অবস্থান

আল-শারা পরে গোলান মালভূমি নিয়ে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, এই ভূখণ্ড তার জনগণের এবং কোনো মার্কিন বা সিরীয় প্রেসিডেন্টেরই এটি অন্য কারও হাতে তুলে দেওয়ার অধিকার নেই।
১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল সিরিয়ার কাছ থেকে গোলান মালভূমির বড় একটি অংশ দখল করে নেয়। ১৯৮১ সালে ইসরায়েল ওই এলাকায় নিজেদের আইন ও প্রশাসন প্রয়োগ করে। বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার বা ৪৬৩ বর্গমাইল এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গোলান মালভূমির অবস্থান নিয়ে ইসরায়েলের দাবির স্বীকৃতি ব্যাপক নয়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ৪৯৭ নম্বর প্রস্তাবে গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলের আইন, বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসন সম্প্রসারণকে আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে অকার্যকর হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে এবং এলাকাটিকে দখল করা সিরীয় ভূখণ্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে ২০১৯ সালে গোলান মালভূমির ওপর ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেন। এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করেছিল।
সিরিয়া-ইসরায়েল আলোচনা নিয়েও মন্তব্য
আল-শারা জানান, অতীতে সিরিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি আলোচনায় বেশ অগ্রগতি হয়েছিল। তাঁর দাবি, দুই পক্ষের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ বিষয়ে সমঝোতা হয়ে গিয়েছিল। পরে ইসরায়েল আলোচনার অবস্থান থেকে সরে যায় অথবা নতুন কিছু শর্ত যুক্ত করে।
ট্রাম্পের সঙ্গে নিজের সম্পর্ককে আল-শারা ‘খুবই অনন্য’ হিসেবে বর্ণনা করেন। একই সঙ্গে সিরিয়ার ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্তের জন্য ট্রাম্পের প্রতি সমর্থনের কথাও জানান তিনি।
গাজা যুদ্ধের প্রসঙ্গ
ইসরায়েলে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার প্রসঙ্গেও আল-শারাকে প্রশ্ন করা হয়। তিনি হামলায় নিহত বেসামরিক মানুষের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন। তবে তাঁর বক্তব্য, ইতিহাসের একটি মাত্র ঘটনা দিয়ে সিরিয়ার সঙ্গে বৃহত্তর বৈদেশিক নীতি নির্ধারণ করা উচিত নয়।
গাজা যুদ্ধের প্রসঙ্গে আল-শারা বলেন, সংঘাতে ৭০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। তাঁর বক্তব্যে একই সঙ্গে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত এবং সিরিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন উঠে আসে।
আল-শারার নিউ জার্সি নিয়ে মন্তব্যটি রসিকতার মোড়কে দেওয়া হলেও এর ভেতরে গোলান মালভূমি নিয়ে সিরিয়ার দীর্ঘদিনের অবস্থানই স্পষ্ট হয়েছে—কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি বা সিদ্ধান্তের মাধ্যমে একটি ভূখণ্ডের মালিকানা নির্ধারিত হয় না। তাঁর বক্তব্যে তাই ট্রাম্পের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের পাশাপাশি সিরিয়ার ভূখণ্ডগত দাবির বিষয়টিও সামনে এসেছে।












