যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে সালগাদো পরিবারের বাড়িটি ছিল বহু বছর ধরে আনন্দ-উৎসবের কেন্দ্র। জন্মদিন, ছুটির দিন কিংবা পারিবারিক কোনো আয়োজন—তিন ছেলে ও ভবিষ্যৎ নাতি-নাতনিদের নিয়ে বড় পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে রাখার স্বপ্ন থেকেই বাড়িটি তৈরি করেছিলেন লোরেঞ্জো সালগাদো আরাউহো। মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর পর নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করে ধীরে ধীরে অর্থ সঞ্চয় করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই বাড়িই একসময় হয়ে ওঠে শোকের স্থান।
গত ৭ জুলাই কর্মস্থলে যাওয়ার পথে একটি গাড়ি চালানোর সময় অভিবাসন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইসিই) এক এজেন্টের গুলিতে নিহত হন লোরেঞ্জো সালগাদো আরাউহো। তার বয়স, পেশা বা অভিবাসন-সংক্রান্ত অবস্থার বাইরে পরিবারটির কাছে তিনি ছিলেন এমন একজন বাবা, যিনি তিন ছেলের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে জীবনের বড় একটি অংশ পরিশ্রম করে কাটিয়েছেন।
ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ জানায়, সালগাদো আরাউহো অনিবন্ধিত অভিবাসী ছিলেন এবং কর্মকর্তাদের জন্য হুমকি তৈরি করেছিলেন। বিভাগের ভাষ্য অনুযায়ী, একজন কর্মকর্তা আত্মরক্ষার্থে গুলি চালান। তবে নিহত ব্যক্তির সঙ্গে থাকা যাত্রীরা বলেছেন, সে সময় কর্মকর্তারা কোনো বিপদের মধ্যে ছিলেন না। ঘটনাটির সময় সংশ্লিষ্ট এজেন্টদের শরীরে ক্যামেরাও ছিল না।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে—হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, ওই দিন এজেন্টরা যে ব্যক্তিকে খুঁজছিলেন, সালগাদো আরাউহো তিনি ছিলেন না। ফলে তার মৃত্যুকে ঘিরে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
হ্যারিস কাউন্টির জেলা অ্যাটর্নি শন টিয়ারি জানিয়েছেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা হবে কি না, তা একটি গ্র্যান্ড জুরি নির্ধারণ করবে। পরিবারের পক্ষে আইনজীবী ডেভিড দোনাত্তি জানিয়েছেন, তারা এ ঘটনায় আইনি দাবি জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

যে ভয় প্রতিদিন সঙ্গে নিয়ে কাজে যেতেন
লোরেঞ্জো সালগাদো জুনিয়র, ২৭, বলেন, অভিবাসী পরিবারগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় ভয়গুলোর একটি হলো—কাজে যাওয়া প্রিয় মানুষটি আর বাড়িতে ফিরবেন কি না।
তার পরিবারের ক্ষেত্রেও সেই ভয় নতুন ছিল না। বাবাকে আটক করা হতে পারে, কয়েক দিন তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাবে না—এমন আশঙ্কা আগে থেকেই ছিল। কিন্তু পরিবারের কল্পনায়ও ছিল না যে সেই ভয় একদিন বাবাকে চিরতরে হারানোর বাস্তবতায় পরিণত হবে।
বাবার মৃত্যুর পর দুই ভাই রোনাল্ডো সালগাদো, ২৯, এবং লোরেঞ্জো জুনিয়র নিজেদের কণ্ঠকে বৃহত্তর অভিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্নে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
রোনাল্ডো ইতিমধ্যে রাজনীতিকদের পাশে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেছেন। তিনি ও তার ভাই টেলিভিশন সংবাদ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন এবং কংগ্রেসের একটি ফোরামেও নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। রোনাল্ডোর লক্ষ্য এখন অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে এমন আইন প্রণয়নের জন্য কাজ করা, যা অভিবাসী সম্প্রদায়ের সুরক্ষা বাড়াবে।
বাবাকে হারানোর ক্ষোভকে তিনি পরিবর্তনের শক্তিতে পরিণত করতে চান। তার ভাষায়, এখন থেমে যাওয়ার সুযোগ তিনি দেখছেন না। বৈঠক, সাক্ষাৎকার কিংবা যেকোনো জনপরিসরের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বাবার নাম মানুষের সামনে তুলে ধরতে চান। একই সঙ্গে তিনি চান, তার বাবার জীবনের গল্প, তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা এবং অভিবাসী পরিবারগুলোর অভিজ্ঞতা নিয়ে আরও আলোচনার সৃষ্টি হোক।
প্রতিদিন ফিরে যান মৃত্যুর স্থানে
বাবার মৃত্যুর ঘটনাটি রোনাল্ডোর জীবনে কেবল রাজনৈতিক বা আইনি লড়াইয়ের বিষয় হয়ে থাকেনি। তিনি প্রায় প্রতিদিনই সেই স্থানে যান, যেখানে তার বাবাকে গুলি করা হয়েছিল।

সেখানে গিয়ে প্রতিদিনই নতুন মানুষের সঙ্গে তার দেখা হয়। কেউ আশপাশের বাসিন্দা, আবার কেউ দূরবর্তী স্থান থেকে আসা পথচারী। তারা নিজেদের অভিবাসন-জীবনের গল্প বলেন, হারানো স্বজনদের কথা জানান। অনেকেই রোনাল্ডো ও তার ভাইদের মধ্যে নিজেদের সন্তানদের ছায়া দেখতে পান। আবার সালগাদো আরাউহোর মধ্যে কেউ কেউ নিজের বাবার প্রতিচ্ছবি খুঁজে পান।
ঘটনাস্থলের কাছে গড়ে উঠেছে একটি অস্থায়ী স্মৃতিসৌধও। স্থানীয় কয়েকজন মানুষ সেটির যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব নিজেরাই নিয়েছেন। কেউ ফুলে পানি দেন, কেউ খাবার নিয়ে সেখানে বসে থাকেন, দিনের শেষ পর্যন্ত স্মৃতিসৌধটির পাশে সময় কাটান।
এভাবে একটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোক ধীরে ধীরে বৃহত্তর একটি সম্প্রদায়ের সম্মিলিত স্মৃতিতে পরিণত হচ্ছে।
একজন বাবার রেখে যাওয়া স্বপ্ন
সালগাদো পরিবারের গল্পের কেন্দ্রে শুধু একটি গুলির ঘটনা নয়; আছে একজন অভিবাসী বাবার দীর্ঘ জীবনের সংগ্রামও।
মেক্সিকো থেকে তিন দশকেরও বেশি সময় আগে স্ত্রীকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন লোরেঞ্জো সালগাদো আরাউহো। নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করে তিনি অর্থ সঞ্চয় করেছিলেন। তার স্বপ্ন ছিল এমন একটি বাড়ি তৈরি করা, যেখানে তার তিন ছেলে এবং ভবিষ্যতের নাতি-নাতনিরা একসঙ্গে মিলিত হতে পারবে।
সেই স্বপ্নের বাড়িই এখন সন্তানদের কাছে বাবার স্মৃতির সবচেয়ে বড় প্রতীক।
রোনাল্ডোর কাছে তার বাবার উত্তরাধিকার শুধু একটি বাড়ি নয়। তিনি মনে করেন, সারাজীবন পরিশ্রম করে সন্তানদের জন্য ভালো জীবন নিশ্চিত করার যে চেষ্টা তার বাবা করেছিলেন, সেটিই তাকে এখন সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দিচ্ছে।
তার ভাষায়, বাবাকে স্মরণ করার এই প্রচেষ্টা একজন পরিশ্রমী মানুষকে সম্মান জানানোর পাশাপাশি তার সন্তানদের জন্য রেখে যাওয়া গর্বের জায়গাটিকেও বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা।
সালগাদো ভাইদের লড়াই তাই শুধু তাদের বাবার মৃত্যুর বিচার চাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অভিবাসী পরিবারগুলোর নিরাপত্তা, আটক হওয়ার ভয়, পরিবারের সদস্যদের বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকাণ্ডের জবাবদিহির প্রশ্ন।
একসময় যে পরিবারটি একটি বড় বাড়িতে আনন্দ ভাগ করে নিত, সেই পরিবারের দুই তরুণ এখন তাদের ব্যক্তিগত শোককে জনপরিসরের আলোচনায় নিয়ে এসেছেন। তাদের লক্ষ্য—বাবার নাম যেন হারিয়ে না যায় এবং তার মৃত্যুকে ঘিরে যে প্রশ্নগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলো যেন চাপা পড়ে না যায়।












