মিয়ানমারে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে ১০০ দিনেরও বেশি সময় আটক থাকার পর মুক্তি পেয়েছেন অস্ট্রেলীয় ব্যবসায়ী ইয়ে খাউং কিয়াও, যিনি ড্যানি নামেও পরিচিত। তিনি মিয়ানমারে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের (অ্যামচ্যাম) নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
মিয়ানমারের একটি আইনি সূত্র বুধবার জানিয়েছে, ইয়াঙ্গুনের একটি আদালতের সিদ্ধান্তের পর তাকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তবে আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে, অভিযোগ খারিজ বা প্রত্যাহার করেছে, নাকি তাকে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—এ বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
মামলার বিষয়ে অবগত ওই আইনি কর্মকর্তা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এ তথ্য জানিয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ইয়াঙ্গুনে ইয়ে খাউং কিয়াওয়ের মামলার কার্যক্রম শেষ হয়েছে।
মিয়ানমারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ভারপ্রাপ্ত পুলিশ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সো লিন অংও মঙ্গলবার আদালতে মামলার কার্যক্রম শেষ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে তিনি মামলার রায় বা মুক্তির কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাননি।
ইয়ে খাউং কিয়াও এবং একই মামলায় অভিযুক্ত আরও দুই ব্যক্তি অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তাদের দাবি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন।
ইয়ে খাউং কিয়াওকে গত জুনে আটক করা হয়। প্রায় একই সময়ে অ্যামচ্যামের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও মার্কিন ব্যবসায়ী অ্যাডাম কাস্তিলোকেও আটক করা হয়েছিল। কাস্তিলোকে গত সপ্তাহে মুক্তি দিয়ে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই মিয়ানমার থেকে বহিষ্কার করা হয়।
অ্যামচ্যামের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ কাস্তিলো, ইয়ে খাউং কিয়াও এবং সাবেক বোর্ড সদস্য মুনিমুল ইসলামের বিরুদ্ধে আস্থাভঙ্গ ও সংগঠনের সম্পদ অপব্যবহারের অভিযোগ আনে। অভিযোগের কেন্দ্রে ছিল ওয়াশিংটনভিত্তিক লবিং প্রতিষ্ঠান মার্কারি পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের সঙ্গে করা ৩ লাখ ডলারের একটি চুক্তি।
মুনিমুল ইসলাম বর্তমানে মিয়ানমারের বাইরে বসবাস করছেন এবং তাকে আটক করা হয়নি।
অ্যামচ্যাম নামে পরিচিত সংগঠনটির অভিযোগের প্রধান বিষয় ছিল কাস্তিলোর প্রেসিডেন্ট থাকাকালে ‘ইউএস-বার্মা ইকোনমিক ফোরাম’ নামে একটি লবিং সংগঠন প্রতিষ্ঠা এবং ২০২৪ সালে মার্কারি পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের সঙ্গে করা চুক্তি।
২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অ্যামচ্যামের প্রেসিডেন্ট ছিলেন কাস্তিলো। সংগঠনটির মে মাসে প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, তিনি অ্যামচ্যামের নাম ব্যবহার করে যথাযথ অনুমোদন ছাড়া অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন। সংগঠনটির দাবি ছিল, পরিচালনা পর্ষদ ওই চুক্তির অনুমোদন দেয়নি এবং চুক্তির আওতায় কোনো অর্থ বা সেবা পায়নি। বিষয়টি নিরীক্ষকদের কাছেও জানানো হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তবে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের হাতে আসা অ্যামচ্যামের কিছু নথি ওই বার্ষিক প্রতিবেদনের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক তথ্য তুলে ধরে।
একটি স্বাক্ষরিত বোর্ড সিদ্ধান্তে দেখা যায়, পরিচালনা পর্ষদ লবিং উদ্যোগটি অনুমোদন করেছিল। একই সিদ্ধান্তে মার্কারিকে নিয়োগের অনুমতিও দেওয়া হয় এবং মুনিমুল ইসলামের প্রতিষ্ঠান ‘মিসফিট টেকনোলজিস’ পৃষ্ঠপোষকতা দেবে বলেও সম্মতি দেওয়া হয়েছিল।
অ্যামচ্যামের বর্তমান নির্বাহী পরিচালক মিয়াট ফিউ থে ওই বোর্ড সিদ্ধান্তকে জাল নথি বলে দাবি করেছেন। তবে সংগঠনটির ওয়েবসাইটে থাকা অন্যান্য নথিতে ওই ব্যবস্থার বিষয়ে পরিচালনা পর্ষদ অবগত ছিল বলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
মিসফিট টেকনোলজিসের এক কর্মী পরিচয় গোপন রাখার শর্তে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে মিয়ানমার থেকে সরাসরি অর্থ পরিশোধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। এ কারণে মিসফিটের যুক্তরাষ্ট্রের কার্যালয়ের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করা হয় বলে তিনি জানান।
মার্কারি পাবলিক অ্যাফেয়ার্সও যুক্তরাষ্ট্রের লবিং প্রকাশ-সংক্রান্ত আইনের অধীনে ওই অর্থ পরিশোধের তথ্য মার্কিন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিল।
ইয়ে খাউং কিয়াওয়ের বিরুদ্ধে কথিত আর্থিক অনিয়মে তার সুনির্দিষ্ট ভূমিকা কী ছিল, সে বিষয়টিও পুলিশি অভিযোগে স্পষ্ট করা হয়নি।
মিয়ানমারে বর্তমানে গৃহযুদ্ধ চললেও দেশটির সামরিক-সমর্থিত সরকার ইয়ে খাউং কিয়াওয়ের মুক্তি নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। ইয়াঙ্গুনের প্যাবেডান এলাকার যে আদালতে তার বিচার চলছিল, সেখানকার কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ স্টেশনের কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি। মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ সাধারণত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কাছে এ ধরনের মামলায় বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে না।
অভিযুক্ত তিন ব্যক্তির সমর্থকেরা শুরু থেকেই অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করে আসছেন। তাদের বক্তব্য, মামলায় উত্থাপিত অভিযোগের সঙ্গে থাকা নথিপত্রের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে এবং কিছু দলিল অভিযোগের বিপরীত তথ্যই তুলে ধরে।
এদিকে অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মিয়ানমারে আটক এক অস্ট্রেলীয় নাগরিককে তারা কনস্যুলার সহায়তা দিয়েছে। তবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কারণে ওই নাগরিকের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি মন্ত্রণালয়।
ইয়ে খাউং কিয়াওয়ের মুক্তির মধ্য দিয়ে মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের সমাপ্তি হলেও তাকে কেন মুক্তি দেওয়া হলো এবং তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের আইনি পরিণতি কী হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।












