মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে আতিথ্য দিয়েছেন। দিনভর সামরিক কুচকাওয়াজ, যুদ্ধবিমানের মহড়া, আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা এবং নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে শিকে স্বাগত জানানো হলেও এই জাঁকজমকের আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার গভীর কৌশলগত ও বাণিজ্যিক উত্তেজনা স্পষ্ট ছিল।
শির সফরে বাণিজ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে, তা নৈশভোজে অতিথিদের তালিকাতেও ফুটে ওঠে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। তাদের মধ্যে ছিলেন টেসলার ইলন মাস্ক, অ্যাপলের টিম কুক, এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং এবং ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যান।
হোয়াইট হাউসের বাইরে অবশ্য পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ট্রাম্প ও তাঁর স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্প যখন শি ও তাঁর স্ত্রী পেং লিয়ুয়ানকে নৈশভোজে স্বাগত জানাচ্ছিলেন, তখন বাইরে বিক্ষোভ করেন অনেকে। বিক্ষোভকারীরা ‘শি জিনপিং স্বাগত নন’ এবং ‘হংকংকে মুক্ত করো’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার দিনভর ছিল নানা আনুষ্ঠানিক আয়োজন। ট্রাম্প বলেন, তিনি ও শি আলোচনায় ‘অসাধারণ অগ্রগতি’ করেছেন। শির সম্মানে সামরিক কুচকাওয়াজ, যুদ্ধবিমান উড্ডয়ন এবং হোয়াইট হাউসের নতুন হেলিপ্যাড ঘুরিয়ে দেখানোর মতো আয়োজন করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
নৈশভোজে ট্রাম্প বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট শি এবং আমি দুজনেই বুঝি, আমরা ভিন্ন দুটি ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করি। কিন্তু আমাদের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক টিকে আছে।’
তবে শির বক্তব্য ছিল তুলনামূলকভাবে সংযত এবং একই সঙ্গে বার্তাবহুল। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করার আহ্বান জানান। শি বলেন, ‘চীন ও যুক্তরাষ্ট্রকে দায়িত্বশীল বৃহৎ রাষ্ট্র হিসেবে কাজ করতে হবে।’
উপহারে মার্কিন প্রতীক
নৈশভোজে ট্রাম্প শিকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় প্রতীক সাদা মাথার ঈগলের একটি বিশেষভাবে তৈরি মূর্তি উপহার দেন। অনুষ্ঠানে অতিথিদের জন্য পরিবেশন করা হয় হলুদ স্কোয়াশের স্যুপ, তিলের আবরণে সামুদ্রিক মাছ এবং ভ্যানিলা ক্রেমোসহ হোয়াইট হাউসের মধু দিয়ে তৈরি আইসক্রিম।
নৈশভোজের পর অতিথিদের ট্রাম্পের নতুন ৪০ কোটি ডলারের বলরুম নির্মাণস্থল ঘুরিয়ে দেখানো হয়। ট্রাম্প সেখানে বলেন, তাঁর সম্মানে শিই প্রথম ব্যক্তিদের একজন, যারা নির্মাণাধীন স্থানে প্রবেশ করছেন।
তবে এসব জাঁকজমকের মধ্যেও শির সফর থেকে বড় কোনো সমঝোতা বা যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের প্রত্যাশা খুব বেশি ছিল না। সফরের অন্যতম সীমিত সাফল্য হিসেবে দুই দেশের বাণিজ্যিক বিরতি আরও দুই মাস বাড়িয়ে জানুয়ারি পর্যন্ত নেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে চীন যে দুই বছরের জন্য এই বিরতি বাড়াতে চেয়েছিল, তার তুলনায় এটি অনেক কম।
ফলে শির সফরের মূল বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে আড়ম্বরপূর্ণ কূটনৈতিক প্রদর্শন, কিন্তু তার পেছনে রয়ে গেছে দুই দেশের অর্থনীতি, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতি নিয়ে গভীর মতবিরোধ।
বৃহস্পতিবারের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় হোয়াইট হাউসের দক্ষিণ লনে শিকে আনুষ্ঠানিক স্বাগত জানানোর মধ্য দিয়ে। এরপর ট্রাম্প ও শি সদ্য সংস্কার করা রোজ গার্ডেন এলাকায় সামরিক কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করেন।
পরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক যুদ্ধবিমান আকাশে মহড়া দেয়। এর মধ্যে ছিল বি-২ বোমারু বিমান—যে ধরনের বিমান গত বছর ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলায় ব্যবহৃত হয়েছিল। একই সময়ে হোয়াইট হাউসের বিভিন্ন অংশে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পতাকা উড়তে দেখা যায়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তাইওয়ান নিয়ে শির সতর্কবার্তা
ওভাল অফিসে আলোচনার সময় ট্রাম্প রসিকতা করে চীনা সাংবাদিকদের সবচেয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ সংবাদকর্মী হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর এই মন্তব্যের সময়ই যুক্তরাষ্ট্রে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক চলছিল। এর কয়েক দিন আগে সিএনএন, এমএস নাও এবং পলিটিকোর সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউসে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন ট্রাম্প। আদালতের আদেশের পর বৃহস্পতিবার তারা আবার সেখানে প্রবেশের সুযোগ পান।
এরপর ট্রাম্প শিকে নতুন হেলিপ্যাড দেখান এবং তাঁকে মেরিন ওয়ান হেলিকপ্টারেও ওঠান।
দুই নেতা বৈঠককে ‘দারুণ’ বললেও ইরান, তাইওয়ান, মাদক পাচার এবং হংকংয়ের কারাবন্দি গণতন্ত্রপন্থী সংবাদমাধ্যম ব্যবসায়ী জিমি লাইসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি।
তবে শির বক্তব্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ছিল। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ‘কোনো সংঘাত ও কোনো মুখোমুখি অবস্থান’ না থাকার ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার অবশ্যই মানুষের নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা বলেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবজাতির জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করতে পারে—এমন সতর্কতাকে ট্রাম্প বরং অনেক সময় গুরুত্ব কম দিয়ে দেখিয়েছেন। ফলে এ বিষয়ে দুই নেতার দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তাইওয়ান নিয়েও শি ট্রাম্পকে সতর্ক থাকতে বলেন। স্বশাসিত দ্বীপটিকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে চীন। অন্যদিকে তাইওয়ানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা সংকটগুলোর একটি তৈরি হয়েছে। শি তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার জন্য ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানান এবং বিষয়টিতে ‘বিচক্ষণতা’ দেখানোর কথা বলেন।
ইরান যুদ্ধ নিয়েও শির অবস্থান ছিল স্পষ্ট। তেহরানের সঙ্গে চীনের গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের খবরের মধ্যে তিনি ট্রাম্পকে যুদ্ধটি দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে শেষ করার আহ্বান জানান।
অর্থাৎ, হোয়াইট হাউসে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের টেবিলে যখন দুই দেশের নেতাদের মধ্যে সৌহার্দ্যের ছবি তৈরি হয়েছে, তখন আলোচনার অন্য প্রান্তে ছিল বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তাইওয়ান, ইরান এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে গভীর মতপার্থক্য।
শির যুক্তরাষ্ট্র সফর শুক্রবার শেষ হওয়ার কথা। এদিন তিনি ও পেং লিয়ুয়ান যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল আর্কাইভস পরিদর্শন করবেন। সেখানে সংরক্ষিত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী পালিত হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের আয়োজন ও শির সফর দুই দেশের সম্পর্কের উষ্ণতার ছবি তুলে ধরলেও বাস্তবতা হলো—বিশ্বের দুই বৃহৎ শক্তির মধ্যে প্রতিযোগিতা এখনো শেষ হয়নি। বরং বাণিজ্য থেকে প্রযুক্তি এবং তাইওয়ান থেকে মধ্যপ্রাচ্য—বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের স্বার্থের সংঘাত আরও জটিল হয়ে উঠছে।












