২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। নিউইয়র্কের সকালটা শুরু হয়েছিল অন্য দিনের মতোই। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বদলে যায় যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস, আর সেই সঙ্গে বদলে যায় বিশ্বরাজনীতির গতিপথও।
সারি বেথ রোজেনবার্গের জন্য দিনটি ছিল আরও একটি কারণে বিশেষ। ২৬ বছর বয়সী রোজেনবার্গের সেদিনই প্রথম ছাত্র-শিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করার কথা ছিল। নিউইয়র্কের লাগার্ডিয়া হাইস্কুলে একজন শিক্ষক কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস পড়ান, সেটিই তাঁর পর্যবেক্ষণের বিষয় ছিল।
সকালে তাঁর ঘড়ির রেডিওতে চলছিল ‘জেড মর্নিং জু’ নামে একটি হাস্যরসাত্মক অনুষ্ঠান। হঠাৎ অনুষ্ঠানটির উপস্থাপকেরা বলতে শুরু করলেন, একটি বিমান টুইন টাওয়ারে আঘাত করেছে।
প্রথমে তাঁর মনে হয়েছিল, এটা নিশ্চয়ই কোনো রসিকতা।
কিন্তু টেলিভিশন চালু করার পর আর সেই সন্দেহ থাকেনি।
‘ওহ, না—এটা সত্যিই ঘটছে।’
সেই মুহূর্তটি রোজেনবার্গের স্মৃতিতে আজও স্পষ্ট। আর এক শতাব্দীর চতুর্থাংশ পেরিয়ে এসে তিনি দেখছেন, যে ঘটনা তাঁর প্রজন্মের কাছে ছিল জীবন্ত অভিজ্ঞতা, সেটিই এখন তাঁর শিক্ষার্থীদের কাছে ইতিহাসের একটি অধ্যায়।
যে স্কুলের পাশে ছিল টুইন টাওয়ার
পরের সেমিস্টারে রোজেনবার্গকে পাঠানো হয় স্টুইভেসান্ট হাইস্কুলে। স্কুলটি ছিল টুইন টাওয়ারের খুব কাছেই।
হামলার কয়েক মাস পরও সেই এলাকার বাতাসে আতঙ্কের ছাপ ছিল। স্কুলের ক্যাফেটেরিয়ায় নিয়মিত বাতাস পরীক্ষা করা হতো। চারপাশে ছিল এমন এক বাস্তবতা, যা বইয়ের পাতায় পড়ানো কোনো ইতিহাসের সঙ্গে তুলনা করা কঠিন।
তবু আশ্চর্যের বিষয়, শ্রেণিকক্ষে ৯/১১ নিয়ে খুব একটা আলোচনা হতো না।
সময় গড়ানোর সঙ্গে রোজেনবার্গ বুঝতে পারেন, ইতিহাস পড়ানোর ক্ষেত্রে শুধু পাঠ্যবই যথেষ্ট নয়। একটি ঘটনার সঙ্গে মানুষের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত সাক্ষ্যও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাই তিনি শিক্ষার্থীদের বন্ধু বা পরিবারের সদস্যদের ৯/১১-এর অভিজ্ঞতা নিয়ে সাক্ষাৎকার নিতে দিতেন। কোনো বাবা কোথায় ছিলেন, কোনো মা কী দেখেছিলেন, কেউ কীভাবে খবরটি পেয়েছিলেন—এসব ব্যক্তিগত স্মৃতিকে তিনি ইতিহাসের প্রাথমিক উৎস হিসেবে দেখাতেন।
একটি ভয়াবহ জাতীয় ঘটনা তখন শিক্ষার্থীদের কাছে হয়ে উঠত মানুষের স্মৃতির ইতিহাস।
৯/১১ এখন আর তাদের স্মৃতি নয়
আজকের শিক্ষার্থীদের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
৯/১১-এর সময় যারা জন্মই নেয়নি, তারা এখন সেই ঘটনার ইতিহাস পড়ছে। তাদের কাছে টুইন টাওয়ার ধ্বংসের দৃশ্য কোনো ব্যক্তিগত স্মৃতি নয়; বরং ভিডিও, ছবি, বই এবং ইন্টারনেটে দেখা অতীতের ঘটনা।
তবে এর অর্থ এই নয় যে তারা আগ্রহী নয়।
বরং রোজেনবার্গের অভিজ্ঞতায়, বর্তমান শিক্ষার্থীরা ৯/১১ নিয়ে এমন কিছু প্রশ্ন করছে, যেগুলো আগের প্রজন্মের কাছে হয়তো এত সরাসরি ছিল না।
তারা জানতে চায়—যুক্তরাষ্ট্র কেন আফগানিস্তানে গিয়েছিল?
কেন ইরাকে যুদ্ধ হলো?
দুটি যুদ্ধের কারণ কি একই ছিল?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে গেলে ৯/১১-কে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ, আফগানিস্তান, ইরাক, ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েক দশকের ইতিহাস।
আজকের খবর বুঝতে গতকালের ইতিহাস
রোজেনবার্গের কাছে ইতিহাস শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি এখানেই।
বর্তমানের কোনো আন্তর্জাতিক সংকটকে শুধু আজকের সংবাদ দিয়ে বোঝা যায় না। তার পেছনে থাকে পুরোনো যুদ্ধ, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, জোট, সংঘাত এবং ক্ষমতার পরিবর্তন।
ইরানকে ঘিরে আজকের উত্তেজনা বুঝতে হলে ইরানের ইতিহাস জানতে হয়। ইরাকের বর্তমান বাস্তবতা বুঝতে হলে দেশটির যুদ্ধ ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইতিহাস জানতে হয়। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে বুঝতে হলে অঞ্চলটির দীর্ঘ সংঘাত ও বিদেশি হস্তক্ষেপের ইতিহাসও জানতে হয়।
অর্থাৎ ইতিহাস শুধু অতীতকে ব্যাখ্যা করে না। ইতিহাস বর্তমানের খবরের অর্থও বুঝতে সাহায্য করে।
ডিজিটাল যুগে এই প্রয়োজন আরও বেড়েছে। শিক্ষার্থীরা এখন প্রতিদিন নিজেদের মুঠোফোনে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, যুদ্ধ, প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক বিতর্কের ভিডিও দেখতে পাচ্ছে। টিকটকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাদের সামনে তথ্যের বিপুল প্রবাহ খুলে দিয়েছে।
কিন্তু তথ্য পাওয়া আর ইতিহাস বোঝা এক বিষয় নয়।
একটি ৩০ সেকেন্ডের ভিডিও হয়তো কোনো ঘটনার দৃশ্য দেখাতে পারে, কিন্তু সেই ঘটনা কেন ঘটল, তার পেছনে কী ইতিহাস রয়েছে এবং বিভিন্ন পক্ষ কীভাবে ঘটনাটিকে ব্যাখ্যা করছে—সেসব বোঝার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ প্রেক্ষাপট।
ভয়ও বদলে গেছে
৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে ওঠা একটি প্রজন্মের কাছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা সন্ত্রাসী হামলার ভয় ছিল বড় বাস্তবতা।
আজকের শিক্ষার্থীদের উদ্বেগের জায়গা কিছুটা ভিন্ন।
রোজেনবার্গ বলেন, তাঁর শিক্ষার্থীরা এখন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়েও ভয় প্রকাশ করে। বিশেষ করে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা আইসের কার্যক্রম তাদের আলোচনায় আসে।
আইস ২০০৩ সালে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয়। ৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের অংশ হিসেবেই এই বিভাগ গড়ে উঠেছিল।
রোজেনবার্গের ব্যক্তিগত মত হলো, বর্তমানে আইসের কার্যক্রম কিছু সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে। এটি তাঁর নিজস্ব মূল্যায়ন; তবে তাঁর বক্তব্যের বৃহত্তর প্রশ্নটি হলো—৯/১১-এর পর তৈরি হওয়া নিরাপত্তা কাঠামো দুই দশকের বেশি সময় পরে কীভাবে আমেরিকান সমাজকে প্রভাবিত করছে?
এই প্রশ্নের উত্তরও ইতিহাসের মধ্যেই খুঁজতে হয়।
পাঠ্যবইয়ের শেষ অধ্যায় কেন এত দূরে?
ইতিহাস শিক্ষার আরেকটি বড় সমস্যা সময়।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের পাঠ্যক্রম বিশাল। উপনিবেশিক যুগ থেকে স্বাধীনতা, গৃহযুদ্ধ, শিল্পায়ন, বিশ্বযুদ্ধ, মহামন্দা, ঠান্ডা যুদ্ধ—সবকিছু পড়াতে গিয়ে অনেক সময় শিক্ষকরা বর্তমান সময়ের কাছে পৌঁছাতেই পারেন না।
বিশেষ করে ১৯৮০ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত সময়ের ইতিহাস অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষায় তুলনামূলক কম গুরুত্ব পায়। ফলে শিক্ষকরা সিলেবাস শেষ করতে গিয়ে সাম্প্রতিক ইতিহাসের অংশ দ্রুত পড়ান বা কখনো কখনো বাদ দেন।
কিন্তু রোজেনবার্গের অভিজ্ঞতা দেখায়, এই সময়টিই শিক্ষার্থীদের কাছে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
কারণ তারা যে পৃথিবীতে বাস করছে, সেই পৃথিবীর অনেক রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে গত কয়েক দশকে।
৯/১১, আফগানিস্তান যুদ্ধ, ইরাক যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তানীতি এবং অভিবাসন নিয়ে বর্তমান বিতর্ক—এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলোর মধ্যে ঐতিহাসিক যোগসূত্র রয়েছে।
২৫ বছর পর নতুন করে ৯/১১ পড়া
৯/১১-এর ২৫তম বার্ষিকী তাই রোজেনবার্গের কাছে শুধু একটি স্মরণদিবস নয়। এটি নতুন প্রজন্মকে একটি পুরোনো প্রশ্ন নতুনভাবে করার সুযোগ—ইতিহাস আসলে কী?
যে শিশুটি ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জন্মায়নি, তার কাছে সেই দিনটি স্বাভাবিকভাবেই বইয়ের একটি অধ্যায়। কিন্তু সেই অধ্যায় যে পরবর্তী দুই দশকের যুদ্ধ, নিরাপত্তানীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং আমেরিকান সমাজের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে, সেটি বোঝানোই ইতিহাস শিক্ষার বড় দায়িত্ব।
একসময় ৯/১১ ছিল মানুষের বর্তমান।
এখন তা ইতিহাস।
কিন্তু ইতিহাস হয়ে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে তার প্রভাব শেষ হয়ে গেছে।
বরং সময় যত পেরোয়, নতুন প্রজন্মের সামনে তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সেই প্রশ্ন—কী ঘটেছিল, কেন ঘটেছিল এবং তার পরের পৃথিবী কীভাবে তৈরি হলো?
রোজেনবার্গের অভিজ্ঞতা সেই প্রশ্নের দিকেই ইঙ্গিত করে। ইতিহাসকে শুধু অতীতের ঘটনা হিসেবে পড়ালে তার অর্থ সীমিত হয়ে যায়। কিন্তু ইতিহাসকে বর্তমান বোঝার একটি হাতিয়ার হিসেবে দেখলে, ৯/১১-এর মতো ঘটনা নতুন প্রজন্মের কাছেও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে।
২৫ বছর পর তাই টুইন টাওয়ারের ধ্বংস শুধু একটি পুরোনো ছবি নয়। এটি এমন এক অতীত, যার ছায়া এখনো বর্তমানের রাজনীতি, যুদ্ধ, নিরাপত্তা এবং মানুষের স্মৃতিতে রয়ে গেছে।












