মানুষের জীবন বাঁচাতে অস্ত্রোপচারের বিকল্প নেই—টিউমার অপসারণ, অঙ্গ প্রতিস্থাপন, ভাঙা হাড় জোড়া লাগানো কিংবা দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনার মতো চিকিৎসায় অস্ত্রোপচার আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম বড় সাফল্য। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নও সামনে আসছে—প্রতিটি অস্ত্রোপচার কি সত্যিই প্রয়োজনীয়?
সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণার ফল বলছে, প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ এমন অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, যার সুফল খুব সীমিত, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার না করাই হয়তো ভালো। শরীর কেটে অস্ত্রোপচার করার সঙ্গে সংক্রমণ, রক্তপাত, জটিলতা ও দীর্ঘ পুনর্বাসনের ঝুঁকি থাকে। ফলে যে অস্ত্রোপচারের কার্যকারিতা অন্য কম ঝুঁকির চিকিৎসার চেয়ে বেশি নয়, সেটি রোগীর জন্য উল্টো ক্ষতির কারণ হতে পারে।
যুক্তরাজ্যে ১০ জনের মধ্যে প্রায় ছয়জন জীবনের কোনো না কোনো সময়ে অস্ত্রোপচার করান। যুক্তরাষ্ট্রেও অস্ত্রোপচারের পরিমাণ বিপুল। বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যসেবা বাজারে প্রাপ্তবয়স্কদের চিকিৎসায় বছরে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়, যার বড় অংশ বিভিন্ন অস্ত্রোপচারে যায়।
বিশেষ করে অস্থিসন্ধি ও হাড়ের চিকিৎসায় বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে মোট অস্ত্রোপচারের প্রায় এক-চতুর্থাংশই অর্থোপেডিক বা অস্থিবিষয়ক চিকিৎসার সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু প্রচলিত ১০ ধরনের অর্থোপেডিক অস্ত্রোপচারের মধ্যে মাত্র তিনটির ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার না করে চিকিৎসার তুলনায় স্পষ্টভাবে ভালো ফল পাওয়ার প্রমাণ রয়েছে। এগুলো হলো কার্পাল টানেল সিনড্রোমের অস্ত্রোপচার এবং হাঁটু ও নিতম্বের সম্পূর্ণ প্রতিস্থাপন।
অন্যদিকে কোমরের মেরুদণ্ডের চাপ কমানোর মতো ছয়টি প্রচলিত অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে ওষুধ, ফিজিওথেরাপি কিংবা সময়ের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠার তুলনায় অস্ত্রোপচারের বাড়তি সুবিধা স্পষ্ট নয়। কাঁধ ও পিঠের কিছু অস্ত্রোপচার নিয়েও একই ধরনের প্রশ্ন উঠছে।
অ্যাপেন্ডিসাইটিসের ক্ষেত্রেও চিত্রটি বদলাচ্ছে। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের বদলে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েই চিকিৎসা করা সম্ভব হতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ইউরোপে প্রতি বছর প্রায় এক লাখ প্রোস্টেট অস্ত্রোপচার করা হয়। কিন্তু কিছু রোগীর ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক অস্ত্রোপচারের বদলে নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখাই বেশি উপযোগী হতে পারে।
অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের ক্ষতি শুধু শারীরিক নয়। রোগীকে ব্যথা, সংক্রমণ ও অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি নিতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে এর সঙ্গে যুক্ত হয় বড় ধরনের আর্থিক চাপ। অন্যদিকে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকা ধনী দেশগুলোর স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য এটি বিপুল সম্পদের অপচয়।
ইংল্যান্ডে কাঁধের কিছু অস্ত্রোপচারের জন্য রোগী পাঠানোর হার কমানোর পর জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা বছরে প্রায় ১০ কোটি পাউন্ড সাশ্রয় করছে। এটি দেশটির মোট অস্ত্রোপচার বাজেটের প্রায় ১ শতাংশ। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার কমলে চিকিৎসক ও হাসপাতালের সীমিত সময় ও জনবল আরও প্রয়োজনীয় রোগীদের জন্য ব্যবহার করা সম্ভব হয়।
তবে প্রশ্ন হলো, এত অস্ত্রোপচার এখনও কেন করা হচ্ছে?
এর অন্যতম কারণ হলো—অনেক চিকিৎসা-পদ্ধতি আসলে কতটা কার্যকর, সে বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য ক্লিনিক্যাল তথ্য সংগ্রহ করা হয়নি। অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে অনেক সময় রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠাকেই অস্ত্রোপচারের সাফল্যের প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু রোগী অস্ত্রোপচার না করলেও একই সময়ে সুস্থ হয়ে উঠতেন কি না, সেটি সবসময় যাচাই করা হয় না।
ওষুধের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে ভিন্ন। নতুন কোনো ওষুধ বাজারে আনার আগে সাধারণত বড় পরিসরে নিয়ন্ত্রিত ও দৈবচয়নভিত্তিক পরীক্ষা চালাতে হয়। ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো এসব পরীক্ষায় বিপুল অর্থ ব্যয় করে, কারণ কার্যকারিতা প্রমাণিত হলে সেই ওষুধ থেকে বড় ব্যবসায়িক লাভের সুযোগ থাকে। কিন্তু অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সার্জনের পক্ষে এ ধরনের বড় গবেষণা চালানোর সুযোগ বা প্রণোদনা অনেক কম।
এই ঘাটতি পূরণে সরকার ও সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাগুলোর বড় ভূমিকা থাকতে পারে। যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ইতিমধ্যে বিভিন্ন হাসপাতালে একই ধরনের অস্ত্রোপচারের ফলাফল তুলনা করে পরীক্ষা চালানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এতে কোনো নির্দিষ্ট সার্জনের দক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে বড় পরিসরে অস্ত্রোপচারের প্রকৃত কার্যকারিতা যাচাই করা সম্ভব।
এ ধরনের গবেষণা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। কোনো অস্ত্রোপচার রোগীর জন্য বাস্তবে উপকারী নয়—এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে সরকারি বা বেসরকারি স্বাস্থ্যবিমা প্রতিষ্ঠান সেই চিকিৎসার খরচ বহন না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এতে শুধু অর্থ সাশ্রয় হবে না, চিকিৎসাব্যবস্থার সক্ষমতাও বাড়বে।
যেসব সার্জন অপ্রয়োজনীয় কাঁধ বা পিঠের অস্ত্রোপচার থেকে মুক্ত হবেন, তারা হাঁটু, নিতম্ব কিংবা কার্পাল টানেলের মতো চিকিৎসায় আরও বেশি সময় দিতে পারবেন। যেসব স্বাস্থ্যব্যবস্থায় চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়, সেখানে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার কমানো অপেক্ষমাণ রোগীর তালিকাও ছোট করতে পারে।
ইংল্যান্ডে জুলাই মাসে প্রায় ৬২ লাখ মানুষ জরুরি নয়—এমন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার অপেক্ষায় ছিলেন। এই তালিকায় অনেক ধরনের অস্ত্রোপচারের রোগীও রয়েছেন। ফলে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার কমানো শুধু অর্থনৈতিক সাশ্রয় নয়, চিকিৎসাসেবার ওপর চাপ কমানোরও একটি উপায় হতে পারে।
তবে বহু বছরের প্রচলিত চিকিৎসাপদ্ধতি বদলানো সহজ হবে না। চিকিৎসকেরা স্বাভাবিকভাবেই মনে করেন, তারা রোগীর সর্বোত্তম স্বার্থেই কাজ করছেন। কিন্তু কোনো চিকিৎসকের হাতে যদি মূলত একটি অস্ত্রই থাকে—অস্ত্রোপচারের ছুরি—তাহলে অনেক সমস্যাকেই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সমাধানযোগ্য মনে হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
তাই পরিবর্তন শুরু করতে হবে চিকিৎসাশিক্ষা থেকেই। চিকিৎসকদের এমনভাবে প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তারা রোগীর সামনে সম্ভাব্য সব চিকিৎসা-পদ্ধতি তুলে ধরেন এবং রোগীর সঙ্গে আলোচনা করে সবচেয়ে উপযুক্ত পথ বেছে নেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটিকে বলা হয় ‘যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ’।
অনেক চিকিৎসাক্ষেত্রে রোগী ও চিকিৎসকের যৌথ সিদ্ধান্ত এখন স্বাভাবিক হলেও সার্জারির ক্ষেত্রে এটি এখনও সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অথচ অস্ত্রোপচারের মতো বড় সিদ্ধান্তে রোগীকে সম্ভাব্য সুবিধা, ঝুঁকি এবং অস্ত্রোপচার না করার বিকল্প—সবকিছু জানানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের লক্ষ্য শুধু বেশি চিকিৎসা দেওয়া নয়; প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক চিকিৎসা দেওয়া। যেখানে অস্ত্রোপচার জীবন বাঁচায় বা রোগীর জীবনমান স্পষ্টভাবে উন্নত করে, সেখানে তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যেখানে ওষুধ, ফিজিওথেরাপি, পর্যবেক্ষণ কিংবা সময়ের সঙ্গে সুস্থ হয়ে ওঠার সুযোগ একই রকম বা আরও ভালো ফল দিতে পারে, সেখানে শুধু অভ্যাসের কারণে অস্ত্রোপচার করা উচিত নয়।
অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার কমানোর অর্থ সার্জারির বিরুদ্ধে যাওয়া নয়। বরং এর অর্থ হলো—প্রমাণের ভিত্তিতে ঠিক করা, কখন ছুরি ব্যবহার করা প্রয়োজন এবং কখন তা নামিয়ে রাখা ভালো।












