কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রে যে অর্থনৈতিক উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছে, তার সবচেয়ে দৃশ্যমান অবকাঠামো এখন বিশাল ডেটা সেন্টার। কিন্তু প্রযুক্তির এই বিস্তার যত দ্রুত হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে এর আরেকটি দিক—ডেটা সেন্টার শুধু অর্থনৈতিক প্রকল্প নয়, এটি স্থানীয় রাজনীতিরও বিস্ফোরক ইস্যু হয়ে উঠছে।
ওহাইও এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। একসময় রাজ্যটি রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রযুক্তি বিনিয়োগ সেখানে শিল্প পুনরুজ্জীবনের প্রতিশ্রুতি তৈরি করেছিল। কিন্তু এখন সেই একই প্রযুক্তি অবকাঠামো নিয়ে ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
প্রশ্নটি খুব সরল: বিশাল প্রযুক্তি প্রকল্পের লাভ যদি জাতীয় অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে তার স্থানীয় খরচ কে বহন করবে?
প্রযুক্তির স্বপ্নের আড়ালে খরচ

ওহাইও বহু বছর ধরে শিল্পায়নের পতন কাটিয়ে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করেছে। সস্তা জমি, পানি, জনসংখ্যা এবং তুলনামূলকভাবে শিথিল ভূমি ব্যবহারের নিয়ম প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য রাজ্যটিকে আকর্ষণীয় করেছে। করছাড় ও অন্যান্য সুবিধার মাধ্যমে আমাজন, মেটা ও গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানকে সেখানে আনা হয়েছে। পরে ইন্টেল ২০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পরিকল্পনা ঘোষণা করে।
ডেটা সেন্টারের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। কলম্বাসের বাইরে নিউ অ্যালবানি ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস পার্কে ইতিমধ্যে ৪০টি ডেটা সেন্টার রয়েছে এবং আরও ২৮টি পরিকল্পনাধীন। এনভিডিয়া ও তার অংশীদারদের প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের ঘোষিত প্রকল্পের অংশ হিসেবেও ওহাইওতে বিশাল একটি ডেটা সেন্টার কমপ্লেক্স তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
কিন্তু বড় বিনিয়োগের অর্থ বড় কর্মসংস্থান—এই পুরোনো ধারণা এখানে পুরোপুরি খাটে না।
ডেটা সেন্টার নির্মাণের সময় বিপুল শ্রম ও অর্থের প্রয়োজন হয়। কিন্তু স্থাপনা চালু হওয়ার পর সার্ভার, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ও সীমিত সংখ্যক প্রযুক্তিকর্মী দিয়েই এর কার্যক্রম চলে। ফলে করছাড় ও সরকারি প্রণোদনার বিনিময়ে স্থানীয় জনগণ যে বিপুল কর্মসংস্থান আশা করে, তা অনেক সময় বাস্তবে দেখা যায় না।
ওহাইওতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আকর্ষণে দেওয়া করছাড়ের ব্যয়ও প্রত্যাশার তুলনায় বেশি হয়েছে। ২০২৫ সালে এই অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে আগামী দুই দশকে রাজ্যের বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ৫৬ শতাংশ বাড়তে পারে।
অর্থাৎ প্রযুক্তির লাভের পাশাপাশি তার অবকাঠামোগত মূল্যও বাড়ছে।
স্থানীয় মানুষের বিদ্যুৎ বিল, জাতীয় অর্থনীতির লাভ
ডেটা সেন্টার নিয়ে বর্তমান ক্ষোভের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো লাভ ও ব্যয়ের ভৌগোলিক অসমতা।
ডেটা সেন্টার একটি নির্দিষ্ট এলাকায় নির্মিত হয়। সেখানকার জমি ব্যবহৃত হয়, বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়ে, পানি ব্যবহারের প্রশ্ন ওঠে, শব্দ ও পরিবেশগত প্রভাব তৈরি হয়। অথচ ডেটা সেন্টারে উৎপাদিত ডিজিটাল সেবা সারা দেশের বা সারা বিশ্বের অর্থনীতিতে ব্যবহৃত হয়।

এই ব্যবধান রাজনৈতিক অসন্তোষের ভিত্তি তৈরি করছে।
সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, ডেটা সেন্টার নিয়ে বিরোধিতা কোনো এক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সেপ্টেম্বরের নিউইয়র্ক টাইমস-সিয়েনা জরিপে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরোধিতা করেছেন। বিরোধিতার হার ডেমোক্র্যাট, স্বতন্ত্র ও রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যে ভিন্ন হলেও তিন গোষ্ঠীতেই এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ।
এই কারণেই ডেটা সেন্টারবিরোধী রাজনীতিকে শুধু পরিবেশবাদী বা বামপন্থী আন্দোলন হিসেবে দেখা কঠিন। গ্রামীণ ও রক্ষণশীল এলাকাতেও একই ধরনের আপত্তি দেখা যাচ্ছে।
রিপাবলিকানদের জন্য অস্বস্তিকর পরিবর্তন
রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক সমস্যাটি এখানেই। দলটি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করেছে। কিন্তু এখন তাদেরই ভোটারদের একটি অংশ প্রশ্ন তুলছে—প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য এত সুবিধা দেওয়ার পর সাধারণ মানুষ কী পাচ্ছে?
ওহাইওতে রিপাবলিকান সিনেটর জন হাস্টেড বড় বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের অবকাঠামোগত ব্যয়ের অংশ বহনের পক্ষে আইন প্রস্তাব করেছেন। মিশিগানে নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণে সাময়িক স্থগিতাদেশের দাবি উঠেছে। টেক্সাসেও নতুন প্রকল্পের অনুমোদন নিয়ে কঠোরতা দেখা গেছে।
বিষয়টি এখন এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে ৩০ সেপ্টেম্বর মার্কিন সিনেটেও ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ ব্যয় নিয়ে একটি বিল আটকে যায়। প্রস্তাবটি বড় বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের কারণে গ্রিড সম্প্রসারণের অতিরিক্ত ব্যয় সাধারণ ভোক্তাদের ওপর কতটা পড়বে, তা বিবেচনার সুযোগ তৈরি করতে চেয়েছিল। ভোটে বিলটি ৫৭-৪৩ ব্যবধানে প্রয়োজনীয় ৬০ ভোট পায়নি।
অর্থাৎ বিতর্কটি এখন আর শুধু স্থানীয় zoning বা নির্বাচনী প্রচারের বিষয় নয়; এটি জাতীয় নীতির প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

ডেমোক্র্যাটদের জন্যও সহজ সমাধান নেই
তবে এখান থেকে ধরে নেওয়া যায় না যে ডেটা সেন্টার ইস্যু স্থায়ীভাবে ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিক সম্পদে পরিণত হবে।
কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রযুক্তি শিল্পকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রশ্নে ক্ষমতায় থাকা যেকোনো দলকেই একই সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। ডেটা সেন্টারের বিরোধিতা করা এক বিষয়; কিন্তু এমন নীতি তৈরি করা, যা প্রযুক্তির বিনিয়োগ ধরে রাখবে এবং একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণকে অতিরিক্ত ব্যয় থেকে রক্ষা করবে, সেটি অনেক কঠিন।
এখানেই বর্তমান রাজনীতির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হচ্ছে। প্রযুক্তি খাতকে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন নিয়ে আলোচনা বাড়লেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় ট্রিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে এখনো দুই দলের মধ্যে সুস্পষ্ট ঐকমত্য নেই।
প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ আসলে কার?
ডেটা সেন্টারের বিতর্ক শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎ, পানি বা জমির হিসাবের চেয়ে বড় একটি প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অর্থনৈতিক সুফল কার জন্য?
যদি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো লাভ করে, কিন্তু স্থানীয় জনগণকে বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ব্যয়, পরিবেশগত চাপ এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মূল্য দিতে হয়, তাহলে শুধু ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক সুবিধার প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট হবে না।

মূল সমস্যাটি হলো, ডেটা সেন্টারের ব্যয় স্থানীয় হলেও এর সম্ভাব্য সুবিধা অনেক বেশি বিস্তৃত। এই অসমতা যত বেশি দৃশ্যমান হবে, প্রযুক্তি খাতের প্রতি মানুষের আস্থাও তত বেশি রাজনৈতিক প্রশ্নের মুখে পড়বে।
তাই ডেটা সেন্টার নিয়ে বর্তমান ক্ষোভকে সাময়িক নির্বাচনী উত্তেজনা হিসেবে দেখার সুযোগ কম। আবার এটিকে কোনো একটি দলের স্থায়ী রাজনৈতিক সম্পদ বলাও ঠিক হবে না।
বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি অর্থনীতির একটি গভীর পরিবর্তনের সংকেত। এত দিন প্রশ্ন ছিল—কীভাবে আরও দ্রুত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করা যায়। এখন তার সঙ্গে আরেকটি প্রশ্ন যোগ হয়েছে—এই অগ্রগতির মূল্য কে দেবে?
আগামী দিনের প্রযুক্তি রাজনীতির আসল লড়াই সম্ভবত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বন্ধ করা বা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে নয়। লড়াই হবে এর নিয়ম, ব্যয় ও সুফল কীভাবে ভাগ করা হবে তা নিয়ে। আর সেই প্রশ্নের উত্তর যতক্ষণ অস্পষ্ট থাকবে, ডেটা সেন্টার যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ততদিন একটি অস্বস্তিকর এবং দলীয় সীমারেখা ভেঙে দেওয়া ইস্যু হয়ে থাকবে।
সাম্প্রতিক কংগ্রেসীয় বিতর্কটি মূল লেখার কেন্দ্রীয় যুক্তিকে আরও প্রাসঙ্গিক করেছে: ডেটা সেন্টারের অবকাঠামোগত ব্যয় সাধারণ ভোক্তার ওপর পড়বে, নাকি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বহন করবে—এটি এখন সরাসরি নীতিনির্ধারণের প্রশ্ন।












