মৃত্যু মানুষের জীবনের সবচেয়ে নিশ্চিত বাস্তবতা, অথচ এ নিয়েই মানুষের ভয় সবচেয়ে গভীর। মৃত্যুর চিন্তা অনেকের মধ্যে এমন উদ্বেগ তৈরি করে, যা দৈনন্দিন জীবন, চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্ত এমনকি স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে নতুন কিছু গবেষণা বলছে, নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ভার্চুয়াল বাস্তবতার মাধ্যমে মানুষকে মৃত্যুর অভিজ্ঞতার কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া হলে সেই ভয় কিছুটা কমতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ায় এমনই একটি ব্যতিক্রমী পরীক্ষায় স্বেচ্ছাসেবীদের ভার্চুয়াল বাস্তবতার মাধ্যমে হৃদ্যন্ত্র বন্ধ হয়ে যাওয়া, চিকিৎসকদের পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা এবং পরে শরীরের বাইরে চলে যাওয়ার মতো একটি কাল্পনিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নেওয়া হয়।
প্রায় ১০ মিনিটের এই অভিজ্ঞতার নাম ‘পাসিং ইলেকট্রিক্যাল স্টর্মস’। শিল্পী ও প্রযুক্তিবিদ শন গ্ল্যাডওয়েলের তৈরি এই ভার্চুয়াল অভিজ্ঞতাটি ২০২৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল গ্যালারি অব ভিক্টোরিয়ায় প্রদর্শিত হয়েছিল।
অংশগ্রহণকারীদের একটি বিছানায় শুইয়ে মাথায় ভার্চুয়াল বাস্তবতার যন্ত্র পরানো হয়। শুরুতে বিছানাটি তাদের হৃদ্স্পন্দনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাঁপতে থাকে। যন্ত্রের ভেতরের দৃশ্যে তারা নিজেদের গ্যালারির একটি টেবিলের ওপর শুয়ে থাকতে দেখেন। এরপর শুরু হয় মৃত্যুর সিমুলেশন।
দৃশ্যপটে তাদের হৃদ্স্পন্দন ধীরে ধীরে থেমে যেতে থাকে। চিকিৎসকদের তাদের বাঁচানোর চেষ্টা করতে দেখা যায়, কিন্তু সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরপর দেখানো হয় মস্তিষ্কের মৃত্যু। একপর্যায়ে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের শরীর থেকে বেরিয়ে মহাশূন্যের দিকে ভেসে যেতে দেখেন। পরে সেই দৃশ্য আরও ক্ষুদ্র হয়ে কোষ ও পরমাণুর জগতে পৌঁছে যায়। অভিজ্ঞতাটিকে বাস্তব মনে করাতে ছয়টি বড় পাখা দিয়ে শরীরে ঠান্ডা বাতাসও দেওয়া হয়।
এই অভিজ্ঞতার পর অংশগ্রহণকারীদের প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকেরা। জুন মাসে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী অভিজ্ঞতাটিকে অস্বস্তিকর বা ভয়াবহ না বলে বরং আনন্দদায়ক হিসেবে বর্ণ করেছেন। অনেকের মৃত্যুভীতিও কমে যায়।
একজন অংশগ্রহণকারী গবেষকদের বলেন, মৃত্যু যদি সত্যিই এতটা সহজ হয়, তাহলে তিনি তাতে খুশি থাকবেন। আরেকজন এই অভিজ্ঞতাকে যোগব্যায়ামের সঙ্গে তুলনা করেন। এমনকি ছোটবেলা থেকে নরকের ধারণায় বিশ্বাস করে আসা একজন অংশগ্রহণকারীও জানান, অভিজ্ঞতার পর তিনি একধরনের স্বস্তি অনুভব করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসেও কাছাকাছি ধরনের আরেকটি গবেষণা হয়েছে। সেখানে শিক্ষার্থীদের প্রায় ১১ মিনিটের একটি ভার্চুয়াল অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নেওয়া হয়। এতে নিজেদের একটি গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হওয়া, কোমায় চলে যাওয়া, আলোর সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে যাওয়া, শান্ত প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখা এবং বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কাল্পনিক সাক্ষাতের মতো দৃশ্য দেখানো হয়।
এই গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মৃত্যুভীতি গড়ে প্রায় ১৮ শতাংশ কমেছিল। একজন অংশগ্রহণকারী অভিজ্ঞতাটিকে এতটাই প্রশান্তিদায়ক বলে বর্ণ করেন যে তিনি এটি বারবার, এমনকি ঘুমানোর আগে প্রতিদিনও করতে চান বলে জানান।
তবে মৃত্যুর কাছাকাছি যাওয়ার এই ভার্চুয়াল অভিজ্ঞতা সবার ক্ষেত্রে একই ফল দেয়নি। প্রায় এক-চতুর্থাংশ শিক্ষার্থী জানান, এতে তাদের মৃত্যুভীতি বরং বেড়ে যায়। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অংশগ্রহণকারী অভিজ্ঞতার পর বেশি চাপ বা মানসিক অস্থিরতা অনুভব করেন।
গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে বয়স্ক, শারীরিকভাবে দুর্বল কিংবা মরণাপন্ন রোগীদের নিয়ে এ ধরনের গবেষণা করলে ফল আরও ভিন্ন হতে পারে। তবে এ ধরনের পরীক্ষার ক্ষেত্রে ব্যক্তির মানসিক অবস্থা, পূর্বের বিশ্বাস এবং মৃত্যুকে ঘিরে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মৃত্যুর ভয় শুধু সাধারণ মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চিকিৎসক ও সার্জনদেরও রোগী হারানোর ভয় এবং মানসিক চাপ মোকাবিলা করতে হয়। বাস্তব চিকিৎসা পরিস্থিতিতে কোনো রোগীর মৃত্যু একজন চিকিৎসকের জন্য গভীর মানসিক আঘাত হয়ে উঠতে পারে।
এ কারণেই চিকিৎসাশিক্ষায় মৃত্যুর পরিস্থিতি অনুকরণের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। জানুয়ারিতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাশিক্ষার্থীদের একটি প্রশিক্ষণ পরিস্থিতির কথা উঠে আসে। সেখানে একটি অনুশীলনের সময় নির্ধারিত পরিকল্পনার বাইরে গিয়ে একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রশিক্ষণ রোগীর মৃত্যুর দৃশ্য তৈরি করেন।
শিক্ষার্থীরা তখন মনে করেছিলেন, তারা অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। হঠাৎ রোগীর মনিটরে হৃদ্স্পন্দন বন্ধ হয়ে যাওয়ার সংকেত দেখা যায়। আগে থেকে সতর্ক না থাকায় শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া ছিল তীব্র। পরে আলোচনায় একজন শিক্ষার্থী বলেন, তিনি ভয় পেয়েছিলেন যে হয়তো তিনি সত্যিই কাউকে মেরে ফেলছেন এবং এই ঘটনার পর চিকিৎসক হিসেবে তার যোগ্যতা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছিল।
গবেষকদের ধারণা, এ ধরনের নিয়ন্ত্রিত ও পরিকল্পিত অনুশীলন চিকিৎসাশিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের বাস্তব পরিস্থিতির জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে পারে। কারণ চিকিৎসাজীবনে অনেক চিকিৎসককেই কোনো না কোনো পর্যায়ে রোগীর মৃত্যু প্রত্যক্ষ করতে হয়।
বাস্তব অপারেশন থিয়েটারে প্রথমবার এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার বদলে প্রশিক্ষণের সময় নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে মৃত্যুর সম্ভাব্য পরিস্থিতি অনুশীলন করলে চিকিৎসকদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বাড়তে পারে।
তবে ভার্চুয়াল বাস্তবতায় মৃত্যুর অভিজ্ঞতা তৈরি করা মৃত্যুভয়ের কোনো নিশ্চিত চিকিৎসা—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো নেই। বরং প্রাথমিক গবেষণাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মৃত্যুকে নিয়ে ভয় ও উদ্বেগ কমাতে এটি সহায়ক হতে পারে, আবার অন্যদের ক্ষেত্রে উল্টো উদ্বেগ বাড়াতেও পারে।
তাই মৃত্যুকে ভার্চুয়াল বাস্তবতায় দেখানোর এই পদ্ধতি ভবিষ্যতে মানসিক স্বাস্থ্য, চিকিৎসাশিক্ষা এবং মৃত্যুচেতনা নিয়ে গবেষণার একটি নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মানুষকে মৃত্যুর বাস্তবতা বুঝতে সাহায্য করার পাশাপাশি এমন অভিজ্ঞতা যেন নতুন মানসিক চাপ তৈরি না করে, সেটিও নিশ্চিত করা।












