একসময় চাঁদে মানুষের পা রাখাই ছিল মহাকাশ প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। এখন সেই প্রতিযোগিতা আরও এক ধাপ এগিয়েছে—চাঁদের সম্পদ, ঘাঁটি ও ভবিষ্যৎ ব্যবহারের ওপর কার কতটা অধিকার থাকবে, তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
১৯৬৭ সালের মহাকাশ চুক্তি বা ‘আউটার স্পেস ট্রিটি’ অনুযায়ী, কোনো দেশ মহাকাশ বা চাঁদের কোনো অংশকে দখল, ব্যবহার কিংবা বসতি স্থাপনের মাধ্যমে নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করতে পারে না। শতাধিক দেশ এই নীতিতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু প্রায় ছয় দশক পর চাঁদে ঘাঁটি নির্মাণ ও সম্পদ আহরণের পরিকল্পনা যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—চুক্তির অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়।
যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়াসহ বড় মহাকাশ শক্তিগুলো চাঁদে দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে। বিশেষ করে চাঁদের দক্ষিণ মেরু ঘিরে প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে। সেখানে বরফ আকারে জমে থাকা পানি, হিলিয়ামসহ বিভিন্ন সম্পদের সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পানি ভবিষ্যৎ মহাকাশ অভিযানে পানীয় হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি অক্সিজেন ও জ্বালানি তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
চীন ও রাশিয়া একই অঞ্চলের কাছাকাছি একটি যৌথ চন্দ্র গবেষণা ঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনা করছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে। এর পেছনে শুধু বৈজ্ঞানিক গবেষণা নয়, ভবিষ্যতে চাঁদের কৌশলগত অবস্থান ও সম্পদের ওপর প্রভাব বিস্তারের বিষয়টিও কাজ করছে।
চাঁদ নিয়ে এই নতুন প্রতিযোগিতা শুধু রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বেসরকারি মহাকাশ উদ্যোক্তারাও চাঁদের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি নিয়ে বড় পরিকল্পনা করছেন। ইলন মাস্ক চাঁদে তথ্যকেন্দ্র স্থাপনসহ বিপুল অর্থমূল্যের নতুন বাজারের সম্ভাবনার কথা বলেছেন। জেফ বেজোসের পরিকল্পনায় চাঁদে ভারী শিল্প স্থাপনের ধারণাও রয়েছে। তাঁর দীর্ঘমেয়াদি স্বপ্নের একটি অংশ হলো পৃথিবীকে মানুষের বসবাস ও প্রকৃতির জন্য আরও উপযোগী একটি ‘বাগান গ্রহে’ পরিণত করা।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—চাঁদের মাটি যদি কোনো দেশ বা কোম্পানি নিজের বলে দাবি করতে না পারে, তাহলে সেখান থেকে উত্তোলন করা সম্পদের মালিক কে হবে?
আন্তর্জাতিক মহাকাশ আইনের বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, চাঁদের জমি দখল করা নিষিদ্ধ হলেও সেখান থেকে কোনো সম্পদ উত্তোলন করলে সেই সম্পদের ওপর উত্তোলনকারী পক্ষের অধিকার থাকতে পারে। এই যুক্তির সঙ্গে সমুদ্র আইনেও কিছুটা মিল খোঁজা হয়। গভীর সমুদ্রের সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক আইনে আলাদা নীতি রয়েছে।
তবে এই ব্যাখ্যা নিয়ে সর্বসম্মতি নেই। কারণ ১৯৬৭ সালের মহাকাশ চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল মহাকাশে সামরিক প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণ করা এবং কোনো দেশ যেন মহাকাশকে নিজের ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে চুক্তিটি মহাকাশে পারমাণবিক অস্ত্র স্থাপনের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
চাঁদের সম্পদ নিয়ে আরও স্পষ্ট নিয়ম তৈরির চেষ্টা হয়েছিল ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে। ‘মুন ট্রিটি’ নামে পরিচিত ওই চুক্তিতে চাঁদের সম্পদকে মানবজাতির অভিন্ন সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা এবং এর ব্যবহার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু মাত্র ১৭টি দেশ এতে সম্মত হয়। যুক্তরাষ্ট্র, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চীন এতে যোগ দেয়নি। ফলে চাঁদের সম্পদ ব্যবহারের বিষয়ে সেই চুক্তি বড় শক্তিগুলোর জন্য কার্যকর বৈশ্বিক কাঠামো হয়ে উঠতে পারেনি।

এরপরও বহু বছর বিষয়টি খুব বেশি উত্তপ্ত হয়নি। কারণ চাঁদ থেকে সম্পদ আহরণের প্রযুক্তি ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং বাস্তব অর্থনৈতিক লাভের নিশ্চয়তাও ছিল না। ফলে কে আগে চাঁদে গিয়ে সম্পদ নেবে—এই প্রশ্নটি দীর্ঘদিন তাত্ত্বিকই ছিল।
এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ২০১৫ সালের একটি আইনে মহাকাশ থেকে সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর অধিকার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে তৈরি ‘আর্টেমিস অ্যাকর্ডস’-এও চাঁদ, মঙ্গল, ধূমকেতু বা গ্রহাণু থেকে সম্পদ আহরণকে মহাকাশ চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৭৬টি দেশ এই নীতিমালায় স্বাক্ষর করেছে।
অন্যদিকে চীন ও আরও অন্তত ১২টি দেশ আন্তর্জাতিক চন্দ্র গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য পৃথক কাঠামো তৈরি করেছে। ফলে ভবিষ্যতে চাঁদে দুটি ভিন্ন ধরনের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা পাশাপাশি কাজ করতে পারে।
সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি হলো ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ বা কোনো ঘাঁটির চারপাশে অন্যদের প্রবেশ সীমিত করার ব্যবস্থা। চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন করা হলে তার চারপাশে নিরাপত্তার কারণে একটি নির্দিষ্ট এলাকা অন্যদের প্রবেশের বাইরে রাখার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু এমন ব্যবস্থা যদি বাস্তবে অন্য দেশগুলোর চন্দ্র অভিযান বা যান চলাচল বাধাগ্রস্ত করে, তাহলে তা ১৯৬৭ সালের মহাকাশ চুক্তির ‘সবার জন্য অবাধ প্রবেশাধিকার’-এর নীতির সঙ্গে সংঘাত তৈরি করতে পারে।
এখানেই ‘আগে গেলে আগে অধিকার’ ধরনের একটি নতুন বাস্তবতার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। কোনো দেশ যদি চাঁদের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আগে ঘাঁটি তৈরি করে, পারমাণবিক শক্তি স্থাপন করে এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলে, তাহলে আইনগতভাবে সেই এলাকা নিজের বলে দাবি না করেও বাস্তবে অন্যদের চলাচল সীমিত করার মতো অবস্থান তৈরি করতে পারে।
মহাকাশ রাজনীতির বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এর ফলে চাঁদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কার্যত একচেটিয়া প্রভাব তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ মেরুর মতো সম্পদসমৃদ্ধ ও কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কয়েকটি শক্তিশালী দেশ আগে পৌঁছে গেলে পরবর্তী সময়ে অন্যদের জন্য সেখানে প্রবেশের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে।
জাতিসংঘের একটি কার্যকরী গোষ্ঠী চাঁদের সম্পদ, ঘাঁটি, নিরাপত্তা অঞ্চল এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রশ্নে কিছু নীতিমালা চূড়ান্ত করার কাজ করছে। আগামী বছর এসব বিষয়ে আরও স্পষ্ট আন্তর্জাতিক কাঠামো আসতে পারে।
তবে বাস্তবতা হলো, চাঁদে অভিযান পরিচালনা ও দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো তৈরির মতো বিপুল অর্থ ও প্রযুক্তি এখনো হাতে গোনা কয়েকটি দেশের রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক আইন যতই সাধারণ নীতির কথা বলুক, বাস্তবে যারা আগে চাঁদে পৌঁছাতে পারবে, তারাই ভবিষ্যতের নিয়ম তৈরিতে বড় প্রভাব রাখতে পারে।
একসময় বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে কল্পনা করা হয়েছিল, কোনো ধনী ব্যবসায়ী চাঁদের মালিকানা বিক্রি করার চেষ্টা করছেন। এখন সেই কল্পনা হুবহু বাস্তব না হলেও চাঁদের সম্পদ ও ব্যবহারের অধিকার নিয়ে প্রশ্নটি আর কেবল গল্পের বিষয় নয়।
চাঁদ এখন শুধু বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্র নয়। ভবিষ্যতের জ্বালানি, শিল্প, যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি ও মহাকাশ অর্থনীতির সম্ভাব্য কেন্দ্র হিসেবেও সেটিকে দেখা হচ্ছে। তাই প্রশ্নটি ক্রমেই বদলে যাচ্ছে—চাঁদের মালিক কে, তা নয়; বরং চাঁদে কে আগে পৌঁছাবে, কে সেখানে স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে এবং ভবিষ্যতের নিয়ম কে তৈরি করবে?
এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো আগামী দশকের মহাকাশ রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা নির্ধারণ করবে।












