কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করার পাশাপাশি এর সম্ভাব্য বিপর্যয়কর ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা এখন ২১ শতকের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তির উন্নয়ন যত দ্রুত এগোচ্ছে, এর অপব্যবহার বা নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার সময় তত কমে আসছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি এআই নিরাপত্তা নিয়ে সহযোগিতাও জরুরি হয়ে উঠেছে।
২৪ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এআই নিয়ন্ত্রণ ও ঝুঁকি নিয়ে আরও আলোচনার বিষয়ে একমত হন। তবে দুই দেশের এআই কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে অত্যাধুনিক এআই প্রযুক্তি ও অবকাঠামোতে এগিয়ে থাকায় অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণে উদ্ভাবনের গতি কমে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক। অন্যদিকে চীন প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবধান কমানোর পাশাপাশি এআইয়ের আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণে প্রভাব বাড়াতে চাইছে।
পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যেও এআই নিয়ে মতভেদ রয়েছে। এক পক্ষ মনে করে, বিপজ্জনক পরিস্থিতি ঠেকাতে এআই উন্নয়নের গতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করে আগে নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্ত করা দরকার। অন্য পক্ষের যুক্তি, চীনের সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া ঠেকাতে উন্নয়নের গতি আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
তবে এই দুই লক্ষ্যকে পরস্পরের বিপরীত হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। এআই উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি এর সম্ভাব্য বিপর্যয় ঠেকানোর ব্যবস্থাও একই সময়ে গড়ে তোলা সম্ভব। বরং অগ্রাধিকারের জায়গায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত—এআই যেন মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়।
কারণ যুক্তরাষ্ট্র বা চীন যে পক্ষই প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকুক, যদি এআই ব্যবহার করে জীবাণু বা রাসায়নিক হামলা, বড় ধরনের সাইবার আক্রমণ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংসের মতো ঘটনা ঘটে, তাহলে সেই প্রতিযোগিতার সাফল্যই অর্থহীন হয়ে যেতে পারে।
এখানেই পারমাণবিক অস্ত্রের ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।
১৯৪৫ সালের জুনে পারমাণবিক বোমা তৈরির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন বিজ্ঞানী ‘ফ্র্যাঙ্ক রিপোর্ট’-এ জাপানের বিরুদ্ধে আগাম ঘোষণা ছাড়া পারমাণবিক হামলার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, এমন হামলা বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি জনসমর্থন ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। কিন্তু মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর আগস্টে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা ফেলা হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে শুরু হয় পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা। কিন্তু কার্যকর অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ জোরালোভাবে শুরু হতে আরও বহু বছর লেগে যায়। ১৯৬২ সালের কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকট বিশ্বকে পারমাণবিক যুদ্ধের প্রায় দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। এরপর দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের জন্য হটলাইন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৭০ সালে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি কার্যকর হয়।
অর্থাৎ হিরোশিমা ও নাগাসাকির ধ্বংসের পর একটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামো দাঁড়াতে প্রায় ২৫ বছর লেগেছিল। এআইয়ের ক্ষেত্রে এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার সুযোগ নাও থাকতে পারে।
পারমাণবিক অস্ত্রের তুলনায় এআই প্রযুক্তির বিস্তারের ধরনও ভিন্ন। একটি এআই মডেল দ্রুত কপি ও পরিবর্তন করা যায়। কোনো প্রযুক্তি একবার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে সেটিকে আবার নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনা কঠিন। এর মালিকানাও শুধু রাষ্ট্রের হাতে থাকে না; প্রযুক্তি কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি ব্যক্তি পর্যায়েও শক্তিশালী এআই ব্যবস্থা তৈরি ও ব্যবহার করা সম্ভব।
ফলে কোনো এআই ব্যবস্থা সন্ত্রাসী বা অপরাধী গোষ্ঠীর হাতে গেলে এর অপব্যবহারের পরিধি অনেক বড় হতে পারে। বিশেষ করে সাইবার হামলা, ভুয়া তথ্যের ব্যাপক বিস্তার, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে আক্রমণ কিংবা জীবাণু ও রাসায়নিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা বাড়ানোর মতো ঝুঁকি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ রয়েছে।
চীনও এআইয়ের অনিয়ন্ত্রিত সামরিকীকরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মে মাসের শেষ দিকে সিঙ্গাপুরে শাংগ্রি-লা সংলাপে চীনের মেজর জেনারেল মেং শিয়াংছিং বলেন, এআইসহ নতুন প্রযুক্তির সামরিকীকরণ প্রচলিত যুদ্ধনীতি ও যুদ্ধের নৈতিকতার ওপর চাপ তৈরি করছে এবং নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
আগস্টের শেষ দিকে বেইজিংয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সরকারি ও শিল্প খাতের কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত একটি ‘ট্র্যাক ১.৫’ সংলাপেও এআই নিরাপত্তা ছিল গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। এসব উদ্যোগ দেখাচ্ছে, দুই দেশের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা থাকলেও এআইয়ের কিছু ঝুঁকি মোকাবিলায় সহযোগিতার জায়গা তৈরি হতে পারে।
প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দুই দেশ বড় ধরনের এআই দুর্ঘটনা ও সাইবার হামলার দ্রুত তথ্য জানানোর ব্যবস্থা করতে পারে। একই সঙ্গে সন্ত্রাসী ও অপরাধী সংগঠনগুলো কীভাবে এআই অপব্যবহার করছে, সে বিষয়ে তথ্য বিনিময়ের কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে।
তবে এআইকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতার আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। চীনের তৈরি কিছু এআই ব্যবস্থা মানবাধিকার বা তাইওয়ানের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা দেখায় এবং চীনা সরকারের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বক্তব্য দেয়—এমন সমালোচনা রয়েছে।
যদি এসব ব্যবস্থা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ব্যবস্থা ও গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তথ্য ও মতামত উপস্থাপনের ক্ষেত্রে চীনের রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব বাড়তে পারে। চীন এআই নিয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কাঠামো তৈরির উদ্যোগও নিচ্ছে।
তবে চীনা এআইকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে। দেশটির অনেক এআই মডেল তুলনামূলকভাবে কম খরচে ব্যবহার করা যায় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করার সুযোগ রয়েছে। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যদি নিজেদের বাজার থেকে চীনা এআই পুরোপুরি দূরে রাখে, তাহলে বিশ্বের অন্য অনেক দেশে এসব মডেলের প্রভাব আরও বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য শুধু নিষেধাজ্ঞা বা সীমাবদ্ধতার ওপর নির্ভর না করে আরও সক্ষম, নিরাপদ ও সহজে ব্যবহারযোগ্য এআই ব্যবস্থা তৈরির প্রতিযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ।
এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। অত্যাধুনিক এআই মডেল ও ক্লাউড অবকাঠামোয় যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত অবস্থান থাকলেও জাপানের উৎপাদন সক্ষমতা ভবিষ্যতের ‘ফিজিক্যাল এআই’ বা বাস্তব জগতের যন্ত্রনির্ভর এআইয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়া সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ, আর জাপান ও ইউরোপ প্রযুক্তি তৈরির যন্ত্রপাতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব ধরে রাখতে হলে শুধু শক্তিশালী এআই তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; ব্যবহারকারীদের আস্থাও অর্জন করতে হবে। কোনো নিরাপত্তাজনিত কারণে এআই মডেলের প্রবেশাধিকার সীমিত করা হলে কতদিন সেই সীমাবদ্ধতা থাকবে এবং কারা এর আওতায় পড়বে—এসব বিষয়ে শিল্প ও ব্যবহারকারীদের যথাসম্ভব পরিষ্কার তথ্য দেওয়া প্রয়োজন।
এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় বাধা সম্ভবত প্রযুক্তিগত নয়, বরং পারস্পরিক অবিশ্বাস। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা যত বাড়ছে, ততই যৌথ নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরির কাজ কঠিন হতে পারে।
পারমাণবিক অস্ত্রের ইতিহাসও একই সতর্কবার্তা দেয়। হিরোশিমা ও নাগাসাকির ভয়াবহতা এবং পরে কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকট বিশ্বকে বুঝিয়েছিল যে নিয়ন্ত্রণহীন প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত সবার জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। কিন্তু এআইয়ের ক্ষেত্রে সেই ধরনের বৈশ্বিক সংকটবোধ এখনো সর্বত্র তৈরি হয়নি।
হিতোৎসুবাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নোবুমাসা আকিয়ামার মতে, এআই নিয়ে এখনো এমন একটি অভিন্ন সংকটবোধ তৈরি হয়নি, যার ভিত্তিতে ব্যাপক আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে সহজে ঐকমত্য হতে পারে। তাই শুরুতে দুর্ঘটনা জানানোর ব্যবস্থা ও সংকট ব্যবস্থাপনার কাঠামোর মতো বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
তার মতে, নির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো—পরস্পরের সঙ্গে সংঘাতে থাকা দেশগুলো বিপর্যয় ঠেকানোর অভিন্ন স্বার্থে সহযোগিতা করতে পারে কি না, সেই বিষয়টি নিশ্চিত করা।
এআইয়ের যুগে এটাই হয়তো সবচেয়ে বড় শিক্ষা। পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে বিপর্যয়ের পর বিশ্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরির দিকে এগিয়েছিল। কিন্তু এআইয়ের ক্ষেত্রে বিপর্যয় ঘটার আগেই সেই কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। কারণ প্রযুক্তির গতি যত দ্রুত, ভুলের মূল্যও তত বড় হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এআই নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা চলতেই পারে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনা, অপব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি কমাতে তাদের সহযোগিতাও প্রয়োজন। প্রযুক্তিগত আধিপত্যের প্রতিযোগিতা এবং মানবজাতিকে সম্ভাব্য এআই বিপর্যয় থেকে রক্ষা—এই দুই লক্ষ্যকে পরস্পরবিরোধী না করে সমান্তরালভাবে এগিয়ে নেওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ।












