ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কাছে একটি তেল স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে। একই সময়ে ইয়েমেনের রাজধানী সানায় সৌদি আরবের বিমান হামলা আরও তীব্র হয়েছে। এতে কয়েক বছর ধরে তুলনামূলকভাবে স্তিমিত থাকা ইয়েমেন যুদ্ধ নতুন করে বড় আকারের আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শনিবার সৌদি আরামের একটি স্থাপনার কাছে আগুন ও ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। এএফপির এক সাংবাদিক রিয়াদের দক্ষিণে অবস্থিত স্থাপনাটির আশপাশে আগুন নেভাতে দমকলকর্মীদের কাজ করতে দেখেছেন। সেখানে অ্যাম্বুলেন্স ও পুলিশের গাড়িও অবস্থান করছিল।
হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি পরে দাবি করেন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে রিয়াদের একটি তেল স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, হামলার পর লক্ষ্যবস্তু এলাকায় আগুন ধরে যায়। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
অন্যদিকে হুথি-সমর্থিত আল-মাসিরাহ টেলিভিশন জানিয়েছে, সৌদি বিমান সানায় ২৬টি হামলা চালিয়েছে। রাজধানীর দুই সংবাদকর্মীও একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা এবং যুদ্ধবিমান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের কথা জানিয়েছেন। তবে হামলায় হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নির্ভরযোগ্য বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে শনিবার ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় সাদা প্রদেশের টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর প্রকাশ করে হুথি-সমর্থিত গণমাধ্যম। সাদা হুথিদের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।

কয়েক বছরের বিরতির পর ফের সরাসরি সংঘাত
ইয়েমেনে কয়েক বছর তুলনামূলক শান্ত থাকার পর জুলাইয়ে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে আবার সরাসরি সংঘাত শুরু হয়। ইরান-সমর্থিত হুথিরা ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশ, যার মধ্যে রাজধানী সানাও রয়েছে, নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার দেশের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে এবং তাদের প্রধান ঘাঁটি এডেন।
সংঘাত নতুন করে শুরু হওয়ার পেছনে ইরান থেকে সানায় একটি বিমান যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ওই বিমানে হুথিদের একটি প্রতিনিধি দল ছিল এবং সৌদি আরবের অনুমতি নেওয়া হয়নি বলে জানা যায়। এরপর সৌদি আরব সানা বিমানবন্দরে হামলা চালায়। জবাবে ২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো সৌদি ভূখণ্ডে হামলা চালায় হুথিরা।
এরপর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যায়। হুথিরা বাব আল-মান্দাব প্রণালির উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর বড় অংশ দখল করে নেয়। গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
হুথিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পাশাপাশি দেশটির তেল অবকাঠামো ও রাজধানী রিয়াদকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে। একই সঙ্গে লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ চলাচলের ওপর নৌ অবরোধের ঘোষণাও দিয়েছে তারা।
সৌদি তেল অবকাঠামো নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
রিয়াদের কাছে আরামকোর স্থাপনায় আগুনের ঘটনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো এর আগেও আঞ্চলিক সংঘাতের সময় হামলার ঝুঁকিতে পড়েছে। এবার রাজধানীর কাছাকাছি তেল স্থাপনা সরাসরি লক্ষ্যবস্তু হয়ে থাকলে সংঘাতের মাত্রা আরও বাড়তে পারে।
এদিকে হুথিরা দাবি করেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় তাদের নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন এলাকায় সৌদি আরব ৯৪টি বিমান হামলা চালিয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ আবার জানিয়েছে, ইয়েমেন সীমান্তের কাছে নাজরান শহরের একটি স্কুল হুথিদের নিক্ষেপ করা একটি ক্ষেপণাস্ত্র বা প্রক্ষেপণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তীব্র হচ্ছে তাইজের লড়াই
ইয়েমেনের তাইজ শহর ও আশপাশের এলাকাতেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তীব্র লড়াই চলছে। শুক্রবারের সংঘর্ষে উভয় পক্ষই নিজেদের যোদ্ধা নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে।
হুথিরা দাবি করেছে, তাদের ৫৫ জন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইয়েমেন সরকারের পক্ষের সূত্র এএফপিকে জানিয়েছে, তাদের ২৬ জন সেনা নিহত হয়েছেন। তাইজের বিভিন্ন দিক থেকে লড়াই চলছে। সম্প্রতি হুথিদের দখলে যাওয়া উপকূলীয় এলাকার দিকে তাকিয়ে থাকা পাহাড়ি এলাকাগুলোও সংঘর্ষের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
হুথিরা বড় বড় এলাকা দখল করলেও এখনো তাইজ শহরের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি। সানা ও এডেনের পর তাইজ ইয়েমেনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর।
মানবিক পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ
নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের মানবিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি শুক্রবার সতর্ক করে জানিয়েছে, দেশটির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মানুষ তাদের ন্যূনতম খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে পারছে না।
বছরের পর বছর যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট ও অবকাঠামো ধ্বংসের কারণে ইয়েমেন বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকটে থাকা দেশগুলোর একটি। নতুন করে বিমান হামলা, স্থলযুদ্ধ ও সমুদ্রপথে বাধা তৈরি হলে খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ আরও ব্যাহত হতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছে সৌদি আরব বলে খবর এসেছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন পর্যন্ত সেই অনুরোধে সাড়া দেননি বলে জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কয়েকজন কর্মকর্তা শুক্রবার ইয়েমেন পরিস্থিতি ও ইরান সংঘাত নিয়ে বৈঠক করেছেন। বৈঠকটি আগে থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।
রিয়াদের কাছে তেল স্থাপনায় হামলার দাবি এবং সানায় পাল্টা সৌদি হামলা—এই দুই ঘটনা ইয়েমেনের যুদ্ধকে আবারও সরাসরি সৌদি-হুথি সংঘাতে পরিণত করছে। একই সঙ্গে বাব আল-মান্দাব ও লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই তীব্র হলে এর প্রভাব ইয়েমেনের গণ্ডি ছাড়িয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়তে পারে।












