দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রযুক্তি খাত ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে আরও শক্তিশালী করতে হলে ব্যর্থতাকে মেনে নেওয়ার সামাজিক মানসিকতা তৈরি করতে হবে। নতুন উদ্যোগে ঝুঁকি নেওয়া, বারবার চেষ্টা করার সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি উদ্ভাবনে বিনিয়োগের সংস্কৃতি গড়ে উঠলেই এ অঞ্চলে আরও বেশি প্রযুক্তি প্রতিভা তৈরি হবে বলে মনে করেন মালয়েশিয়ার সেমিকন্ডাক্টর প্রতিষ্ঠান এমআই টেকনোভেশনের প্রধান নির্বাহী ওহ কুয়াং ইং।
তার মতে, সিঙ্গাপুর গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য যথেষ্ট সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছে। কিন্তু শুধু অর্থ বিনিয়োগ করলেই হবে না। সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে আগ্রহী দক্ষ মানুষ তৈরি করতে হবে। শিক্ষার্থীদের প্রকৌশল, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আগ্রহ বাড়াতে হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের এই সময়ে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের গুরুত্ব সম্পর্কে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি বলেও মনে করেন ওহ। এ লক্ষ্যেই এমআই টেকনোভেশন সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির সঙ্গে কাজ করছে, যাতে শিক্ষার্থীদের জন্য সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে প্রবেশের আরও পথ তৈরি হয়।
ব্যর্থতাকে শাস্তি দিলে উদ্ভাবন থেমে যায়
ওহের মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি হলো ব্যর্থতার প্রতি সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। কোনো নতুন উদ্যোগ ব্যর্থ হলে উদ্যোক্তা বা প্রতিষ্ঠানকে দ্বিতীয়বার সুযোগ দেওয়ার মানসিকতা এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়।
তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনে সফল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তৈরির পেছনে এমন একটি পরিবেশ কাজ করেছে, যেখানে উদ্যোক্তারা ব্যর্থ হওয়ার পরও আবার চেষ্টা করার সুযোগ পেয়েছেন। তাঁর উদাহরণে, এনভিডিয়া ও টেসলার মতো প্রতিষ্ঠানও একসময় বড় আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছিল। পরে পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগকারীদের সহায়তায় তারা ঘুরে দাঁড়িয়ে বিশ্বসেরা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
ওহ বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও এমন পরিবেশ প্রয়োজন, যেখানে ব্যর্থতাকে সম্পূর্ণ নেতিবাচক হিসেবে দেখা হবে না। মানুষ যদি ব্যর্থতার কারণে সামাজিকভাবে অপমানিত বা শাস্তির মুখে পড়ার আশঙ্কা করে, তাহলে তারা নতুন কিছু করার ঝুঁকি নেবে না। আর ঝুঁকি না নিলে নতুন প্রতিভা ও উদ্ভাবনও তৈরি হবে না।
তাঁর মতে, এই মানসিকতার পরিবর্তন হলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় উদ্ভাবনের মান বাড়তে পারে। এর একটি সূচক হতে পারে পেটেন্টের সংখ্যা বৃদ্ধি। নতুন প্রযুক্তি তৈরি ও পেটেন্ট করার বিষয়টি যদি সমাজে আরও স্বাভাবিক ও সম্মানজনক হয়ে ওঠে, তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা তৈরি হবে।
একই সঙ্গে মেধাস্বত্বের সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে আরও বেশি প্রযুক্তি কোম্পানি ও দক্ষ কর্মী সিঙ্গাপুরের মতো দেশে আকৃষ্ট হতে পারেন।
নিরাপদ পেশার বাইরে যাওয়ার কঠিন লড়াই
গভীর প্রযুক্তি বা ডিপ-টেক ব্যবসায় মানুষকে আকৃষ্ট করা যে কতটা কঠিন, নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই তা জানেন ওহ। ২০১২ সালে এমআই টেকনোভেশন প্রতিষ্ঠার সময় সম্ভাব্য কর্মীদের অনেকেই তাঁর উদ্যোগ নিয়ে সন্দিহান ছিলেন।
হিউলেট-প্যাকার্ড ও পলিটুল ইন্ডাস্ট্রিজে প্রকৌশলী হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা থাকার পরও ওহকে প্রশ্ন শুনতে হয়েছে—যে ব্যবসায় অন্যরা সফল হয়নি, সেখানে তিনি কেন সফল হবেন?
তিনি এই পরিস্থিতির সঙ্গে জোহরে আনারস চাষের উদাহরণ টানেন। কোনো এলাকায় যদি আনারস চাষের জন্য জমি, দক্ষতা, বাজার ও অভিজ্ঞতা আগে থেকেই থাকে, তাহলে উদ্যোক্তারা সাধারণত সেই কম ঝুঁকির ব্যবসার দিকেই ঝোঁকেন। নতুন ও অনিশ্চিত প্রযুক্তি খাতে যাওয়ার আগ্রহ কম থাকে।
তবে সিঙ্গাপুরের আন্তর্জাতিক প্রতিভা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, স্বচ্ছতা এবং অর্থায়নের সুযোগ কাজে লাগাতে এমআই টেকনোভেশন তাদের করপোরেট সদর দপ্তর সিঙ্গাপুরে সরিয়ে নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ সেখানে একটি গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র চালুর পরিকল্পনাও করছে।
এআইয়ের উত্থানে নতুন ব্যবসার বিস্তার
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারকে কাজে লাগিয়ে এমআই টেকনোভেশন তাদের উপকরণ ব্যবসা আলাদা করে সিঙ্গাপুর স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমআই ম্যাটেরিয়াল নামের এই ব্যবসার প্রাথমিক শেয়ার বিক্রি ২০২৬ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে করার পরিকল্পনা রয়েছে। আগস্টে এ উদ্যোগের জন্য স্টক এক্সচেঞ্জের অনুমোদনও পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে এমআইয়ের সেমিকন্ডাক্টর উপকরণ ব্যবসা থেকে আয় হয়েছে ২১৪ কোটি ২০ লাখ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিতের সমপরিমাণ, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯১ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে মূল যন্ত্রপাতি ব্যবসার আয় একই সময়ে বেড়েছে ১০ দশমিক ৩ শতাংশ।
২০২৫ অর্থবছরে যন্ত্রপাতি বিভাগ থেকে আয় হয়েছিল ৩৪৬ কোটি ৩০ লাখ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত, যা মোট আয়ের প্রায় ৫৫ শতাংশ।
সেমিকন্ডাক্টর প্যাকেজিং ও পরীক্ষার বাজারেও এমআইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির চিপ বাছাই ও পরিদর্শন যন্ত্র তাইওয়ানের ৭০ শতাংশের বেশি চিপ প্যাকেজিং ও পরীক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক বাজারের প্রায় অর্ধেক রয়েছে।
সিলিকন কার্বাইডে বড় সম্ভাবনা
এমআই টেকনোভেশন এখন প্রচলিত সেমিকন্ডাক্টর সরঞ্জাম ব্যবসার পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তিতেও প্রবেশ করছে। সিঙ্গাপুরে তাদের নতুন গবেষণা কেন্দ্রটি হবে সিলিকন কার্বাইড বা এসআইসি প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা দ্বিতীয় গবেষণা কেন্দ্র। প্রথমটি রয়েছে তাইওয়ানে।
সিলিকন কার্বাইড উচ্চ ভোল্টেজ ও উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সিতে সাধারণ সিলিকনের তুলনায় ভালোভাবে কাজ করতে পারে। এর তাপ পরিবাহিতাও বেশি, ফলে এটি দ্রুত তাপ ছড়িয়ে দিতে পারে এবং তুলনামূলক ছোট শীতলীকরণ ব্যবস্থা ব্যবহার করা সম্ভব।
ওহের ধারণা, সেমিকন্ডাক্টর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরবর্তী ধাপে সিলিকন কার্বাইডের চাহিদা বাড়তে পারে। বিশেষ করে সবুজ জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যান এবং বড় ডেটা সেন্টারের মতো উচ্চ বিদ্যুৎ ও উচ্চ কারেন্টের প্রয়োগে এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সিঙ্গাপুরের নতুন কার্যালয়ে স্বয়ংক্রিয় যানবাহন প্রযুক্তি নিয়েও কাজ করবে এমআইয়ের আরেকটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান ওহিমা।
নতুন উদ্যোগগুলোর জন্য গবেষণা ও উন্নয়নে প্রায় ১ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি নতুন দুই ব্যবসার পরিচালন ব্যয় বছরে ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। প্রতিষ্ঠানটি আশা করছে, নতুন ব্যবসাগুলো ২০২৮ সালের মধ্যে পুরোপুরি কার্যকর হবে।
২০২৯ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত সময়কে এমআইয়ের পরবর্তী বড় বিকাশের পর্যায় হিসেবে দেখছেন ওহ। তাঁর লক্ষ্য, চারটি ব্যবসা বিভাগই তখন নিজস্ব ব্যবস্থাপনা কাঠামো নিয়ে আয় করবে এবং প্রতিষ্ঠানটিকে নতুন নতুন খাতে সম্প্রসারণের সুযোগ দেবে।
ছোট উদ্যোগ থেকে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান
২০১২ সালে মালয়েশিয়ার পেনাংয়ে ছোট একটি দল নিয়ে সেমিকন্ডাক্টর সরঞ্জামের ব্যবসা শুরু করেছিলেন ওহ। তখন ওয়েফার-লেভেল চিপ-স্কেল প্যাকেজিংয়ে বিশেষায়িত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে চিপকে আরও ছোট করে তৈরি করা যায়, যা ছোট আকারের ইলেকট্রনিক যন্ত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তখন এই বাজারে ইউরোপ ও জাপানের প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোর আধিপত্য ছিল। স্থানীয় পর্যায়ে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা সীমিত থাকায় ওহের উদ্যোগ আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে পারবে—এমন বিশ্বাসও অনেকের ছিল না।
কিন্তু সেই সংশয় পেরিয়ে এমআই টেকনোভেশন আজ মালয়েশিয়ার অন্যতম লাভজনক সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠানটির যন্ত্রপাতি ব্যবসা মালয়েশিয়ার শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় এবং তখন প্রায় ১৯ কোটি ১০ লাখ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত সংগ্রহ করে। পরে প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তন করে এমআই টেকনোভেশন রাখা হয়।
এনভিডিয়া, এএমডি, ইন্টেল বা তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির মতো বড় নামগুলোই সাধারণত সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের আলোচনায় থাকে। কিন্তু মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের এমআইয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বৈশ্বিক চিপ সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে নীরবে কাজ করছে।
ওহের মতে, ভবিষ্যতে সফল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে শুধু বড় কোম্পানির নাম বা বেতন নয়, কাজের ধরন ও নতুন কিছু তৈরির সুযোগকেও গুরুত্ব দিতে হবে। মানুষ যদি শুধু প্রতিষ্ঠানের নাম দেখে চাকরি বেছে না নিয়ে উদ্ভাবনী কাজের সুযোগকে গুরুত্ব দেয়, তাহলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আরও অনেক সফল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারে।












