চীনা প্রযুক্তি জায়ান্ট হুয়াওয়ের সঙ্গে নতুন এক পেটেন্ট চুক্তিতে যাচ্ছে মার্কিন চিপ নির্মাতা কোয়ালকম। চুক্তিটি কার্যকর হলে ৫জি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির জন্য হুয়াওয়ের পেটেন্ট ব্যবহারের বিনিময়ে প্রথমবারের মতো কোয়ালকমকেই অর্থ দিতে হবে। হুয়াওয়ের মেধাস্বত্বের শক্তির জন্য এটিকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে চুক্তিটি কার্যকর করতে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
হুয়াওয়ে সোমবার জানিয়েছে, প্রস্তাবিত ক্রস-লাইসেন্সিং চুক্তির আওতায় কোয়ালকম ৬৮০টির বেশি হুয়াওয়ে পেটেন্ট ব্যবহারের অধিকার পাবে। এসব পেটেন্টের কিছু যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত। চুক্তির আর্থিক মূল্য প্রকাশ করেনি কোনো পক্ষ। তবে এর মূল্য ১৩ কোটি ৩৯ লাখ ডলারের সীমা ছাড়াবে বলে জানা গেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ট-স্কট-রডিনো আইনের আওতায় প্রতিযোগিতা-বিরোধী দিক বিবেচনায় চুক্তিটি মার্কিন ফেডারেল ট্রেড কমিশনের অনুমোদন-পর্যালোচনার আওতায় পড়বে।
হুয়াওয়ের কাছে বর্তমানে সক্রিয় ও আবেদন করা পেটেন্টের সংখ্যা ২ লাখ ৯৬ হাজার ২৪৮টি। সেই বিশাল পেটেন্টভান্ডারের মাত্র ০ দশমিক ২৩ শতাংশের মতো পেটেন্ট এই চুক্তির আওতায় পড়ছে। সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হলেও এসব পেটেন্টের গুরুত্ব অনেক বেশি। এগুলোর মধ্যে ৫জি, এআই এবং নেটওয়ার্কিং প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন রয়েছে।
চুক্তির আওতায় থাকা প্রযুক্তির মধ্যে রয়েছে হুয়াওয়ের ‘নিয়ার-প্যাকেজড অপটিকস’ বা এনপিও আন্তঃসংযোগ প্রযুক্তি। এর পাশাপাশি রয়েছে সেমিকন্ডাক্টর ও সিস্টেম নকশার নতুন কিছু নীতি, যেগুলোকে হুয়াওয়ে ‘টাও স্কেলিং ল’ নামে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।
গত মে মাসে উন্মোচিত এই পদ্ধতিতে শুধু ট্রানজিস্টরের আকার ছোট করার প্রচলিত কৌশলের ওপর নির্ভর না করে অন্য প্রযুক্তিগত পদ্ধতি ব্যবহার করে চিপের কর্মক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর প্রযুক্তি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের কারণে মার্কিন প্রযুক্তি সংগ্রহে হুয়াওয়ের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, সেই পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটি এই প্রযুক্তিকে নিজেদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছে।
হুয়াওয়ের প্রধান মেধাস্বত্ব কর্মকর্তা অ্যালান ফ্যান বলেন, কয়েক দশক ধরে মৌলিক গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি মোবাইল প্রযুক্তিতে নেতৃত্বের অবস্থান তৈরি করেছে। কোয়ালকমের সঙ্গে নতুন চুক্তি হুয়াওয়ের উদ্ভাবন ও মেধাস্বত্বের প্রতি বাজারের স্বীকৃতি এবং প্রতিষ্ঠানটির উদ্ভাবনী সক্ষমতার প্রতি তাদের অঙ্গীকারের প্রতিফলন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
কোয়ালকমের প্রযুক্তি লাইসেন্সিং বিভাগের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ও মহাব্যবস্থাপক জন হ্যানও হুয়াওয়ের প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের স্বীকৃতি হিসেবে চুক্তিটির গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তার ভাষায়, ৫জি ও অন্যান্য প্রযুক্তি খাতে হুয়াওয়ের ধারাবাহিক উদ্ভাবন এবং মেধাস্বত্বকে কোয়ালকম স্বীকৃতি দিচ্ছে। একই সঙ্গে কোয়ালকম ৫জি প্রযুক্তিতে নিজেদের নেতৃত্বের কথাও তুলে ধরেছে এবং জানিয়েছে, তাদের মৌলিক বেতার প্রযুক্তিতে বিনিয়োগই মোবাইল প্রযুক্তির একের পর এক প্রজন্মের বিকাশে ভূমিকা রেখেছে।
দুই প্রতিষ্ঠানের পেটেন্ট সম্পর্ক অবশ্য দীর্ঘদিনের। ২০০১ সালে হুয়াওয়ে প্রথম কোয়ালকমের পেটেন্ট ব্যবহারের জন্য অর্থ দেয়। এরপর প্রায় ২৫ বছর ধরে দুই প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক পেটেন্ট লাইসেন্সিংয়ে হুয়াওয়েই ছিল কোয়ালকমকে অর্থ দেওয়া পক্ষ। নতুন বহু বছরের চুক্তি কার্যকর হলে প্রথমবারের মতো সেই চিত্র পাল্টে যাবে—দুই প্রতিষ্ঠানের ক্রস-লাইসেন্সিং ব্যবস্থায় কোয়ালকমই হবে নিট অর্থদাতা।
এই চুক্তির আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো এর সময়কাল। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে শুল্ক, এআই, বিরল খনিজ ও প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে টানাপোড়েন চলার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বছরের দ্বিতীয় আনুষ্ঠানিক শীর্ষ বৈঠক শেষ করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে দুই দেশের প্রযুক্তি খাতের দুই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের এই পেটেন্ট সমঝোতা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
জিএফ সিকিউরিটিজের বিদেশি প্রযুক্তি ও যোগাযোগ গবেষণা বিভাগের প্রধান জেফ পু মনে করেন, চীনের বাজার কোয়ালকমের জন্য এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন গ্রাহক, বিশেষ করে বাইটড্যান্সের মতো প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যবসা বাড়ানোর চেষ্টা করছে কোয়ালকম। একই সঙ্গে এআই ডেটা সেন্টার সার্ভারের ব্যবসায় প্রবেশের চেষ্টা চালালে উন্নত স্তরভিত্তিক চিপ প্রযুক্তি ও আন্তঃসংযোগ ব্যবস্থার বিস্তৃত পরিসরের প্রয়োজন হতে পারে।
কোয়ালকম ঠিক কোন কোন হুয়াওয়ে প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য এই চুক্তি করেছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। চুক্তিতে কোয়ালকম হুয়াওয়ের কাছে নিজেদের কতটি পেটেন্ট লাইসেন্স দিচ্ছে বা সেগুলো কী ধরনের পেটেন্ট—সেটিও প্রকাশ করা হয়নি।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের চাপের মধ্যে হুয়াওয়ে গত কয়েক বছর ধরে নিজস্ব প্রযুক্তি সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে জোর দিয়েছে। চীনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে তারা বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের চিপ, এআই প্রযুক্তি ও সার্ভার অবকাঠামো গড়ে তুলতে চাইছে।
এরই অংশ হিসেবে সেপ্টেম্বরে হুয়াওয়ে তাদের নতুন কিরিন ৯০৫০ প্রো প্রসেসর উন্মোচন করে। এটি তিন ভাঁজ করা স্মার্টফোন মেট এক্সটি২-তে ব্যবহার করা হয়েছে। হুয়াওয়ের দাবি অনুযায়ী, এই প্রসেসরেই প্রথমবারের মতো ‘টাও স্কেলিং ল’ প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে।
শুধু স্মার্টফোন চিপেই থেমে নেই প্রতিষ্ঠানটি। সম্প্রতি এআই অ্যাকসেলারেটর, কেন্দ্রীয় প্রসেসর এবং নেটওয়ার্কিং প্রসেসরসহ মোট ১১টি নতুন চিপ উন্মোচন করেছে হুয়াওয়ে। এর মাধ্যমে চীনের নিজস্ব এআই চিপ ও সার্ভার প্রযুক্তির বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করার পাশাপাশি এনভিডিয়া, ব্রডকম, ইন্টেল ও এএমডির মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছে তারা।
আগস্টেও যুক্তরাষ্ট্রের কম্পিউটার নির্মাতা এইচপির সঙ্গে ওয়াই-ফাই সংযোগ প্রযুক্তি নিয়ে একটি বহু বছরের ক্রস-লাইসেন্সিং চুক্তি করে হুয়াওয়ে। ফলে কোয়ালকমের সঙ্গে নতুন চুক্তিটি হুয়াওয়ের পেটেন্ট সম্পদের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক গুরুত্বের আরেকটি উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।
হুয়াওয়ে জানিয়েছে, কোয়ালকমের সঙ্গে নতুন চুক্তির পর তাদের মেধাস্বত্ব পেটেন্ট লাইসেন্সিং থেকে সঞ্চিত আয় ৬৯০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও প্রযুক্তি অবরোধের মধ্যেও হুয়াওয়ে শুধু নিজস্ব প্রযুক্তি তৈরি করছে না, সেই প্রযুক্তির মেধাস্বত্বকে বৈশ্বিক বাজারে অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করার পথও তৈরি করছে।
তবে চুক্তিটির চূড়ান্ত বাস্তবায়ন এখনো নিশ্চিত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী নির্ধারিত আর্থিক সীমা অতিক্রম করায় চুক্তিটি ফেডারেল ট্রেড কমিশনের পর্যালোচনার মুখে পড়বে। ফলে হুয়াওয়ে ও কোয়ালকমের এই নতুন পেটেন্ট সমঝোতা শেষ পর্যন্ত কোন পর্যায়ে যায়, সেদিকে নজর থাকবে প্রযুক্তি ও বাণিজ্য অঙ্গনের।
সব মিলিয়ে, ২০০১ সালে যে হুয়াওয়ে কোয়ালকমের পেটেন্ট ব্যবহারের জন্য অর্থ দেওয়া শুরু করেছিল, প্রায় ২৫ বছর পর সেই সম্পর্কের হিসাব এবার উল্টো দিকে যাচ্ছে। নতুন চুক্তি অনুমোদন পেলে কোয়ালকমকে হুয়াওয়ের পেটেন্ট ব্যবহারের জন্য অর্থ দিতে হবে। আর এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের সময়েও হুয়াওয়ের ৫জি, এআই ও উন্নত চিপ প্রযুক্তির মেধাস্বত্ব কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তার একটি শক্তিশালী বার্তা পাওয়া যাবে।












