ভারতের বৈধ ভিসা থাকলেই কোনো বিদেশি নাগরিকের দেশটিতে প্রবেশের আইনগত অধিকার নিশ্চিত হয় না। এমনই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছে দিল্লি হাইকোর্ট। আদালত বলেছে, বিদেশি নাগরিকের ভারতে প্রবেশের বিষয়টি রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা, জাতীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা ও প্রচলিত অভিবাসন আইনের আওতাধীন।
এই রায়টি এসেছে তুর্কমেনিস্তানের এক নাগরিকের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে। ওই নারী বৈধ ব্যবসায়িক ভিসা থাকা সত্ত্বেও দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভারতে প্রবেশের অনুমতি পাননি। অথচ একই বিমানে তার সঙ্গে আসা স্বামীকে ভারতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
বিমানবন্দরেই আটকে দেওয়া হয়
ওই তুর্কমেনিস্তানের নাগরিক ২৫ মার্চ স্বামীর সঙ্গে ভারতে আসেন। তার কাছে ভারতীয় দূতাবাস, আশগাবাত থেকে দেওয়া বৈধ ব্যবসায়িক ভিসা ও বৈধ পাসপোর্ট ছিল। কিন্তু দিল্লি বিমানবন্দরে তাকে আটকে দেওয়া হয় এবং একই দিন তুর্কমেনিস্তানে ফিরে যেতে হয়।
এরপর তিনি দিল্লি হাইকোর্টে আবেদন করেন। তার দাবি ছিল, কেন তাকে ভারতে ঢুকতে দেওয়া হয়নি, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে লিখিত কারণ জানাতে হবে। একই সঙ্গে বৈধ ব্যবসায়িক ভিসা থাকার কারণে তাকে ভারতে প্রবেশের অনুমতিও দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
আবেদনকারী আরও যুক্তি দেন, তার স্বামী একই ধরনের ভিসা নিয়ে ভারতে প্রবেশের অনুমতি পেয়েছেন। কিন্তু তাকে দেওয়া হয়নি। ফলে তার সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
সংবিধানের ১৪ ও ২১ অনুচ্ছেদের যুক্তি
ওই নারী আদালতে মূলত দুটি বিষয় তুলে ধরেন। প্রথমত, তাকে ভারতে প্রবেশে বাধা দেওয়ার কারণ জানানো হয়নি। দ্বিতীয়ত, স্বামীকে প্রবেশের অনুমতি দিয়ে তাকে আটকে রাখার ঘটনা সংবিধানের ১৪ ও ২১ অনুচ্ছেদের অধীনে তার অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ভারতীয় সংবিধানের ১৪ অনুচ্ছেদ আইনের চোখে সমতার নিশ্চয়তা দেয়। আর ২১ অনুচ্ছেদ জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সুরক্ষা নিয়ে কাজ করে।
তবে কেন্দ্রীয় সরকার এই যুক্তি মানেনি। সরকারের বক্তব্য ছিল, কোনো বিদেশি নাগরিককে ভিসা দেওয়া মানেই তাকে ভারতে প্রবেশের নিশ্চয়তা দেওয়া নয়। ভিসা প্রদান এবং সীমান্তে প্রবেশের অনুমতি—দুটি আলাদা বিষয়। ভারতে প্রবেশের সময় অভিবাসন কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী অতিরিক্ত যাচাই করতে পারে।
‘বিরূপ তথ্য’ পাওয়ার দাবি কেন্দ্রের
কেন্দ্রীয় সরকার আদালতকে জানায়, ওই নারীর বিষয়ে কিছু ‘বিরূপ তথ্য’ বা উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। জাতীয় নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার স্বার্থেই তাকে ভারতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে সরকার জানায়।
সরকারের দেওয়া কিছু নথি আদালত গোপনীয়ভাবে বা সিল করা খামে পরীক্ষা করে। এসব উপাদানের মধ্যে তার ব্যক্তিগত তথ্যের কিছু অসঙ্গতি, ব্যবসায়িক কার্ড বা আমন্ত্রণপত্রের অনুপস্থিতি এবং তিনি যে ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করেছেন, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকার বিষয় উল্লেখ করা হয়।
আদালত তার আগের চিকিৎসা ও ব্যবসায়িক ভ্রমণের ইতিহাসও বিবেচনায় নেয়।
স্বামী ঢুকতে পারলেও কেন তিনি ঢুকতে পারলেন না?
আবেদনকারীর অন্যতম যুক্তি ছিল, একই পরিবারের দুজন একই বিমানে ভারতে এসেছেন এবং একই ধরনের ভিসা ছিল। তাহলে একজনকে ঢুকতে দেওয়া হলো, অন্যজনকে কেন নয়?
দিল্লি হাইকোর্ট এই যুক্তি গ্রহণ করেনি। আদালত বলেছে, শুধু স্বামীকে ভারতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলেই দুজনকে সব দিক থেকে একই অবস্থানে থাকা ব্যক্তি হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, যেসব ‘বিরূপ তথ্য’ পাওয়া গিয়েছিল, সেগুলো নির্দিষ্টভাবে ওই নারীর সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। ফলে তার ক্ষেত্রে আলাদা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই কারণে আদালত মনে করেছে, শুধু স্বামীকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল—এই তথ্য দিয়ে সংবিধানের ১৪ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হয় না।
ভিসা কি তাহলে শুধু প্রবেশের প্রাথমিক অনুমতি?
আদালতের রায়ের মূল বক্তব্য এখানেই। বৈধ ভিসা থাকলেও তা ভারতে প্রবেশের একটি পরম ও শর্তহীন অধিকার তৈরি করে না।
আদালত বলেছে, ভিসা পাওয়ার জন্য নির্ধারিত শর্ত পূরণ করা এবং সীমান্তে গিয়ে দেশটিতে প্রবেশের অনুমতি পাওয়া একই বিষয় নয়। বিমানবন্দরে একজন বিদেশির পাসপোর্ট, ভ্রমণ নথি ও ভিসা পরীক্ষা করার ক্ষমতা অভিবাসন কর্মকর্তার রয়েছে। প্রয়োজন হলে তিনি অতিরিক্ত তথ্যও চাইতে পারেন।
অর্থাৎ, ভিসা থাকলেও প্রবেশের পর্যায়ে কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যক্তিকে অগ্রহণযোগ্য মনে করলে আইন অনুযায়ী তাকে প্রবেশে বাধা দেওয়া যেতে পারে।
নতুন আইনে কী বলা আছে?
এই মামলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে ২০২৫ সালের ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্ট’-এর। ভারতে বিদেশিদের প্রবেশ ও অবস্থানের আইনি কাঠামো নির্ধারণে এই আইন গুরুত্বপূর্ণ।
আইনের ৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী, ভারতে প্রবেশ করতে ইচ্ছুক বিদেশির বৈধ পাসপোর্ট বা ভ্রমণ নথি এবং বৈধ ভিসা থাকতে হবে। তবে কোনো বিদেশি জাতীয় নিরাপত্তা, ভারতের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা, অন্য কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক, জনস্বাস্থ্য বা আইনে নির্ধারিত অন্য কোনো কারণে অগ্রহণযোগ্য হলে তাকে ভারতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না।
আইনের ৭ নম্বর ধারায় কেন্দ্রীয় সরকারকে বিদেশিদের ভারতে প্রবেশ, দেশত্যাগ, অবস্থান বা ভারতে থাকার ধারাবাহিকতা নিয়ন্ত্রণ, সীমিত বা নিষিদ্ধ করার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, বৈধ ভিসা থাকা প্রয়োজনীয় শর্ত হলেও সেটিই চূড়ান্ত শর্ত নয়।
পুরোনো দুই সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ওপর নির্ভরতা
দিল্লি হাইকোর্ট তার সিদ্ধান্তে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের দুটি পুরোনো গুরুত্বপূর্ণ রায়ের ওপরও নির্ভর করেছে।
১৯৫৫ সালের Hans Muller of Nurenburg বনাম Superintendent, Presidency Jail মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, বিদেশিদের বিষয়ে তৎকালীন Foreigners Act-এর অধীনে কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যাপক ক্ষমতা রয়েছে, যার মধ্যে বিদেশিকে দেশ থেকে বহিষ্কারের ক্ষমতাও অন্তর্ভুক্ত।
পরবর্তী সময়ে ১৯৯১ সালের Louis De Raedt বনাম Union of India মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছিল, বিদেশিরাও সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের অধীনে জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সুরক্ষা পান। তবে ভারতে বসবাস ও স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপনের অধিকার সংবিধানের ১৯(১)(ই) অনুচ্ছেদের অধীনে শুধু ভারতীয় নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য।
আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
দিল্লি হাইকোর্ট শেষ পর্যন্ত ৩০ সেপ্টেম্বর ওই নারীর আবেদন খারিজ করে দেয়।
আদালতের মতে, কোনো বিদেশি নাগরিকের ভারতে প্রবেশের অন্তর্নিহিত বা আইনগতভাবে বলবৎযোগ্য অধিকার নেই। তাই বৈধ ভিসা থাকার ভিত্তিতে কর্তৃপক্ষকে তাকে ভারতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার মতো আইনি ভিত্তি আদালতের সামনে তৈরি হয়নি।
এই রায় থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো—ভারতের ভিসা মূলত প্রবেশের প্রয়োজনীয় অনুমোদন, কিন্তু সেটি সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশের নিঃশর্ত নিশ্চয়তা নয়। শেষ পর্যন্ত বিমানবন্দরে অভিবাসন যাচাই এবং দেশের আইন ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিবেচনাও প্রবেশের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখতে পারে।












