ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপে মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি মহড়ায় যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের নতুন চিত্র দেখা গেছে। সৈন্যদের বুকের সঙ্গে থাকা স্মার্টফোনে দেখা যাচ্ছিল তাদের ও ইউনিটের সদস্যদের অবস্থান। ওয়াই-ফাই সুবিধাসম্পন্ন রেডিওর মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছিল একটি চলমান যোগাযোগ নেটওয়ার্ক। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্যাটেলাইট ইন্টারনেট এবং যুদ্ধক্ষেত্রের তাৎক্ষণিক মানচিত্র।
সুমাত্রার বাতুরাজায় অনুষ্ঠিত মহড়ায় মার্কিন সেনারা এমন একটি প্রযুক্তি ব্যবস্থা পরীক্ষা করেন, যার লক্ষ্য হলো যুদ্ধের সময় ছড়িয়ে থাকা সেনাদের মধ্যে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ নিশ্চিত করা এবং কমান্ডারদের হাতে যুদ্ধক্ষেত্রের প্রায় তাৎক্ষণিক চিত্র তুলে দেওয়া।
এই ব্যবস্থার নাম ‘নেক্সট জেনারেশন কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল’ বা এনজিসি২। মার্কিন সেনাবাহিনীর বড় ধরনের এই উদ্যোগে সিলিকন ভ্যালিসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের তৈরি যোগাযোগ, মানচিত্র, তথ্য বিশ্লেষণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি যুক্ত করা হচ্ছে।
তবে ইন্দোনেশিয়ার মহড়াতেই প্রযুক্তিটির একটি বড় দুর্বলতাও সামনে আসে।
একটি শত্রু অবস্থানে হামলার সময় প্রথম লেফটেন্যান্ট দিয়েগো গনজালেজের স্মার্ট ডিভাইসে সমস্যা দেখা দেয়। চারপাশে গুলি চলার মধ্যে তার কমান্ডার রেডিওতে তাকে শুনতে পাচ্ছিলেন না। গনজালেজ ডিভাইসটি পুনরায় চালু করেন। সেটি চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত তাকে পাশের সেনাদের মাধ্যমে বার্তা কমান্ড চেইনে পাঠাতে হয়।
মহড়াটির কমান্ডার ক্যাপ্টেন জনাথন মুরাস্কি বলেন, এই সমস্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ঘটেছিল। কারণ কোনো কমান্ডার যদি একজন সেনার কাছ থেকে হঠাৎ যোগাযোগ না পান, তাহলে তিনি ধরে নিতে পারেন ওই সেনা হয়তো আহত বা নিহত হয়েছেন।
ঘটনাটি দেখিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, যোগাযোগ ব্যবস্থা সামান্য সময়ের জন্য অচল হয়ে পড়লেও তা বড় সমস্যার কারণ হতে পারে।
ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের যুগে বদলাচ্ছে যুদ্ধের কৌশল
মার্কিন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, সস্তা ড্রোন ও নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্রের বিস্তারের কারণে যুদ্ধের পুরোনো ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বড় আকারের সেনা ও সরঞ্জাম এক জায়গায় জড়ো করে রাখলে সেগুলো সহজেই শত্রুর নজরে পড়ে আক্রমণের লক্ষ্য হতে পারে।
এ কারণে নতুন ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো সেনাদের ছড়িয়ে দিয়ে এবং চলমান অবস্থায় রেখেও তাদের মধ্যে নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ বজায় রাখা। একই সঙ্গে কমান্ডাররা যেন যুদ্ধক্ষেত্রে কোন সেনা কোথায় আছে, কোন লক্ষ্য কোথায় রয়েছে এবং কোন ইউনিট কী অবস্থায় আছে—এসব তথ্য দ্রুত দেখতে পারেন, সেটিও নিশ্চিত করা।
এই প্রযুক্তি সফলভাবে কাজ করলে সামনে থাকা কোনো পদাতিক ইউনিট শত্রুর অবস্থান শনাক্ত করার পর পেছনে থাকা কামান ইউনিটের সেই লক্ষ্যবস্তুতে হামলার প্রস্তুতি নিতে যে সময় লাগে, তা কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক মিনিটে নামিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এনজিসি২ ব্যবস্থায় ৮০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। এর মধ্যে রয়েছে সাঁজোয়া যানে বসানো স্যাটেলাইট ইন্টারনেট টার্মিনাল থেকে শুরু করে এমন তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো, যা আগে আলাদা থাকা বিভিন্ন অস্ত্রব্যবস্থা ও সেন্সরকে একই নেটওয়ার্কে যুক্ত করতে পারে।
মহড়ায় যুক্ত স্টারশিল্ড
ইন্দোনেশিয়ার মহড়ায় অংশ নেওয়া সেনাদের একটি স্ট্রাইকার সাঁজোয়া যানে স্পেসএক্সের সামরিক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবস্থা স্টারশিল্ড যুক্ত করা হয়েছিল। মহড়ায় যাওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে যানে এই ব্যবস্থা বসানো হয়।
এর মাধ্যমে ইউনিটটি পেছনের কমান্ড পোস্টের সঙ্গে ক্লাউডভিত্তিক যোগাযোগ রাখতে পারছিল। দূরে অবস্থান করা কমান্ডাররাও মাঠের সেনাদের মতো একই যুদ্ধক্ষেত্রের মানচিত্র দেখতে পারছিলেন। সেখানে সেনাদের অবস্থান তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যাচ্ছিল।
মহড়ার সামগ্রিক কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এড ম্যাথাইডেস বলেন, আগে মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রধান কমান্ড পোস্টগুলো ২৫০ থেকে ৩০০ সদস্যের বিশাল তাঁবু কাঠামোতে পরিচালিত হতো। সেগুলো স্থাপন করতে কয়েক ঘণ্টা লাগত এবং বড় আকারের স্যাটেলাইট অ্যান্টেনার ওপর নির্ভর করতে হতো। সেই যোগাযোগ ব্যবস্থাও তুলনামূলক ধীর ছিল।
নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই কাঠামো অনেক বেশি ছোট, দ্রুত ও মোবাইল করার চেষ্টা চলছে।
ম্যাথাইডেসের ভাষায়, চীনের মতো বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র বা সেনা যুক্তরাষ্ট্রের নাও থাকতে পারে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যগুলো যদি দ্রুত শনাক্ত করা যায়, তাহলে প্রতিটি হামলাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব।
২০৩২ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে
মার্কিন সেনাবাহিনীতে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার সক্রিয় সদস্য রয়েছে। এত বড় বাহিনীতে এনজিসি২ প্রযুক্তি পুরোপুরি ছড়িয়ে দেওয়া সহজ নয়। সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, পুরো বাহিনীতে এই ব্যবস্থা চালু করতে ২০৩২ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
তবে এর গতি ও ব্যয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রশ্নও উঠেছে। আগস্টে কংগ্রেসের নিরপেক্ষ নজরদারি সংস্থা সরকারি হিসাব নিরীক্ষা কার্যালয় জানায়, কোন ইউনিট কখন নতুন প্রযুক্তি পাবে—এমন বিস্তারিত সময়সূচি সেনাবাহিনীর কাছে তখনও ছিল না। দীর্ঘমেয়াদে এই কর্মসূচির মোট ব্যয় সম্পর্কেও সেনাবাহিনীর পূর্ণাঙ্গ ধারণা ছিল না বলে সংস্থাটি উল্লেখ করে।
এর জবাবে সেনাবাহিনী জানায়, তারা এনজিসি২ বাস্তবায়নের বিস্তারিত পরিকল্পনা এবং সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব তৈরি করেছে। তবে পুরো কর্মসূচিতে শেষ পর্যন্ত কত অর্থ ব্যয় হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট অঙ্ক প্রকাশ করা হয়নি।
২০২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে এনজিসি২-এর জন্য প্রায় ৩৮০ কোটি ডলার চাওয়া হয়েছে বলে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন সেনা মেজর জেনারেল ও গবেষক জন ফেরারি মনে করেন, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সময়ে ছয় বছরও অনেক দীর্ঘ সময়। তার মতে, আরও দ্রুত এবং বেশি অর্থ নিয়ে এই কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়া ভালো।
ইউক্রেনের যুদ্ধও বড় শিক্ষা
এনজিসি২-এর পেছনে ইউক্রেনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতাও বড় ভূমিকা রাখছে। ইউক্রেনে ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার যুদ্ধক্ষেত্রে নজরদারি, লক্ষ্য শনাক্তকরণ ও হামলার সমন্বয়কে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
মার্কিন সেনাবাহিনীর সাবেক সচিব ড্যান ড্রিসকল এর আগে ইউক্রেনের তৈরি কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রশংসা করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইউক্রেনের ব্যবস্থা ড্রোন, সেন্সর ও আক্রমণকারী প্ল্যাটফর্মগুলোকে একটি নেটওয়ার্কে যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। বিপরীতে এনজিসি২ চালুর আগে মার্কিন সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাগুলো এতটা সমন্বিত ছিল না।
২০২৪ সালে এনজিসি২ ধারণার প্রাথমিক পরীক্ষা শুরু হয়। এখন এর প্রযুক্তি ধীরে ধীরে বড় পরিসরে ব্যবহারের দিকে যাচ্ছে।
ইন্দোনেশিয়ার মহড়া তাই শুধু নতুন প্রযুক্তির সক্ষমতা প্রদর্শনের ঘটনা নয়। এটি একই সঙ্গে দেখিয়েছে, ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত তথ্য পাওয়া, নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ এবং বিভিন্ন অস্ত্র ও সেন্সরকে একই নেটওয়ার্কে যুক্ত করার সক্ষমতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
তবে গনজালেজের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনাটিও মনে করিয়ে দিয়েছে—যুদ্ধক্ষেত্রে স্মার্টফোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্যাটেলাইট যোগাযোগ যতই উন্নত হোক, প্রযুক্তি ব্যর্থ হলে সেনাদের বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থাও থাকতে হবে।












