নাইজেরিয়ার লাগোসের রাস্তায় ফ্যাশন নিয়ে নিজের মতো করে যে তরুণী পরিচিতি তৈরি করেছিলেন, এবার সেই র্যাচেল ওজুরোমিই হাঁটলেন বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ফ্যাশন মঞ্চে। ২২ বছর বয়সী এই মডেলের অভিষেক হলো চ্যানেলের স্প্রিং ২০২৭ শোতে, প্যারিসের গ্রাঁ পালে।
প্যারিসে যাওয়ার স্বপ্ন র্যাচেলের বহুদিনের। ২০২০ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি এমন ভিডিও প্রকাশ করতেন, যেখানে কল্পনা করতেন একদিন তিনি প্যারিসে থাকবেন। কয়েক বছর পর সেই কল্পনাই বাস্তবে পরিণত হয়েছে। প্যারিসে পৌঁছানোর দ্বিতীয় রাতেই বন্ধুদের নিয়ে ভোর ৩টার দিকে আইফেল টাওয়ার দেখতে ছুটে যান তিনি। দেশে থাকা পরিচিতজনদের সঙ্গে ভাগ করে নেন সেই আনন্দও।
তবে আইফেল টাওয়ার দেখা কিংবা প্যারিসের খাবার, ম্যাচা আর বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর চেয়েও বড় মুহূর্ত অপেক্ষা করছিল তার জন্য। চ্যানেলের র্যাম্পে পা রাখার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন দুনিয়ায় আনুষ্ঠানিক অভিষেক হয় তার।
র্যাচেলের উত্থানের গল্পটিও বেশ আলাদা। তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু, স্টাইলিস্ট ও ডিজাইনার ডেবি ফাসিংহার সঙ্গে কাজ করে তিনি লাগোসের রাস্তাকেই নিজের ফ্যাশন মঞ্চে পরিণত করেছিলেন। বেগুনি রঙের ঝালরযুক্ত স্কার্ট, পশুর ছাপের পোশাক, ঢিলেঢালা স্যুট, স্তরযুক্ত পোশাক কিংবা করসেট পরা গাউন—বিভিন্ন সাজে তাকে দেখা গেছে বাজারে সবজি কিনতে, খবরের কাগজ আনতে কিংবা মাথায় কলার ঝুড়ি নিয়ে হাঁটতে।
এসব ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তার হাঁটার ভঙ্গি, উজ্জ্বল রং, নানা ধরনের পোশাক এবং নাইজেরিয়ার চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতির প্রভাব তাকে আলাদা করে তুলেছে। ফ্যাশন দুনিয়া যখন তার জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত ছিল না, তখন তিনি যেন নিজের চারপাশেই একটি ফ্যাশন জগৎ তৈরি করে নিয়েছিলেন।
লাগোস তার পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নাইজেরিয়ায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা র্যাচেলের কাজের মধ্যে শহরটির জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও মানুষের প্রভাব স্পষ্ট। নিজের সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে তিনি ‘দ্য প্রসেস আফ্রিকা’ নামে একটি সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্মও গড়ে তুলেছেন।
চ্যানেলের সঙ্গে র্যাচেলের সম্পর্ক অবশ্য একেবারে হঠাৎ তৈরি হয়নি। চ্যানেলের পুরোনো সংগ্রহ নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিজের পোশাকে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। পরে চ্যানেলের মেতিয়ের দ’আর শোয়ের অনুকরণে তৈরি একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়। র্যাচেলের ভাষায়, সেই ভিডিওই তাকে আজকের জায়গায় পৌঁছানোর পথ তৈরি করে দেয়।
তবে নিজের সাফল্যকে তিনি রাতারাতি পাওয়া অর্জন হিসেবে দেখতে চান না। তার মতে, একটি সাফল্যের পেছনে বহু বছরের কাজ, নানা ঘটনা এবং ছোট ছোট প্রচেষ্টা একসঙ্গে কাজ করে। নিজের কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তিনি বরাবরই জেদি ছিলেন বলেও জানিয়েছেন।
চ্যানেল থেকে আমন্ত্রণ পাওয়ার খবরটিও আসে একেবারে সাধারণ একটি দিনে। তখন তিনি বাড়িতে গাউন পরে ছিলেন। খবর পাওয়ার পর প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল প্রায় নির্বিকার—মনে হয়েছিল, ‘অবশ্যই।’ কিন্তু প্রথমবার মডেলদের সারিতে দাঁড়ানোর পর পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারেন তিনি। আবেগে কেঁদে ফেলেন।
চ্যানেলের নতুন সৃজনশীল পরিচালক মাতিয়ু ব্লাজির অধীনে র্যাচেলের এই অভিষেকের আলাদা তাৎপর্যও আছে। গত বছর গ্যাব্রিয়েল চ্যানেলের জীবন নিয়ে একটি পডকাস্ট শুনতে শুনতে র্যাচেল মুগ্ধ হয়েছিলেন। নিজের ইচ্ছা ও স্বপ্নের পেছনে দৃঢ়ভাবে ছুটে চলা এই নারীর গল্প তাকে অনুপ্রাণিত করেছিল।
ব্লাজির কাজও র্যাচেলের আগে থেকেই পছন্দ ছিল। বোতেগা ভেনেতায় তার তৈরি পোশাক দেখে সরলতার শক্তি তাকে আকৃষ্ট করেছিল। পরে যখন জানতে পারেন ব্লাজি চ্যানেলে যাচ্ছেন, তখন তার মনে হয়েছিল—তার দুটি পছন্দের জগৎ যেন এক জায়গায় এসে মিলেছে।
চ্যানেলের র্যাম্পে র্যাচেলের পোশাকেও ছিল বিশেষ অর্থ। তিনি পরেছিলেন ধূসর ও হলুদ রঙের টুইড শার্ট এবং মিডি স্কার্ট। হলুদ ছিল তার বন্ধু ডেবির প্রিয় রং। পোশাকটি দেখেই র্যাচেলের মনে হয়েছিল, এটি হয়তো কোনো বিশেষ ইঙ্গিত।
তার সাজসজ্জাও ছিল তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক। ঝকঝকে ত্বক, পরিপাটি করে পেছনে বাঁধা বিনুনি এবং খুব বেশি বাড়াবাড়ি না করা মেকআপ—সব মিলিয়ে তাকে নিজের মতোই দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। বিষয়টি র্যাচেলেরও ভালো লেগেছে।
শোয়ের আগের রাত কেটেছে পোশাক ঠিকঠাক করা, চুলের কাজ এবং বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে। এরপর আবারও আইফেল টাওয়ারে ছুটে যান তিনি। পরদিন সকালে ম্যাচা পান করে ভালোভাবে ঘুম থেকে উঠে প্রস্তুত হন। কারণ, তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল র্যাম্পে যাওয়ার আগে শরীর ও মন দুটোই সতেজ রাখা।
নিজের হাঁটার অনুশীলনও করেন র্যাচেল। লাগোসের রাস্তায় তার প্রাণবন্ত হাঁটার ভিডিও লাখো মানুষের নজর কেড়েছিল ঠিকই, কিন্তু চ্যানেলের র্যাম্পে ওঠার আগে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা নার্ভাস ছিলেন। তার ভয় ছিল, পা যেন না আটকে যায় বা কোনো ভুল না হয়।
অভিজ্ঞ মডেল ভবিতা মান্দাভা ও আনোক ইয়ের মতো সহকর্মীরা তাকে সাহস দেন। তারা র্যাচেলকে শান্ত থাকতে, স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে মনে করিয়ে দেন—এই মঞ্চে থাকার যোগ্যতা তার আছে।
শেষ পর্যন্ত সেই আত্মবিশ্বাসই কাজে আসে। র্যাম্পে ওঠার পর ভয় অনেকটাই কেটে যায়। নিজের ভাষায়, তখন তিনি শুধু মুহূর্তটি উপভোগ করছিলেন এবং মনে হচ্ছিল, ‘আমি এখানে থাকার যোগ্য।’
তবে মঞ্চে ওঠার আগে আবারও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন র্যাচেল। চোখে পানি চলে এলে আশপাশের সবাই তাকে সাহস দেন। কান্নার পর দ্রুত সাজ ঠিক করে র্যাম্পে ওঠেন তিনি। পরে মজা করে বলেন, এত কাঁদার পরও যেন বোঝা না যায়, সেটিও নিশ্চিত করা হয়েছিল।
র্যাচেলের পুরো যাত্রার কেন্দ্রেই রয়েছে লাগোস। নিজের শহরের বাড়িতে বসে একসময় তিনি চ্যানেলের শো দেখতেন এবং ভাবতেন, তিনি ও তার বন্ধুরা কি নিজেদের এমন একটি ফ্যাশন শো তৈরি করতে পারবেন। তারা শেষ পর্যন্ত নিজেদের মতো করে সেটি করেছিলেন। আর এবার তিনি সত্যিকারের চ্যানেল শোতেই হাঁটলেন।
দেশের মানুষের উদ্দেশে র্যাচেলের বার্তা খুব সরল—স্বপ্ন দেখতে হবে, নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে এবং অন্য কেউ সেই স্বপ্ন বুঝতে না পারলেও তা ছেড়ে দেওয়া যাবে না। তার নিজের গল্পই যেন সেই বিশ্বাসের উদাহরণ।
লাগোসের রাস্তায় নিজের তৈরি ফ্যাশন জগৎ থেকে প্যারিসের গ্রাঁ পালে চ্যানেলের আসল র্যাম্প—র্যাচেল ওজুরোমির যাত্রা দেখিয়ে দিল, বড় স্বপ্ন অনেক সময় শুরু হয় খুব সাধারণ একটি কল্পনা থেকেই।












