কমলা হ্যারিস আবার প্রেসিডেন্ট পদে লড়াই করলে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অন্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের তুলনায় শুরুতেই তাঁর কয়েকটি বড় সুবিধা থাকবে। জাতীয় পর্যায়ে তাঁর পরিচিতি প্রায় সর্বজনীন, হোয়াইট হাউসে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং ইতিমধ্যে দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে একটি নির্বাচনী লড়াইয়ের কঠিন বাস্তবতা তিনি দেখেছেন। কিন্তু এই সুবিধাগুলোই তাঁকে ২০২৮ সালের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এগিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হবে কি না, সেটিই এখন ডেমোক্র্যাটদের বড় প্রশ্ন।
দলটির ভেতরে হ্যারিসের প্রতি শ্রদ্ধা ও ব্যক্তিগত সমর্থন এখনও যথেষ্ট। প্রায় এক ডজন সম্ভাব্য প্রার্থী যখন নিজেদের অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা করছেন, তখন হ্যারিসের রাজনৈতিক পরিচিতি তাঁকে স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার কেন্দ্রে রাখছে। কিন্তু একই সঙ্গে দলের কৌশলবিদ, দাতা, সাবেক সহযোগী ও সমর্থকদের মধ্যে একটি মৌলিক সংশয় রয়েছে—২০২৪ সালে হ্যারিস কি এমন একটি পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন, যেখানে তাঁকে যথেষ্ট সময়ই দেওয়া হয়নি, নাকি তাঁর রাজনৈতিক সময়কাল ইতিমধ্যে পেরিয়ে গেছে?
এই দ্বিধার পেছনে রয়েছে ২০২৪ সালের অভিজ্ঞতা। জো বাইডেনের নির্বাচনী প্রচার ভেঙে পড়ার মুহূর্তে মাত্র ১০৭ দিনের মধ্যে হ্যারিসকে দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। তাঁর সমর্থকেরা মনে করেন, এত অল্প সময়ে একজন প্রার্থীর পক্ষে নিজের রাজনৈতিক পরিচয় নতুন করে প্রতিষ্ঠা করা, বাইডেন প্রশাসন থেকে নিজেকে আলাদা করা এবং একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের সাফল্য-ব্যর্থতার দায় বহন করা প্রায় অসম্ভব ছিল।
কিন্তু দলের আরেক অংশের দৃষ্টিতে সমস্যাটি ভিন্ন। তাঁদের কাছে হ্যারিস ২০২৪ সালের পরাজিত প্রার্থী এবং ডেমোক্র্যাটদের সেই রাজনৈতিক সময়পর্বের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, যেখান থেকে দলটি বেরিয়ে আসতে চাইছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনের পর ডেমোক্র্যাটদের একটি অংশ নতুন নেতৃত্ব, নতুন ভাষা এবং পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামো থেকে আরও স্পষ্ট বিচ্ছিন্নতা চাইছে।

এখানেই হ্যারিসের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি। তাঁর প্রার্থিতা ঘোষণা হলে তিনি মুহূর্তেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমীকরণ পাল্টে দিতে পারেন। কিছু সম্ভাব্য প্রার্থী হয়তো তাঁর কারণে নির্বাচনে নামার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবেন। অন্যরা নিজেদের অবস্থান নির্ধারণ করবেন হ্যারিসের বিপরীতে। অর্থাৎ তিনি শুধু একজন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে নামবেন না; তাঁর উপস্থিতিই ২০২৮ সালের ডেমোক্র্যাটিক প্রাথমিক বাছাইয়ের কাঠামো বদলে দিতে পারে।
দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন
দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় ইতিমধ্যে পিট বুটিগিগ, ওয়েস মুর ও গ্যাভিন নিউসমের উপস্থিতি বাড়ছে। ২০২৮ সালের ডেমোক্র্যাটিক প্রাথমিক বাছাইয়ে দক্ষিণ ক্যারোলাইনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে, বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটার ও দলের বৃহত্তর জোটকে প্রার্থী বাছাইয়ে আরও প্রভাবশালী করার পরিকল্পনার কারণে।
নিউসম ইতিমধ্যে বলেছেন, হ্যারিস নির্বাচনে নামলে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না। কারণ তাঁদের রাজনৈতিক ভিত্তির মধ্যে বড় ধরনের মিল বা দ্বৈততা তৈরি হতে পারে। এই অবস্থাই দেখিয়ে দেয়, হ্যারিসের সিদ্ধান্ত কেবল তাঁর নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; অন্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের কৌশলও তাঁর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় বাইডেনের সাবেক সমর্থক ফ্লেচার স্মিথের মতো নেতারা মনে করছেন, হ্যারিসের সিদ্ধান্ত অনিশ্চিত থাকায় দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রয়োজনীয় আলোচনা আটকে আছে। তাঁদের যুক্তি হলো, ডেমোক্র্যাটদের হাতে এখন নতুন প্রজন্মের গভর্নর, কংগ্রেস সদস্য ও সিনেটর রয়েছেন। তাঁরা মনে করেন, ২০২৮ সালে নতুন নেতৃত্বকে সুযোগ দেওয়া উচিত।
অন্যদিকে হ্যারিসের সমর্থকেরা বলছেন, তাঁকে এত দ্রুত রাজনৈতিক অতীতের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা ভুল হবে। সিনেটর, ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং প্রেসিডেন্ট প্রার্থী—এই ধারাবাহিক অভিজ্ঞতা তাঁকে জাতীয় নির্বাচনের জন্য এমন অভিজ্ঞতা দিয়েছে, যা অনেক সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীর নেই।
২০২৪ সালের পরাজয়ও পুরোপুরি তাঁর ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচনা করার বিষয় নয়—এমন যুক্তিও রয়েছে। তিনি এমন এক প্রচারাভিযানের উত্তরাধিকার পেয়েছিলেন, যার শুরুতেই ছিল অজনপ্রিয় ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট, মূল্যস্ফীতি ও অর্থনীতি নিয়ে ভোটারদের গভীর অসন্তোষ এবং বাইডেনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করার কারণে নিজেকে পরিবর্তনের প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরার সীমাবদ্ধতা। শেষ পর্যন্ত তিনি ট্রাম্পের কাছে জনপ্রিয় ভোটে প্রায় ২৩ লাখ ভোটের ব্যবধানে হেরে যান এবং ইলেক্টোরাল কলেজে ট্রাম্পের ৩১২ ভোটের বিপরীতে পান ২২৬ ভোট।
তবে দ্বিতীয়বারের সুযোগ মানেই আগের প্রচারের পুনরাবৃত্তি নয়। হ্যারিস এবার শুরু থেকেই জাতীয় পর্যায়ের প্রচার কাঠামো তৈরি করতে পারবেন। ২০২৪ সালের অভিজ্ঞতা তাঁর জন্য একটি রাজনৈতিক অবকাঠামোও তৈরি করেছে। কিন্তু সেই সুবিধা কাজে লাগাতে হলে তাঁকে দেখাতে হবে, আগের প্রচারের সীমাবদ্ধতা থেকে তিনি কী শিখেছেন।
সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন এখানেই

হ্যারিসের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা সম্ভবত পরিচিতির অভাব নয়; বরং রাজনৈতিক অবস্থানের প্রশ্ন। ২০২৪ সালে তাঁকে বাইডেনের উত্তরসূরি হিসেবেও দেখা হয়েছে, আবার পরিবর্তনের প্রার্থী হিসেবেও নিজেকে উপস্থাপন করতে হয়েছে। এই দ্বৈত অবস্থান তাঁর রাজনৈতিক বার্তাকে দুর্বল করেছিল বলে মনে করেন অনেকে।
ডেমোক্র্যাটদের একটি অংশ এখন জানতে চায়—হ্যারিস আবার নির্বাচনে নামলে তিনি ঠিক কী নিয়ে লড়বেন? অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গণতন্ত্র—কোন বিষয়গুলো তাঁর প্রচারের কেন্দ্র হবে? শুধু ট্রাম্পবিরোধিতা কি যথেষ্ট হবে, নাকি তাঁকে নিজের রাজনৈতিক কর্মসূচি আরও স্পষ্টভাবে দাঁড় করাতে হবে?
দলের সাবেক সমর্থকদের মধ্যেও এই প্রশ্ন রয়েছে। তাঁদের মতে, হ্যারিস প্রতিভাবান এবং জাতীয় নির্বাচনের চাপ সামলানোর অভিজ্ঞতাও তাঁর আছে। কিন্তু দক্ষতা একা নির্বাচনী জয়ের নিশ্চয়তা দেয় না। বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটার, কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ এবং তরুণ ভোটারদের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভোটারগোষ্ঠীর কাছে তিনি এবার কী নতুন বার্তা নিয়ে যাবেন, সেটিই বড় পরীক্ষা।
হ্যারিসের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দলের কৃষ্ণাঙ্গ নারী ভোটারদের সঙ্গে সম্পর্ক। ডেমোক্র্যাটিক জোটে কৃষ্ণাঙ্গ নারীরা দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ভোটারগোষ্ঠী। তাঁদের একটি অংশ মনে করতে পারেন, হ্যারিসকে আবার উপেক্ষা করা হলে সেটি একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারী নেত্রীর নেতৃত্বের সম্ভাবনাকে দ্বিতীয়বার প্রত্যাখ্যান করার মতো হবে। এমন অনুভূতি দলের জন্য রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকর হতে পারে এবং কিছু ভোটারের মধ্যে হতাশা তৈরি করতে পারে।
তবে হ্যারিস এখনও তাঁর সিদ্ধান্ত জানাননি। ২০২৬ সালের বসন্তে তিনি শুধু বলেছেন, তিনি বিষয়টি নিয়ে ভাবছেন। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি আবার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের হয়ে প্রচার করছেন। ফলে তাঁর রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে কি না, সেটিও এখন আলোচনার বিষয়।
শেষ পর্যন্ত ২০২৮ সালের প্রশ্নটি শুধু হ্যারিস আবার নির্বাচনে দাঁড়াবেন কি না, তা নিয়ে সীমাবদ্ধ নয়। আসল প্রশ্ন হলো, ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ভবিষ্যতের দিকে এগোতে গিয়ে কতটা অতীতকে সঙ্গে রাখতে চায়।
হ্যারিসের কাছে ২০২৪ সালের পরাজয় একটি দুর্বলতা হতে পারে, আবার সেটিই তাঁর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শিক্ষা হয়ে উঠতে পারে। তাঁর হাতে জাতীয় পরিচিতি, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং আগের নির্বাচনের বাস্তব শিক্ষা রয়েছে। কিন্তু এগুলোকে ভোটে রূপান্তর করতে হলে তাঁকে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি কেবল আগের নির্বাচনের প্রার্থী নন; তিনি ডেমোক্র্যাটদের পরবর্তী রাজনৈতিক অধ্যায়ের জন্যও একটি বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক বিকল্প।
২০২৮ সালে তাঁর সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়তো অন্য কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী নন। সেটি হতে পারে ভোটারদের এই প্রশ্ন—গতবারের পরাজয়ের পর এবার কেন আবার তাঁকেই বেছে নেওয়া উচিত?












