বাংলাদেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপ এখন শুধু বাজারদরের সমস্যা নয়; এটি মানুষের প্রকৃত আয়, ভোগক্ষমতা, কর্মসংস্থান এবং দারিদ্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, খাদ্য ও জ্বালানির বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি শুধু সাময়িক মূল্যস্ফীতি তৈরি করে না—এ ধরনের সংকট মানুষের মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা দীর্ঘ সময় উঁচু রাখে, জীবনমান কমায় এবং দারিদ্র্য ও বৈষম্য বাড়ায়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইএমএফের নতুন একটি অর্থনৈতিক মডেল দরিদ্র পরিবারের ওপর মূল্যস্ফীতির তুলনামূলক বেশি প্রভাব হিসাব করেছে। এই মডেল অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আগের হিসাবের তুলনায় আরও প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গিয়েছিল। আইএমএফের গবেষণাটি সংস্থাটির আসন্ন বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাসের একটি অধ্যায় হিসেবে প্রকাশিত হবে।
বাংলাদেশের জন্য এই সতর্কবার্তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশে মূল্যস্ফীতি কমার গতি ধীর, অথচ নিম্নআয়ের মানুষের আয় সেই হারে বাড়ছে না।
মূল্যস্ফীতি কমলেও স্বস্তি আসছে না

আইএমএফের জানুয়ারি ২০২৬-এর বাংলাদেশবিষয়ক মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ শতাংশ। ২০২৬ অর্থবছরে তা ৮ দশমিক ৯ শতাংশে নামতে পারে এবং ২০২৭ অর্থবছরে প্রায় ৬ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। তবে এই পূর্বাভাস বাস্তবায়নের জন্য সরবরাহব্যবস্থায় নতুন ধাক্কা না আসা এবং মুদ্রানীতি আগেভাগে শিথিল না করার শর্ত রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের এপ্রিলের বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদেও একই ধরনের উদ্বেগ উঠে এসেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫ শতাংশের কাছাকাছি ছিল এবং খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত—উভয় ধরনের পণ্যের দামই উঁচু ছিল। নিম্নআয়ের মানুষের মজুরি দামের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। বিশ্বব্যাংক।
অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির হার ১০ শতাংশ থেকে ৮ বা ৯ শতাংশে নামলেও সাধারণ মানুষের জন্য পণ্যের দাম কমে যাচ্ছে—এমন নয়। দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমছে মাত্র। আগের উচ্চমূল্যের ভিত্তির ওপর নতুন দাম যুক্ত হচ্ছে। ফলে পরিবারের মাসিক বাজেটে খাদ্য, বাসা, পরিবহন, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় দীর্ঘ সময় ধরে চাপ তৈরি করছে।
দারিদ্র্য ইতোমধ্যে বাড়ছে
এই মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় সামাজিক প্রভাব দেখা যাচ্ছে দারিদ্র্যের পরিসংখ্যানে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের এপ্রিলের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে বেড়ে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে। এর ফলে ২০২৫ সালে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। বিশ্বব্যাংক।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের অক্টোবরের সর্বশেষ উন্নয়ন হালনাগাদ পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক হিসেবে তুলে ধরেছে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৬ অর্থবছরে দারিদ্র্য ও বৈষম্য বেড়েছে এবং আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে। একই সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি স্থবির হয়েছে এবং নারীরা চাকরি হারানোর ক্ষেত্রে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিশ্বব্যাংক।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের দারিদ্র্য ও সমতা মূল্যায়ন আরও দেখিয়েছিল, ২০২২ সালেও প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ বাংলাদেশি—দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ—অসুস্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনো আকস্মিক আঘাতে আবার দারিদ্র্যে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে ছিলেন। বিশ্বব্যাংক।

ভবিষ্যতের দারিদ্র্য কমবে, নাকি ঝুঁকি বাড়বে?
এখানেই বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। বিশ্বব্যাংকের বর্তমান পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে দারিদ্র্যের হার প্রায় ২০ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে ২০২৮ সালে ১৯ দশমিক ৩ শতাংশে নামতে পারে। কিন্তু এই হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশের চেয়েও বেশি থাকবে। অর্থাৎ অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ালেও আগের দারিদ্র্য পরিস্থিতিতে দ্রুত ফেরা সহজ হবে না। বিশ্বব্যাংক।
এদিকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ২০২৬ সালের জুলাইয়ের পূর্বাভাসে বাংলাদেশের ২০২৬ সালের মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ এবং ২০২৭ সালের মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৮ শতাংশ ধরে নিয়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যয়ের দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কায় ২০২৭ সালের মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাসও উঁচু করা হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক।
এতে বোঝা যায়, মূল্যস্ফীতি দ্রুত ৫–৬ শতাংশের স্বাভাবিক পর্যায়ে না এলে দারিদ্র্য কমানোর পথও কঠিন থাকবে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে নিম্নআয়ের মানুষ
রয়টার্সে উদ্ধৃত আইএমএফ গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—সব পরিবারের জন্য মূল্যস্ফীতি সমান নয়। নিম্নআয়ের পরিবার তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ব্যয় করে। ফলে একই হারে দাম বাড়লেও দরিদ্র পরিবারের ওপর প্রকৃত চাপ তুলনামূলক বেশি পড়ে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিশ্বব্যাংক বলছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি স্বল্পদক্ষ শ্রমিকদের প্রকৃত আয় কমিয়েছে। সংস্থাটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে স্বল্পদক্ষ শ্রমিকদের প্রকৃত আয় প্রায় ২ শতাংশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। বিশ্বব্যাংক।
এই পরিস্থিতিতে শুধু মূল্যস্ফীতির হার কমানো যথেষ্ট নয়। মজুরি বৃদ্ধি, উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা এবং দরিদ্র মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা একই সঙ্গে বাড়াতে হবে।
ভর্তুকি নয়, লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা
আইএমএফের গবেষণা বলছে, সংকটের সময় দরিদ্র মানুষকে সুরক্ষা দিতে লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তা তুলনামূলক কার্যকর। বিপরীতে সার্বজনীন মূল্যনিয়ন্ত্রণ, ভোগকর কমানো বা উৎপাদক ভর্তুকির মতো ব্যবস্থা সরকারের জন্য অনেক বেশি ব্যয়বহুল হতে পারে।
বাংলাদেশেও সামাজিক সুরক্ষার লক্ষ্যভিত্তিকতা বড় প্রশ্ন। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের অক্টোবরের বিশ্লেষণ বলছে, দেশের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেক এখনো কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই। একই সঙ্গে সংস্থাটি বলছে, সহায়তা কর্মসূচির লক্ষ্যভিত্তিকতা উন্নত করা গেলে আরও ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব হতে পারে। বিশ্বব্যাংক।

আগামী দিনের আসল লড়াই
বাংলাদেশের জন্য মূল্যস্ফীতির সমস্যা এখন শুধু বাজার নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন নয়; এটি প্রবৃদ্ধির গুণগত মান এবং দারিদ্র্য কমানোর সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। আইএমএফ বলছে, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি মূল্যস্থিতির ওপর আস্থা দুর্বল করে এবং সংকটের কয়েক বছর পরও মানুষের মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা উঁচু থাকতে পারে। এতে সুদের হার দীর্ঘ সময় বেশি থাকার ঝুঁকিও তৈরি হয়।
বাংলাদেশের সামনে তাই দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—একদিকে মূল্যস্ফীতি কমানো, অন্যদিকে এমন কর্মসংস্থান ও আয় তৈরি করা, যাতে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে। বিশ্বব্যাংকও বলছে, আর্থিক খাত, রাজস্ব আহরণ, জ্বালানি ও ব্যবসার পরিবেশে দ্রুত সংস্কার ছাড়া অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথ টেকসই হবে না। বিশ্বব্যাংক।
অর্থাৎ আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের গতিপথ শুধু জিডিপি কতটা বাড়ল, তা দিয়ে নির্ধারিত হবে না। মানুষের আয় কতটা বাড়ল, সেই আয় দিয়ে তারা কতটা খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সেবা কিনতে পারল, কতজন নতুন কর্মসংস্থান পেল এবং রাষ্ট্রের সহায়তা সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর কাছে কতটা কার্যকরভাবে পৌঁছাল—এসবই হবে প্রকৃত মাপকাঠি।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক পূর্বাভাস বলছে, বাংলাদেশের সামনে পুনরুদ্ধারের সুযোগ আছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং প্রকৃত আয় ও কর্মসংস্থান তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে না বাড়ে, তাহলে সাময়িক অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকার হতে পারে নতুন দারিদ্র্য এবং বিদ্যমান দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার গতি আরও ধীর হয়ে যাওয়া।












