একসময় পদ্মার বুকে জাল ফেললেই মিলত রুপালি ইলিশ। নৌকা ভর্তি করে মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরতেন জেলেরা। সন্ধ্যার পর পদ্মায় জ্বলে উঠত অসংখ্য নৌকার আলো, আর ভোর হলে ঘাট সরগরম হয়ে উঠত ইলিশের বেচাকেনায়। কিন্তু সেই দৃশ্য এখন অনেকটাই অতীত।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের বাহিরচর দৌলতদিয়া এলাকায় এখনো নদীর পাড়ে সারি সারি মাছ ধরার নৌকা দেখা যায়। জালও আছে, জেলেও আছেন। তবে আগের মতো ইলিশ নেই। কেউ নদী থেকে ফিরছেন সামান্য মাছ নিয়ে, আবার কেউ নৌকায় বসে ছেঁড়া জাল মেরামত করছেন কিংবা মাছ ধরার সরঞ্জামে আলকাতরা লাগাচ্ছেন।
৭৫ বছর বয়সী জেলে শুকুর আলী হালদার প্রায় পাঁচ দশক ধরে পদ্মায় মাছ ধরছেন। তাঁর চোখের সামনে বদলে গেছে নদী ও মাছ ধরার চিত্র।
তিনি জানান, একসময় একবার জাল ফেলেই পাঁচ থেকে সাত মণ পর্যন্ত ইলিশ পাওয়া যেত। কখনো কখনো জাল এতটাই ভারী হয়ে উঠত যে তা নৌকায় তোলা কঠিন হয়ে পড়ত। ইলিশে ভরা নৌকা নিয়ে জেলেরা ঘাটে ফিরতেন। এখন পদ্মায় আগের সেই গভীরতা ও স্রোত নেই। নদীর পানি কমে যাওয়ায় এই অংশে ইলিশও আগের মতো আসে না।
শুকুর আলীর স্মৃতিতে এখনো ভাসে পুরোনো সেই পদ্মা। সন্ধ্যার পর নদীতে জেলেদের নৌকার আলো দেখা যেত। সারা রাত জাল ফেলে ভোরে নৌকা ভর্তি মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরতেন তাঁরা।
গোয়ালন্দের গুরুত্বও একসময় ছিল অনেক বেশি। পদ্মা ও যমুনার মিলনস্থলের কাছাকাছি হওয়ায় এটি ইলিশ আহরণ ও বেচাকেনার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। ব্রিটিশ আমল থেকে দেশভাগের পরও এ অঞ্চলের ইলিশ বিপুল পরিমাণে বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হতো। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, একসময় গোয়ালন্দের ইলিশ রেলওয়ের ওয়াগনে করে কলকাতাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে যেত।
কিন্তু কয়েক দশকে বদলে গেছে নদীর চেহারা। বিভিন্ন জায়গায় চর জেগে ওঠায় নদীর নাব্যতা কমেছে। কোথাও কোথাও ডুবোচর তৈরি হয়েছে। এতে পানির গভীরতা ও স্রোতের গতিপথ বদলে গেছে। জেলেদের ভাষ্য, নদীর এই পরিবর্তনের সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত ও ক্ষতিকর মাছ ধরার পদ্ধতি এবং পরিবেশগত নানা চাপও ইলিশ কমে যাওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখছে।
বন্যার পর আরও কমে যায় ইলিশ
জেলে শুকুর আলী হালদার জানান, জাফরগঞ্জ এলাকার জেলে জাফর হালদার, সোনাই হালদার, নিরঞ্জন হালদার ও মদন হালদারদের সঙ্গে তিনি একসময় নিয়মিত মাছ ধরেছেন। তখন দুই থেকে তিন সের ওজনের ইলিশও নিয়মিত পাওয়া যেত।
একবার মৌসুমের সময় প্রায় এক কেজি ওজনের একটি ইলিশ ৩ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি করেছিলেন বলেও জানান তিনি।
তবে তাঁর মতে, বড় বন্যাগুলোর পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে থাকে। ১৯৮৮ সালের বন্যার পর পদ্মায় ইলিশ কমতে শুরু করে। ১৯৯৮ সালের বন্যার পর এই অঞ্চলে ইলিশ প্রায় হারিয়েই যায় বলে তাঁর দাবি।
দৌলতদিয়া-দেবগ্রাম জেলে সমবায় সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওসেল ব্যাপারী জানান, একসময় রাজবাড়ীর পাশাপাশি মানিকগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা থেকেও জেলেরা এই এলাকায় মাছ ধরতে আসতেন।
তাঁর হিসাবে, আগে রাজবাড়ীর প্রায় ৪০টি নৌকা, মানিকগঞ্জের ১২টি এবং সিরাজগঞ্জ ও পাবনার আরও ১৬টি নৌকা এই এলাকায় মাছ ধরত। চলতি বছর স্থানীয় নৌকার সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭টিতে।
ইলিশের সন্ধানে এখন জেলেদের নদীর অনেক দূরের অংশে যেতে হয়। একটি নৌকায় জাল ফেলে তা তুলে আনতেও কখনো ১৬ থেকে ১৭ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগে যায়। মাছ কমে যাওয়ায় জেলেরা বিভিন্ন ধরনের জাল ব্যবহার করে নদীতে যে মাছ পাওয়া যায়, সেটিই ধরার চেষ্টা করছেন।
৬৫ বছর বয়সী জেলে আনোয়ার ব্যাপারী প্রায় চার দশক ধরে পদ্মায় মাছ ধরছেন। তাঁর স্মৃতিতে একসময় একটি নৌকা থেকেই দিনে ৫০ থেকে ৬০ মণ পর্যন্ত ইলিশ ধরা পড়ত। এখন পদ্মায় মাছ আছে—এ কথা বলাই কঠিন বলে মনে করেন তিনি।
আনোয়ার ব্যাপারীর অভিযোগ, নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার মাছ ও মাছের ডিমের জন্য ক্ষতিকর। নদীর উজানে বিভিন্ন স্থাপনা এবং চর জেগে ওঠার কারণেও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বদলে গেছে বলে তিনি মনে করেন।
ইলিশ কমেছে, ব্যবসাও মন্দা
ইলিশ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে দৌলতদিয়ার মাছ ব্যবসায়ও। প্রায় ২০ বছর ধরে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে মাছের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত চাঁদু মোল্লা জানান, তিনি যখন ব্যবসা শুরু করেছিলেন, তখন প্রতিদিন বাজারে শত শত কেজি মাছ আসত। এখন অনেক নৌকাই ইলিশ ছাড়াই ঘাটে ফেরে।

তাঁর ভাষ্য, ১০ থেকে ২০টি নৌকা থেকে দিন শেষে হয়তো ১০ থেকে ১২টি ইলিশ আসে। ফলে আগের সেই জমজমাট মাছের ব্যবসাও অনেকটাই বদলে গেছে।
গোয়ালন্দ বাজারের ইলিশের পাইকারি ব্যবসায়ী বাদল বিশ্বাস প্রায় ৩৫ বছর ধরে এই ব্যবসায় আছেন। তাঁর বাবা সাদেক আলী বিশ্বাসও এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
বাদল বিশ্বাস জানান, তাঁর বাবার সময় গোয়ালন্দে ইলিশের ব্যবসা ছিল অত্যন্ত জমজমাট। এখানকার ইলিশ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হতো, এমনকি রেলওয়ের ওয়াগনে করে কলকাতাতেও যেত।
এখন পদ্মার ইলিশ বলতে তেমন কিছুই নেই বলে আক্ষেপ তাঁর। পারিবারিক ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে এখন বরিশাল ও চট্টগ্রাম থেকে ইলিশ এনে বিক্রি করতে হচ্ছে।
দৌলতদিয়া ঘাট বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোহন মণ্ডল জানান, মাত্র ছয়-সাত বছর আগেও তাঁর পাইকারি দোকানে প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ মণ ইলিশ আসত। এখন দৌলতদিয়া ঘাটে ১১টি পাইকারি দোকান থাকলেও সাম্প্রতিক এক দিনে মাত্র দুটি দোকানে ইলিশ এসেছে। সব মিলিয়ে মাছের পরিমাণ ছিল মাত্র ২ থেকে ৩ কেজি।
ইলিশের মৌসুমেও পুরো ঘাটে দিনে ১০ থেকে ১২ কেজির বেশি ইলিশ পাওয়া যায় না বলে জানান তিনি।
রাজবাড়ীর বাইরে দেশজুড়েও ইলিশ কমছে
শুধু রাজবাড়ীর পদ্মায় নয়, বাংলাদেশজুড়েই ইলিশ উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৫ লাখ ১২ হাজার মেট্রিক টন। এর আগের অর্থবছরে উৎপাদন ছিল প্রায় ৫ লাখ ২৯ হাজার টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল প্রায় ৫ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টন।
অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে জাতীয় পর্যায়েও ইলিশ উৎপাদনে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।
মৎস্য কর্মকর্তা ও গবেষকদের মতে, নদীর স্বাভাবিক পরিবেশের পরিবর্তন, প্রজননক্ষেত্রের অবনতি এবং মাছের চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হওয়া ইলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
রাজবাড়ীর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুব উল হক বলেন, ইলিশ কমে যাওয়ার ঘটনা শুধু রাজবাড়ীতে সীমাবদ্ধ নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইলিশের আকার ও প্রাপ্যতায়ও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
তাঁর মতে, নদীতে অনেক ডুবোচর তৈরি হওয়ায় পানির গভীরতা ও নাব্যতা কমেছে। এর ফলে ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। মানবসৃষ্ট দূষণও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
একই সঙ্গে মা ইলিশ ও জাটকা ধরার মতো কর্মকাণ্ডও ইলিশের উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে বলে জানান তিনি।
পদ্মার তীরে এখনো নৌকা আছে, জাল আছে, জেলেরা আছেন। কিন্তু হারিয়ে যাচ্ছে সেই পুরোনো দৃশ্য—ইলিশে বোঝাই নৌকা, ভোরের ঘাটে মাছের স্তূপ আর জমজমাট বেচাকেনা। নদীর গভীরতা ও স্বাভাবিক স্রোত ফিরিয়ে আনা, মাছের প্রজননক্ষেত্র রক্ষা এবং ক্ষতিকর জাল ও অবৈধ আহরণ বন্ধ করা না গেলে রাজবাড়ীর পদ্মায় ইলিশের সেই পুরোনো গৌরব ফিরে আসবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।












