ইন্দোনেশিয়ায় শ্রমিকদের অধিকার ও চাকরির নিরাপত্তা বাড়াতে নতুন শ্রম আইন পাস করেছে দেশটির পার্লামেন্ট। মঙ্গলবার সর্বসম্মতভাবে পাস হওয়া আইনটিতে ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে কঠোরতা, বেশি ক্ষতিপূরণ এবং নির্দিষ্ট মেয়াদি চাকরির বিষয়ে নতুন বিধান রাখা হয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলো আইনটিকে বড় অর্জন হিসেবে দেখলেও ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বেড়েছে খরচ, নিয়োগের নমনীয়তা এবং আইনের বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ।
নতুন আইনে ২০২০ সালের বহুল বিতর্কিত ‘চাকরি সৃষ্টির অমনিবাস আইন’-এর কিছু বিধান পরিবর্তন বা পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। এর মধ্যে আউটসোর্সিংয়ের সুযোগ সীমিত করা এবং কোনো কর্মীকে ছাঁটাইয়ের আগে নিয়োগদাতার করণীয় বিষয়ে বাড়তি শর্ত রয়েছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এর লক্ষ্য শ্রমিকের অধিকার রক্ষা এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা।
ইন্দোনেশিয়ার শ্রমমন্ত্রী ইয়াসিয়েরলি জানিয়েছেন, নতুন আইনে নির্দিষ্ট মেয়াদি চাকরির চুক্তির সর্বোচ্চ সময় চার বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর প্ল্যাটফর্মে কাজ করা গিগ কর্মীদের সুরক্ষার জন্যও নতুন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কাজ করা অনানুষ্ঠানিক ও গিগ কর্মীদের সামাজিক নিরাপত্তা, ন্যায্য পারিশ্রমিক এবং অন্যায্যভাবে অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়ার বিরুদ্ধে সুরক্ষার আওতায় আনার বিষয়টিও আইনের আলোচনায় এসেছে।
ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু খরচ কমানোর যুক্তিতে সহজে কর্মী ছাঁটাই করতে পারবে না। পাশাপাশি চাকরি হারানো কর্মীদের জন্য বাড়তি ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা এবং একটি ‘ছাঁটাই ক্ষতিপূরণ নিশ্চয়তা’ কর্মসূচি তৈরির কথা বলা হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগাম অর্থ জমা রাখার মাধ্যমে কর্মী ছাঁটাইয়ের সময় ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সক্ষমতা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
শ্রমিক সংগঠনগুলো নতুন আইনকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, আগের আইনের তুলনায় কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তা, মজুরি ও ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে এটি বেশি সুরক্ষা দেবে। শ্রমিক নেতাদের বক্তব্য, নির্বিচারে কর্মী ছাঁটাইয়ের সুযোগ কমবে এবং আউটসোর্সিং ব্যবস্থায় কাজ করা অনেক কর্মী ভবিষ্যতে আরও স্থায়ী সুরক্ষা পেতে পারেন।
তবে ব্যবসায়ী মহলের আশঙ্কা, নতুন বিধান শ্রম ব্যয় বাড়াতে পারে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মী নিয়োগের স্বাধীনতা কমিয়ে দিতে পারে। ইন্দোনেশিয়ার ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শ্রমবিধি দ্রুত পরিবর্তিত হলে এবং বাস্তবায়নের নিয়ম স্পষ্ট না হলে বিনিয়োগকারীরা বাড়তি ঝুঁকি হিসেবে বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন।
বিশেষ করে শ্রমনির্ভর শিল্পগুলোতে প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বেশি। ব্যবসায়ীদের একটি অংশের আশঙ্কা, কর্মী নিয়োগ ও ছাঁটাইয়ের খরচ বাড়লে কিছু প্রতিষ্ঠান নতুন কর্মী নেওয়ার পরিবর্তে প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার দিকে বেশি ঝুঁকতে পারে। এতে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধির গতি কমার আশঙ্কাও রয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, শ্রমিক সুরক্ষা বাড়ানো এবং বিনিয়োগের পরিবেশ ধরে রাখা পরস্পরবিরোধী হতে হবে এমন নয়। তাদের মতে, নতুন নিয়মগুলো স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা, পর্যাপ্ত সময় দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ দেওয়া এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো গেলে দুই পক্ষের স্বার্থই সমন্বয় করা সম্ভব।

আরেকটি বড় প্রশ্ন উঠেছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কর্মীদের পরিচয় নিয়ে। রাইড-হেইলিং সেবার চালকদের মতো কর্মীদের অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো সরাসরি কর্মচারী নয়, ‘অংশীদার’ হিসেবে বিবেচনা করে। নতুন আইনে এই ধরনের কর্মীদের কীভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা হবে এবং তাদের জন্য ঠিক কী ধরনের অধিকার কার্যকর হবে, তা বাস্তবায়ন বিধি স্পষ্ট হওয়ার পরই পরিষ্কার হবে।
ইন্দোনেশিয়ার শ্রম আইন নিয়ে এই পরিবর্তন এমন সময়ে এলো, যখন দেশটির অর্থনীতি ও বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়েও আলোচনা চলছে। নতুন আইনের পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ফলে ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও বিনিয়োগকারীদের বড় অংশই চূড়ান্ত বিধান এবং পরবর্তী বাস্তবায়ন নির্দেশনার দিকে তাকিয়ে আছে।
শ্রম অধিকারকর্মীদের মতে, শুধু আইন পাস করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করা, আইনি নিশ্চয়তা বাড়ানো, দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক বাধা কমানো এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পদক্ষেপও একই সঙ্গে প্রয়োজন।
ফলে ইন্দোনেশিয়ার নতুন শ্রম আইন একদিকে কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা বাড়ানোর নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে ব্যবসার খরচ ও নিয়োগনীতিতে কী ধরনের পরিবর্তন আসে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আইনটির প্রকৃত প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করবে এর বাস্তবায়ন বিধি কতটা স্পষ্ট, পূর্বানুমানযোগ্য ও ব্যবসাবান্ধব হয় তার ওপর।












