যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি কর্মীদের স্থায়ী বসবাসের পথে নতুন বাধা তৈরি হয়েছে। দেশটির সরকার ৮ অক্টোবর আটটি বড় প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবা প্রতিষ্ঠানকে স্থায়ী শ্রম সনদ কর্মসূচি থেকে সাময়িকভাবে বাদ দিয়েছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমেই নিয়োগদাতারা বিদেশি কর্মীদের গ্রিন কার্ডের জন্য পৃষ্ঠপোষকতা করেন। তালিকায় আছে মার্কিন প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফট ও অ্যাডোবি, ফরাসি প্রতিষ্ঠান ক্যাপজেমিনি এবং ভারতের কগনিজ্যান্ট, ইনফোসিস, টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস, উইপ্রো ও এইচসিএল টেকনোলজিস। এসব প্রতিষ্ঠানের নতুন বা ঝুলে থাকা কোনো আবেদন আর প্রক্রিয়া করা হবে না।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স অভিযোগ করেছেন, প্রতিষ্ঠানগুলো কম বেতনে বিদেশি কর্মী নিয়োগ করতে ব্যবস্থাটির অপব্যবহার করছে। তিনি এসব কর্মীকে চুক্তিবদ্ধ দাস বলে উল্লেখ করেন। ভ্যান্সের দাবি, মাইক্রোসফট গত বছর প্রায় ৬ হাজার মার্কিন কর্মী ছাঁটাই করেছে। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি ৬ হাজার ৩০০ বিশেষ কর্মভিসা এবং প্রায় ৩ হাজার গ্রিন কার্ডের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। মাইক্রোসফটের ব্যাখ্যা, তাদের ভিসা আবেদনের ৮০ শতাংশই ছিল বিদ্যমান কর্মীদের মেয়াদ বাড়ানো বা অবস্থান বদলের জন্য। মার্কিন শ্রমমন্ত্রী কিথ সন্ডারলিং জানান, স্থগিত প্রতিষ্ঠানগুলো ২০০৯ সাল থেকে ২ লাখ ৩০ হাজারের বেশি বিশেষ কর্মভিসা এবং ১ লাখের বেশি স্থায়ী শ্রম সনদ পেয়েছে। প্রশাসন বলছে, যত দিন প্রয়োজন, তত দিন এই স্থগিতাদেশ থাকবে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগছে দক্ষিণ এশীয় কর্মীদের ওপর। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ডের অপেক্ষমাণ তালিকায় প্রায় সাড়ে ১২ লাখ মানুষ আছেন। তাঁদের ৭৯ শতাংশই ভারতীয়। বিদ্যমান বিশেষ কর্মভিসার প্রায় ৭০ শতাংশও ভারতীয়দের হাতে। প্রতিবছর এই শ্রেণিতে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার গ্রিন কার্ড দেওয়া হয়, আর প্রতিটি দেশের জন্য সীমা ৭ শতাংশ। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভ্যান্সের মন্তব্যকে গভীরভাবে আপত্তিকর বলেছে। মেটা, অ্যামাজন ও গুগল বিদেশি কর্মীর ওপর নির্ভরশীল হলেও এবারের তালিকায় নেই। চলতি বছরের আগস্টে প্রশাসন বিশেষ কর্মভিসার আবেদনে ১ লাখ ৩ হাজার ডলার ফি নির্ধারণের প্রস্তাবও দিয়েছিল।
বাংলাদেশের জন্য খবরটির দুটি দিক আছে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা শেষে প্রযুক্তি খাতে চাকরির স্বপ্ন দেখেন অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী। বড় প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেলে গ্রিন কার্ডের পথ সহজ হবে, এই হিসাব এখন বদলে যেতে পারে। নিয়োগদাতারা বিদেশি কর্মী নেওয়ার আগে আরও সতর্ক হতে পারেন। দ্বিতীয়ত, ভারতের যে তথ্যপ্রযুক্তি সেবা খাতের মডেল অনুসরণ করে বাংলাদেশও বিদেশি কাজ ধরতে চায়, সেই মডেলই এখন রাজনৈতিক চাপে। মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ দেশের বাইরে পাঠাবে, নাকি দেশেই কর্মী রাখতে বাধ্য হবে, সেই প্রশ্নের উত্তরে দেশের সফটওয়্যার রপ্তানিকারকদের সুযোগও জড়িয়ে আছে।
এই স্থগিতাদেশ আদালতে চ্যালেঞ্জ হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। আগের একটি ফি আদালতে বাতিল হয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতাও আছে। তবে বার্তাটি পরিষ্কার। যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষ বিদেশি কর্মীর জন্য দরজা আগের মতো খোলা নেই। যে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা এখন সেখানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাঁদের জন্য কানাডা, জার্মানি বা অস্ট্রেলিয়ার মতো বিকল্পের তুলনা করে দেখার সময় এসেছে।












