চীনের শিল্প খাতে দ্রুত বর্ধনশীল পণ্যগুলোর মধ্যে এখন আর শুধু বৈদ্যুতিক গাড়ি, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি কিংবা মানবসদৃশ রোবট নেই। শখের কাজ ও ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য তৈরি থ্রিডি প্রিন্টারও দেশটির অন্যতম সফল প্রযুক্তিপণ্যে পরিণত হয়েছে। গত এক দশকে বিশ্ববাজারে চীনের থ্রিডি প্রিন্টারের অংশীদারত্ব ১৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯৬ শতাংশে পৌঁছেছে। এতে একসময় পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকা এই বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে চীনের থ্রিডি প্রিন্টার রপ্তানি বেড়েছে ৯০ শতাংশ। প্রযুক্তিপণ্যটির ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা এবং তুলনামূলক কম দামে উন্নতমানের পণ্য তৈরির সক্ষমতা চীনা নির্মাতাদের বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সাহায্য করেছে।
ব্যক্তিগত ব্যবহারের থ্রিডি প্রিন্টারের বাজারে চীনের শেনজেনভিত্তিক চারটি প্রতিষ্ঠান বিশেষভাবে এগিয়ে রয়েছে। এগুলো হলো ক্রিয়েলিটি, অ্যানিকিউবিক, এলিগু এবং বাজারের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান বাম্বু ল্যাব। বাজার বিশ্লেষকদের কাছে প্রতিষ্ঠানগুলো ‘শেনজেনের চার ছোট ড্রাগন’ নামে পরিচিত।
চীনে তীব্র প্রতিযোগিতা, সরকারি সহায়তা এবং বৃহৎ পরিসরে উৎপাদনের সুবিধা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পণ্যের মান বাড়ানোর পাশাপাশি দাম কমাতেও সাহায্য করছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।
থ্রিডি প্রিন্টার সাধারণত গলিত প্লাস্টিক স্তরে স্তরে সাজিয়ে বিভিন্ন বস্তু তৈরি করে। ১৯৮৩ সালে মার্কিন উদ্ভাবক চাক হাল প্রযুক্তিটির সূচনা করেন। তবে দীর্ঘদিন ধরে এসব যন্ত্র ছিল ব্যয়বহুল, অবিশ্বস্ত এবং ব্যবহার করা কঠিন। বর্তমানে ৫০০ ডলারের কিছু বেশি দামেই উন্নত মানের ব্যক্তিগত থ্রিডি প্রিন্টার পাওয়া যাচ্ছে। অনেক যন্ত্রের নকশা ও অ্যালুমিনিয়ামের বাহ্যিক গঠনও বেশ আধুনিক।
অন্যদিকে, পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর একই ধরনের প্রাথমিক পর্যায়ের প্রিন্টারের দাম সাধারণত চীনা পণ্যের দ্বিগুণেরও বেশি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারও প্রযুক্তিটিকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও সহজ করে তুলেছে। এখন জটিল ডিজাইন সফটওয়্যার ব্যবহার না করেও স্বাভাবিক ভাষায় নির্দেশনা দিয়ে বিভিন্ন সরঞ্জাম, যন্ত্রাংশ কিংবা খেলনার নকশা তৈরি করা সম্ভব।
কম খরচে বিপুল পরিমাণে ড্রোন উৎপাদনের মাধ্যমে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন ড্রোনকে সাধারণ মানুষের ব্যবহারযোগ্য পণ্যে পরিণত করেছে, তেমনি থ্রিডি প্রিন্টারের ক্ষেত্রেও একই কৌশল কাজে লাগাচ্ছে।
বিক্রি বাড়লেও মুনাফায় চাপ
বাজারে আধিপত্য বাড়লেও চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। তীব্র মূল্য প্রতিযোগিতার কারণে তাদের মুনাফায় চাপ পড়ছে। তারপরও বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রতিষ্ঠানগুলোর আকর্ষণ কমেনি।
২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত বাম্বু ল্যাবের উদ্যোক্তারা চীনের ড্রোন নির্মাতা ডিজেআইয়ের সাবেক কর্মী। ব্যক্তিগত বাজারে দ্রুত অবস্থান শক্ত করা এই প্রতিষ্ঠানটির সম্ভাব্য মূল্যায়ন প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার বলে জানা গেছে।

গত বছর ডিজেআই বাম্বু ল্যাবের প্রতিদ্বন্দ্বী এলিগুতে বিনিয়োগ করে। অন্যদিকে, ক্রিয়েলিটি গত মে মাসে হংকং স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়। প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূলধন প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি হংকং ডলার, যা মার্কিন মুদ্রায় প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের সমান।
চীনা সরকারের কাছেও থ্রিডি প্রিন্টিং শিল্প গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৫ সালে চালু হওয়া ‘মেড ইন চায়না ২০২৫’ শিল্প পরিকল্পনায় এ প্রযুক্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। উচ্চপ্রযুক্তির উৎপাদনে দেশের সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরতা কমানো ছিল এই পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য।
চীনের নীতিনির্ধারকেরা মনে করেন, মহাকাশ ও উড়োজাহাজ, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামরিক সরঞ্জামের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরিতে থ্রিডি প্রিন্টার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এসব ক্ষেত্রে এখনো অনেক প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশের জন্য বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভর করতে হয়। এ কারণে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোকে থ্রিডি প্রিন্টার কেনার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
পশ্চিমা প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
তবে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাফল্য নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগও বাড়ছে। কিছু প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ, চীনা কোম্পানিগুলো পশ্চিমা বিশ্বের উন্মুক্ত সফটওয়্যার প্রযুক্তি থেকে সুবিধা নিয়েছে।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত বাম্বু ল্যাবকে একটি মার্কিন কোম্পানির চারটি পেটেন্ট লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত করে এবং ২ কোটি ৭৬ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
ব্যক্তিগত ব্যবহারের থ্রিডি প্রিন্টারের বাজারে চীনা কোম্পানিগুলো এগিয়ে থাকলেও শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত উন্নত থ্রিডি প্রিন্টারের বাজারে তারা এখনো একই সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। বিশেষ করে সংবেদনশীল নকশা ও প্রযুক্তিগত তথ্য চীনা প্রতিষ্ঠানের তৈরি যন্ত্রে ব্যবহার করতে অনেক বিদেশি কোম্পানি সতর্ক।
তবে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বাম্বু ল্যাবের প্রিন্টার ব্যবহার করছে বলে দেশটির সরকার স্বীকার করেছে। এদিকে, শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত সর্বোচ্চ মানের থ্রিডি প্রিন্টারের বাজারে এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কোম্পানিগুলোর প্রাধান্য রয়েছে। এসব যন্ত্রের দাম কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
থ্রিডি প্রিন্টার দিয়ে নতুন ধরনের কারখানা
চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন শুধু প্রিন্টার বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তারা উৎপাদনব্যবস্থায়ও নতুন ধরনের পরিবর্তন আনছে। এর অন্যতম উদাহরণ হলো ‘থ্রিডি প্রিন্টিং ফার্ম’ বা প্রিন্টারভিত্তিক উৎপাদনকেন্দ্র।
এ ধরনের কেন্দ্রে একই সঙ্গে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ডেস্কটপ থ্রিডি প্রিন্টার চালানো সম্ভব। প্রচলিত কারখানার মতো এসব যন্ত্র একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পণ্য তৈরি করতে পারে। চলতি বছর চীনে এমন বেশ কয়েকটি উৎপাদনকেন্দ্র গড়ে উঠেছে।
এসব কেন্দ্রে অল্প সময়ের মধ্যে ভোক্তাদের চাহিদা অনুযায়ী ছোটখাটো পণ্য ও বিভিন্ন ধরনের শৌখিন সামগ্রী তৈরি করা যায়। এতে প্রচলিত ইনজেকশন মোল্ডিং পদ্ধতির তুলনায় উৎপাদন ব্যয় ও সময় কমতে পারে। বিশেষ করে নতুন কোনো পণ্যের চাহিদা দ্রুত তৈরি হলে বা বাজারের প্রবণতা বদলে গেলে এই প্রযুক্তি উৎপাদকদের দ্রুত সাড়া দেওয়ার সুযোগ দেয়।
কম দাম, উন্নত মান এবং দ্রুত উৎপাদনের সমন্বয়ে চীনের থ্রিডি প্রিন্টার শিল্প বিশ্ববাজারে নতুন অবস্থান তৈরি করছে। ব্যক্তিগত ব্যবহারের বাজারে দেশটির আধিপত্য ইতিমধ্যে স্পষ্ট। এখন শিল্পকারখানার উৎপাদনেও এই প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়লে বৈশ্বিক উৎপাদনব্যবস্থায় চীনের প্রভাব আরও বাড়তে পারে।












