মিয়ানমারের সামরিক শাসক মিন অং হ্লাইং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছেন। ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে থাকা এই নেতা এখন এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন তিনি।
চলতি বছরের শুরুতে নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিবর্তন এনে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন মিন অং হ্লাইং। এরপর বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন তিনি। তবে দেশটিতে সামরিক বাহিনীর সহিংসতা, সংঘাত ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ এখনো কাটেনি।
মালয়েশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ
মিয়ানমার থেকে সংঘাত ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে পালিয়ে যাওয়া নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ মিন অং হ্লাইংয়ের কূটনৈতিক তৎপরতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে গত ৭ ও ৮ অক্টোবর তিনি মালয়েশিয়া সফর করেন।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একসময় মিয়ানমারের সামরিক সরকারের অন্যতম সমালোচক ছিল মালয়েশিয়া। তবে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবার মিন অং হ্লাইংকে স্বাগত জানান। দুই দেশের আলোচনায় মিয়ানমারের হাজার হাজার নাগরিককে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
মালয়েশিয়ায় অভিবাসীদের উপস্থিতি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে যে অসন্তোষ রয়েছে, তা মোকাবিলায়ও এই উদ্যোগ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বাস্তুচ্যুত মানুষদের প্রত্যাবাসন কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে মিয়ানমারের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও নাগরিকদের স্বেচ্ছায় ফিরে যাওয়ার সুযোগের ওপর।
আসিয়ানে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা
মালয়েশিয়া সফরকে মিন অং হ্লাইংয়ের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে গত চার মাসে তিনি কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম সফর করেছেন।
এসব সফরের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ানের সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছেন তিনি। তবে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়লেই যে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের প্রতি আঞ্চলিক দেশগুলোর অবস্থান পুরোপুরি বদলে যাবে, তা নিশ্চিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বিরল খনিজ ও অনলাইন প্রতারণা
মিন অং হ্লাইংয়ের কূটনৈতিক উদ্যোগে আরও দুটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে—অনলাইন প্রতারণা চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং বিরল মৃত্তিকা খনিজের বাণিজ্য।
মিয়ানমারের বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত অনলাইন প্রতারণাকেন্দ্রগুলো আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণ। এসব কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি এবং দেশটির গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদে প্রবেশাধিকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাব্য ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
গত সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান মাইকেল ভ্যান্স মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। প্রকাশ্যে এই সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল কারাবন্দি ব্যবসায়ী অ্যাডাম কাস্তিলোকে মুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা। তবে দুই পক্ষের বৃহত্তর সংলাপে অনলাইন প্রতারণা চক্র এবং খনিজ সম্পদ আহরণের বিষয়ও গুরুত্ব পাচ্ছে।
কূটনৈতিক তৎপরতায় কি বদলাবে মিয়ানমারের অবস্থান?
মিন অং হ্লাইংয়ের সাম্প্রতিক উদ্যোগে স্পষ্ট হচ্ছে, আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও মিয়ানমারের সামরিক সরকার অর্থনৈতিক স্বার্থ, অভিবাসন সমস্যা, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে বিদেশি দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে চাইছে।
তবে এই প্রচেষ্টার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দেশটির চলমান সংঘাত, সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ এবং বিতর্কিত নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নের সমাধান ছাড়া আন্তর্জাতিক আস্থা কতটা ফিরবে, তা অনিশ্চিত।












