জাপানে জনসংখ্যা কমে যাওয়ার সংকট ক্রমেই গভীর হচ্ছে। তবে দেশটির সব শহরের পরিস্থিতি এক নয়। কোথাও তরুণ পরিবারকে আকৃষ্ট করে জনসংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা সফল হচ্ছে, আবার কোথাও মানুষ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে স্কুল, বাসসেবা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। জাপানের হোক্কাইডো দ্বীপের নানপোরো ও ইউবারি শহর এই দুই বিপরীত বাস্তবতার উদাহরণ।
রাজধানী নয়, আঞ্চলিক কেন্দ্র সাপ্পোরোর কাছাকাছি অবস্থিত নানপোরো শহর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জনসংখ্যা বাড়ানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। অন্যদিকে একসময় কয়লাখনির জন্য পরিচিত ইউবারি এখন জনসংখ্যা হ্রাস ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে টিকে থাকার লড়াই করছে।
দুই শহরের দূরত্ব ৪০ কিলোমিটারেরও কম। কিন্তু জনসংখ্যার পরিবর্তন, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও স্থানীয় নীতির ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, জনসংখ্যা কমতে থাকা দেশগুলোতে সব এলাকার জন্য একই ধরনের উন্নয়ন পরিকল্পনা কার্যকর নাও হতে পারে।
পরিবারবান্ধব নীতিতে জনসংখ্যা বাড়ছে নানপোরোতে
১৯৯৮ সালে নানপোরোর জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১০ হাজার। পরবর্তী ২৫ বছরে তা কমে সাত হাজার ৪০০-এর নিচে নেমে আসে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। গত বছর শহরটির জনসংখ্যা বেড়ে প্রায় আট হাজার ৪০০-তে পৌঁছায়।
২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে হোক্কাইডোর ১৭৯টি পৌর এলাকার মধ্যে মাত্র নয়টিতে জনসংখ্যা বেড়েছে। এসব এলাকার মধ্যে নানপোরো একমাত্র শহর, যেখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদেশি অভিবাসী ছাড়াই জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে জাপানের সামগ্রিক জনসংখ্যা কমেছে প্রায় ৩০ লাখ।
নানপোরোর এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে ভৌগোলিক সুবিধা ও পরিবারবান্ধব নীতি। শহরটি গ্রামীণ পরিবেশের শান্তি ও তুলনামূলক খোলামেলা জীবনযাপনের সুযোগ দেয়। পাশাপাশি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র সাপ্পোরোতে গাড়িতে এক ঘণ্টারও কম সময়ে পৌঁছানো যায়।
এই সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে তরুণ পরিবারগুলোকে আকৃষ্ট করার উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। ৪০ বছরের কম বয়সী স্বামী-স্ত্রী কিংবা মাধ্যমিক বিদ্যালয়পড়ুয়া বা তার চেয়ে কম বয়সী সন্তান রয়েছে—এমন পরিবার বাড়ি নির্মাণের জন্য সর্বোচ্চ ২০ লাখ ইয়েন সহায়তা পেতে পারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অর্থের পরিমাণ বিনিময় হার অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়।
এ ছাড়া প্রাদেশিক ভূমি ব্যাংকে থাকা অব্যবহৃত জমি উল্লেখযোগ্য ছাড়ে বিক্রি করা হয়। স্থানীয় পরিবারগুলোকে প্রতি বছর ১০ কেজি চালও দেওয়া হয়। জাপানে চালের দাম বেড়ে জাতীয় উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় এই সহায়তাও পরিবারগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন বাসিন্দাদের হাত ধরে বদলাচ্ছে শহর
নানপোরোতে নতুন আসা পরিবারগুলোর একটি হলো তাতসুকি পরিবার। আওই ও ইয়ামাতো তাতসুকি তাঁদের ছোট ছেলেকে নিয়ে গত বছর শহরটিতে চলে আসেন। সাপ্পোরোর কাছাকাছি অবস্থান এবং তরুণ পরিবারগুলোর জন্য সরকারি সহায়তা তাঁদের এই সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করে।
তাঁরা নিজেদের বাড়ি নির্মাণের পাশাপাশি বাড়ির নিচতলায় একটি ক্যাফে চালু করেছেন। সেখানে গ্রিল করা মাছের খাবার এবং সদ্য তৈরি মিষ্টান্ন পরিবেশন করা হয়। তাঁদের ব্যবসাও ভালো চলছে।
ইয়ামাতো তাতসুকির ভাষ্য, একই ধরনের বাড়ি ও ব্যবসা সাপ্পোরোতে গড়ে তুলতে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হতো। তাঁদের অভিজ্ঞতা দেখে তাঁর বড় বোনও নানপোরোতে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন।
এভাবে নতুন বাসিন্দা ও ছোট ব্যবসার সমন্বয়ে শহরটির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রাণ ফিরছে। তবে এই সাফল্যের একটি সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। নানপোরোতে জন্মের তুলনায় মৃত্যুর সংখ্যা এখনও দ্বিগুণ। অর্থাৎ জনসংখ্যা বাড়লেও সেখানে জন্মহার বাড়েনি; বরং অন্য এলাকা থেকে মানুষের আগমনই বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন, এক এলাকার জনসংখ্যা বৃদ্ধি অনেক সময় অন্য এলাকার জনসংখ্যা কমার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে জাপানের প্রতিটি শহর নানপোরোর মতো সাফল্য অর্জন করতে পারবে না।
ইউবারিতে কমছে মানুষ, বন্ধ হচ্ছে সেবা
নানপোরোর বিপরীত চিত্র ইউবারিতে। ১৯৬০ সালে শহরটির জনসংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ ১৭ হাজার। তখন কয়লাখনিকে কেন্দ্র করে শহরটির অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল। বর্তমানে জনসংখ্যা কমে প্রায় পাঁচ হাজার ৬০০-তে নেমে এসেছে।
১৯৯০ সালে শেষ কয়লাখনিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ইউবারি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে নিজেদের নতুনভাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করে। কিন্তু অব্যবস্থাপনার কারণে ২০০৭ সালে শহরটি দেউলিয়া হয়ে যায়।
পুনর্গঠন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কর্তৃপক্ষ একের পর এক স্কুল বন্ধ করে, বাস চলাচলের কিছু পথ বাতিল করে এবং স্থানীয় জাদুঘর বন্ধ করে দেয়। কিন্তু এসব পদক্ষেপ শহরটির সংকট কমানোর বদলে জনসংখ্যা হ্রাসের গতি আরও বাড়িয়ে দেয় বলে মনে করেন বর্তমান মেয়র আতসুয়া সুকাসা।
২০২২ সাল থেকে ইউবারির জনসংখ্যা প্রায় সাত হাজার থেকে কমে পাঁচ হাজার ৬০০-তে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে শহরটির অবশিষ্ট বাসিন্দাদের অর্ধেকেরও বেশি মানুষের বয়স ৬৫ বছরের ওপরে।
শহরটিতে নতুন মানুষের আগমন খুবই কম। অন্যদিকে বাসিন্দারা চলে যাওয়ায় স্থানীয় ব্যবসার ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। উদ্যোক্তা নোদা মাসারুর মতে, জনসংখ্যা কমতে থাকলে কেউ নতুন ব্যবসা শুরু করতে আগ্রহী হন না; বরং বিদ্যমান ব্যবসাও বন্ধ হয়ে যায়।
জাপানের বহু শহরই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে
ইউবারির সংকট চরম হলেও এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। ২০২৪ সালে জাপানের জনসংখ্যা কৌশলবিষয়ক একটি পরিষদের প্রতিবেদনে বলা হয়, তরুণদের অন্য এলাকায় চলে যাওয়ার কারণে দেশটির প্রায় ৪০ শতাংশ পৌর এলাকা ভবিষ্যতে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও উন্নত জীবনযাপনের সুযোগের খোঁজে তরুণেরা বড় শহরগুলোর দিকে চলে যাচ্ছেন। এতে ছোট শহরগুলোতে বয়স্ক মানুষের অনুপাত বাড়ছে, শ্রমশক্তি কমছে এবং স্থানীয় অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ছে।
ইউবারির মেয়র মনে করেন, শুধু জনসংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার বাস্তবসম্মত সুযোগ তাঁদের শহরে নেই। বরং জনসংখ্যা কমে যাওয়ার বাস্তবতা মেনে নিয়ে কীভাবে শহরটিকে টিকিয়ে রাখা যায়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সবার জন্য এক নীতি নয়, প্রয়োজন ভিন্ন পরিকল্পনা
নানপোরো ও ইউবারির অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, জনসংখ্যা সংকট মোকাবিলায় প্রতিটি এলাকার বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। সাপ্পোরোর মতো বড় অর্থনৈতিক কেন্দ্রের কাছে থাকা নানপোরোর পক্ষে নতুন পরিবার আকৃষ্ট করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু ইউবারির মতো প্রত্যন্ত ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল শহরের জন্য একই কৌশল কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম।
নানপোরো যেখানে নতুন বাসিন্দা আকৃষ্ট করে প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করছে, সেখানে ইউবারির জন্য প্রয়োজন আরও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা। জনসংখ্যা কমে যাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আবাসন, পরিবহন ও অন্যান্য সেবা পুনর্বিন্যাস করে শহরটিকে আরও সংহত করা হতে পারে সেই পরিকল্পনার অংশ।
জাপানের জনসংখ্যা সংকট তাই শুধু জন্মহার বাড়ানোর প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কর্মসংস্থান, অভিবাসন, স্থানীয় অর্থনীতি, সরকারি সেবার সক্ষমতা এবং মানুষের বসবাসের সিদ্ধান্ত।
সব শহরকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব না-ও হতে পারে। কিন্তু জনসংখ্যা কমছে বলে কোনো শহরের জীবনযাত্রা পুরোপুরি ভেঙে পড়তে হবে, এমনও নয়। জাপানের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—কোথাও প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করা এবং কোথাও জনসংখ্যা হ্রাসের মধ্যেও মানুষের জন্য কার্যকর ও টেকসই জীবনব্যবস্থা নিশ্চিত করা।












