ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, দুর্বল অর্থনীতি, সরকারি সেবার ঘাটতি এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর আস্থার সংকটকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে। ফ্রান্সে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ও সহিংসতা পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। পাশাপাশি বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালেও বিক্ষোভ হয়েছে। এসব ঘটনা ইউরোপের মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
বিক্ষোভের পেছনে অভিবাসন ও ধর্মীয় পরিচয়কে প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরছেন ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রাজনৈতিক নেতা। তবে পরিস্থিতির ব্যাখ্যা শুধু অভিবাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে সংকটের প্রকৃত চিত্র বোঝা কঠিন। জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থান, জনসেবা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ঘাটতিও জনঅসন্তোষের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে সামনে এসেছে।
অর্থনৈতিক চাপ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর ক্ষোভ
ব্রিটিশ-আমেরিকান সাংবাদিক জর্জ ডেঞ্জারফিল্ড প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগের সময়ে উদারপন্থী ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক সংকট নিয়ে লিখেছিলেন। তাঁর বিশ্লেষণে অর্থনৈতিক অসন্তোষ, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি ক্ষোভ এবং যুক্তির সঙ্গে আবেগের সংঘাতের বিষয়টি উঠে এসেছিল। ইউরোপের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সেই সময়ের কিছু মিল খুঁজে পাচ্ছেন পর্যবেক্ষকেরা।
ফ্রান্সে বিক্ষোভকারীদের একাংশের ক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে ক্রমবর্ধমান ব্যয়, অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং সরকারের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন। তাঁদের দাবির মধ্যে রয়েছে জ্বালানিতে ভর্তুকি, শিক্ষায় বেশি ব্যয় এবং আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি। এসব দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপন্থী রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ফ্রান্সে এক শনিবারের বিক্ষোভে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন মুখ খোলা অবস্থায় বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শ্বেতাঙ্গ নাগরিক। বিক্ষোভকারীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সঙ্গে বামপন্থী জনতুষ্টিবাদী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁর রাজনৈতিক অবস্থানের মিল রয়েছে। তাঁর রাজনীতি মূলত অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক ব্যয় ও প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত।
অন্যদিকে, বিক্ষোভের সময় অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে। সরকারি ভবন, পুলিশের গাড়ি এবং বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের দোকান হামলার শিকার হয়েছে। অভিবাসীদের পরিচালিত ছোট দোকানেও হামলা হয়েছে। ফলে সহিংসতার শিকার হয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি ও সম্প্রদায়ের মানুষ।
অভিবাসন নিয়ে বিতর্ক, কিন্তু সংকটের কারণ আরও বিস্তৃত
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপের অস্থিরতার জন্য সেখানকার নেতাদের অভিবাসননীতিকে দায়ী করেছেন। তাঁর অভিযোগ, ইউরোপের দেশগুলো সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক অভিবাসীকে প্রবেশের সুযোগ দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক পরিসরের কিছু ব্যক্তিও ইউরোপে মুসলিম জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের কেউ কেউ পরিস্থিতিকে ইউরোপের সভ্যতা ও পরিচয়ের জন্য হুমকি হিসেবে বর্ণনা করছেন।
জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসও সাম্প্রতিক অস্থিরতার পেছনে উচ্চ অভিবাসনের হার এবং বিদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের সমাজে অন্তর্ভুক্তির ঘাটতির কথা বলেছেন। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী পিটার মাগিয়ারও অভিবাসন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তবে অর্থনৈতিক অসন্তোষ ও সাম্প্রতিক সহিংসতাকে কেবল অভিবাসনের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। ইউরোপের বহু মানুষ অভিবাসন ও আশ্রয়নীতিতে নিয়ন্ত্রণ চান—এমন মনোভাব থাকলেও বিক্ষোভের পেছনে জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষও গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্রান্সে কিছু তরুণ বিক্ষোভকারীর পোশাকে আলজেরিয়ার ফুটবল দলের প্রতীক দেখা গেছে এবং কেউ কেউ ফিলিস্তিনপন্থী স্লোগান দিয়েছেন। কিন্তু তাতে পুরো আন্দোলনকে জাতিগত বা ধর্মীয় সংঘাত হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অনেকের প্রধান দাবি ছিল অর্থনৈতিক স্বস্তি ও উন্নত জনসেবা।
সহিংসতার জন্যও আলাদা কারণ বিবেচনা করা জরুরি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু নৈরাজ্যবাদী গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে সহিংসতা উসকে দিয়েছে। ফ্রান্সের লিমোজ শহরে উনিশ শতকের একটি টাউন হল পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনার পর গ্রেপ্তার হওয়া এক ব্যক্তিকে এ ধরনের তৎপরতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ওই ব্যক্তি ছিলেন ত্রিশের কোঠার একজন শ্বেতাঙ্গ ফরাসি নাগরিক।
একই সঙ্গে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এর আগে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ দমনে পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ ছিল। সাম্প্রতিক সহিংসতার সময় জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশের সক্ষমতা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ফ্রান্সের অর্থনৈতিক সংকট মধ্যপন্থীদের সামনে বড় বাধা
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সরকার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক—দুই ধরনের চাপের মুখে রয়েছে। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সময় বিক্ষোভকারীদের শান্ত করতে সরকার বিপুল অর্থ ব্যয় করতে পেরেছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে একই ধরনের আর্থিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে।
ফ্রান্সের সরকারি ব্যয় বেশি, অথচ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক ধীর। প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, মাখোঁর শাসনামলে দেশটির বার্ষিক প্রবৃদ্ধি সামান্য বেশি ১ শতাংশের আশপাশে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাজেট ঘাটতি কমানো সরকারের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইনপ্রণেতাদের সামনে থাকা বাজেট পরিকল্পনায় ঘাটতি মাত্র ০.৪ শতাংশ পয়েন্ট কমিয়ে মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য রয়েছে। তারপরও এই ঘাটতির মাত্রা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয় বলে উদ্বেগ রয়েছে। বাজেট নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধের কারণে সরকারের পতনের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
ফ্রান্সের সরকারি ঋণ বেড়ে যাওয়া এবং দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতি আর্থিক বাজারেও প্রভাব ফেলেছে। জার্মানির সরকারি বন্ডের তুলনায় ফ্রান্সের সরকারি বন্ডের সুদের হারের ব্যবধান বেড়ে ইউরো সংকটের সময়কার পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিস্থিতি ঋণের ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে এবং সরকারের আর্থিক নীতিকে সীমিত করতে পারে।
একসময় মাখোঁকে মধ্যপন্থী রাজনীতির নতুন ধারার প্রতিনিধি হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে মধ্যপন্থী দলগুলো নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখতেই বেশি ব্যস্ত বলে প্রতিবেদনে মূল্যায়ন করা হয়েছে। অন্যদিকে, বাম ও ডান—উভয় প্রান্তের রাজনৈতিক শক্তি জনসমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
নির্বাচনের আগে চাপে ইউরোপের মধ্যপন্থী দল
ইউরোপের আসন্ন নির্বাচনগুলো মধ্যপন্থী দলগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। স্পেনে আগামী মাসে নির্বাচন এবং পরের বছর ফ্রান্স ও পোল্যান্ডে নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় ও জনসেবার সংকট নিয়ে ক্ষোভ ভোটারদের রাজনৈতিক পছন্দে প্রভাব ফেলতে পারে।
জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসও জনসমর্থনের সংকটে রয়েছেন। অভিবাসন নিয়ে তাঁর কঠোর বক্তব্যের পাশাপাশি বিকল্প রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। দেশটির ডানপন্থী দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানি বা এএফডির নেতা অ্যালিস ভাইডেলের উত্থান মধ্যপন্থী রাজনীতির জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
স্পেনে মধ্য-বামপন্থী প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সরকারও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে। দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মধ্য-ডান ও জনতুষ্টিবাদী ডানপন্থী শক্তির ভূমিকা বাড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে আলোচনা করা হয়েছে।
ফ্রান্সে আগামী মে মাসে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সহিংসতা এবং অভিবাসীদের দায়ী করার প্রবণতা কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালি দলের নেতা মারিন লে পেনের রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে। মাখোঁ যখন উপসাগরীয় অঞ্চলে সফরে ছিলেন, তখন লে পেন জনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে প্রেসিডেন্টসুলভ বক্তব্য দেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সপ্তাহে সহিংসতার ঘটনাগুলো তাঁর রাজনৈতিক প্রচারে প্রভাব ফেলেছিল।
তবে বিক্ষোভ বা জনমতের সাময়িক পরিবর্তন থেকে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায় না। অর্থনৈতিক সংকট, দলীয় অবস্থান, প্রার্থীদের কর্মসূচি এবং ভোটারদের সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়েই নির্বাচনের গতিপথ নির্ধারিত হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ
ইউরোপের মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে এখন শুধু ক্ষমতা ধরে রাখার প্রশ্ন নয়, বরং অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট মোকাবিলার চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সরকারগুলো যদি জনঅসন্তোষের কার্যকর সমাধান দিতে না পারে, তাহলে রাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর হতে পারে।
এর প্রভাব ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপরও পড়তে পারে। সদস্যদেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা দুর্বল হলে যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ কঠিন হয়ে উঠবে। আর্থিক বাজারে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়লে এক দেশের ঋণসংকট অন্য দেশেও প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি ইউরোপীয় দেশগুলোর নীতি ও ইউক্রেন যুদ্ধ মোকাবিলায় ঐক্য ধরে রাখাও কঠিন হতে পারে।
জর্জ ডেঞ্জারফিল্ড প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগের সময়ে এমন এক রাজনৈতিক সংকটের কথা লিখেছিলেন, যার পরিণতি তখন অনেকের কাছেই স্পষ্ট ছিল না। আজকের ইউরোপের রাজনৈতিক নেতাদের সামনে পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। অর্থনৈতিক দুরবস্থা, জনসেবার ঘাটতি ও রাজনৈতিক আস্থার সংকটকে অবহেলা করলে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।
ইউরোপের মধ্যপন্থী রাজনীতির ভবিষ্যৎ তাই নির্ভর করছে শুধু বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের ওপর নয়, বরং মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান দেওয়া, সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং রাজনৈতিক বিভাজন কমানোর সক্ষমতার ওপর।












