যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে ঘিরে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে দেশটির তরুণ প্রজন্মের একাংশের মধ্যে। বিশেষ করে জেন-জি প্রজন্মের রক্ষণশীল তরুণেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক কৌশল ও ব্যক্তিত্ব নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করছেন। একসময় ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির কারণে রাজনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হওয়া এই প্রেসিডেন্টকে ঘিরে এমন আগ্রহ যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন এক প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নিক্সনকে কেন্দ্র করে তৈরি এই প্রবণতার নাম দেওয়া হয়েছে ‘নিক্সনম্যাক্সিং’। চেহারা, শরীর ও ব্যক্তিত্বকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার বিভিন্ন অনলাইন প্রবণতার সঙ্গে মিল রেখে এই নামের ব্যবহার। তবে এখানে মূল আকর্ষণ শারীরিক সৌন্দর্য নয়, বরং নিক্সনের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, কঠোর অবস্থান এবং প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াই করার ধরন।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নিক্সনের বক্তব্য ও পুরোনো ভিডিও থেকে তৈরি ঝকঝকে সম্পাদনার ছোট ছোট দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব ভিডিওতে প্রায়ই হিপহপ সংগীত ব্যবহার করা হচ্ছে। তরুণদের কেউ কেউ ‘প্রিটি গার্লস ফর নিক্সন’ এবং ‘নিক্সন নাও মোর দ্যান এভার’ স্লোগান লেখা বেসবল টুপি ও কাপড়ের ব্যাগও ব্যবহার করছেন। ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত রিচার্ড নিক্সন প্রেসিডেনশিয়াল লাইব্রেরিতে দর্শনার্থীর সংখ্যাও আগের বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিক্সনের প্রত্যাবর্তন
নিক্সনকে ঘিরে এই নতুন আগ্রহ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে রিচার্ড নিক্সন ফাউন্ডেশন। অলাভজনক এই প্রতিষ্ঠানটি প্রেসিডেন্টের লাইব্রেরি পরিচালনায় সহায়তা করে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিষ্ঠানটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উপযোগী ছোট ভিডিও তৈরিতেও মনোযোগ দিয়েছে।
এসব ভিডিওতে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে নিক্সনের ভাবনা থেকে শুরু করে জন এফ কেনেডির সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার নানা দিক তুলে ধরা হচ্ছে। ভিডিওগুলো কয়েক মিলিয়নবার দেখা হয়েছে। মন্তব্যের ঘরে অনেকেই লিখছেন, পুরোনো এসব বক্তব্য আবার সামনে আসায় তরুণ প্রজন্ম নিক্সনের রাজনৈতিক দক্ষতা সম্পর্কে নতুন করে জানতে পারছে।
নিক্সন একসময় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বিতর্কিত প্রেসিডেন্টদের একজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর প্রেসিডেন্সির অবসান ঘটে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির প্রেক্ষাপটে পদত্যাগের মধ্য দিয়ে। সেই ইতিহাস সত্ত্বেও তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন দিক এখন নতুন করে তরুণদের আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে।
নীতির চেয়ে ব্যক্তিত্বেই বেশি আকর্ষণ
তরুণ রক্ষণশীলদের এই আগ্রহের পেছনে নিক্সনের নীতিগত সাফল্যের চেয়ে তাঁর ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক আচরণ বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর নীতি, যেটি ‘দেতাঁ’ নামে পরিচিত, কিংবা পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা গঠনে তাঁর ভূমিকা—এসব বিষয় বর্তমান অনলাইন আলোচনার প্রধান আকর্ষণ নয়।
বরং তরুণদের কাছে বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে নিক্সনের কঠোর রাজনৈতিক লড়াই, সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে বিরোধ এবং চাপের মুখেও নিজের অবস্থান ধরে রাখার ভাবমূর্তি। তাঁদের একাংশের চোখে নিক্সন ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে কিছু মিল রয়েছে। দুজনেরই সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ সম্পর্ক ছিল এবং দুজনই তদন্ত ও রাজনৈতিক বিরোধের মুখোমুখি হয়েছেন।
রক্ষণশীল লেখক ক্রিস রুফো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ডানপন্থীদের মধ্যে নিক্সনের পুনরাবিষ্কার মূলত তাঁর নির্দিষ্ট নীতির কারণে নয়। বরং এর কেন্দ্রে রয়েছে তাঁর মনোভাব এবং নিজের চেষ্টায় উঠে আসা একজন রাজনৈতিক নেতার বয়ান। রুফোর ব্যাখ্যায়, নিক্সন নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রতিনিধি হিসেবে ৪৯টি অঙ্গরাজ্যে জয় পেয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে একটি ‘ডিপ স্টেট’ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে তাঁর সমর্থকদের একাংশ মনে করে।
এটি নিক্সনের সমর্থকদের একটি রাজনৈতিক ব্যাখ্যা; ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে একে এক করে মেলানো যায় না। তবে এই ব্যাখ্যা তরুণ রক্ষণশীলদের একাংশের কাছে কেন আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে, তা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
ওয়াটারগেট নিয়ে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক
নিক্সনকে ঘিরে নতুন আগ্রহের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক বিতর্কেরও সম্পর্ক রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের বিচার বিভাগ ওয়াটারগেট ঘটনার তদন্তে যুক্ত বিশেষ কৌঁসুলির দপ্তর কোনো অসদাচরণ করেছিল কি না, তা পর্যালোচনা করছে।
গত জুনে নিক্সন লাইব্রেরিতে এক আলোচনায় ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ওয়াটারগেট নিয়ে মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, একই ঘটনা আজ ঘটলে তা হয়তো মাত্র ১২ ঘণ্টার সংবাদে পরিণত হতো। এ কারণে একটি প্রেসিডেন্সির পতন ঘটতে পারত—এমন ধারণাকেও তিনি প্রশ্নবিদ্ধ করেন।
ভ্যান্সের এই মন্তব্য নিক্সনের সময়কার রাজনৈতিক সংকট ও বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমের পরিবেশের মধ্যে তুলনা করার প্রবণতাকে সামনে এনেছে। তরুণ রক্ষণশীলদের একাংশের কাছে ওয়াটারগেটের ইতিহাস এখন শুধু অতীতের একটি কেলেঙ্কারি নয়; বরং রাজনৈতিক ক্ষমতা, সংবাদমাধ্যম ও সরকারি তদন্তের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের অংশ।
রিগ্যানের বদলে নিক্সন কেন?
নিক্সনকে ঘিরে আগ্রহের আরেকটি দিক হলো, তরুণ ডানপন্থীদের একাংশের মধ্যে সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের প্রতি প্রচলিত শ্রদ্ধার অবস্থান বদলে যাওয়া। কয়েক দশক ধরে রিগ্যান যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল রাজনীতির অন্যতম প্রধান প্রতীক। মুক্তবাজার অর্থনীতি, আন্তর্জাতিকতাবাদ এবং সীমিত সরকারি হস্তক্ষেপের পক্ষে তাঁর অবস্থান রক্ষণশীল রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
কিন্তু বর্তমান ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা ‘মাগা’ ধারার সঙ্গে রিগ্যানের রাজনৈতিক দর্শনের কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে বিশ্বায়ন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক নীতির প্রশ্নে নতুন প্রজন্মের রক্ষণশীলদের একাংশ আগের প্রজন্মের অবস্থান থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
‘দ্য আমেরিকান কনজারভেটিভ’ সাময়িকীর কার্ট মিলসের মতে, রিগ্যান মূলত বেবি-বুমার প্রজন্মের কাছে এক ধরনের রাজনৈতিক দেবতার মতো। কিন্তু নতুন ডানপন্থী ও তরুণ রক্ষণশীলদের চিন্তায় এমন ধারণা কাজ করছে যে বয়স্ক প্রজন্মের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই দেশকে বর্তমান অবস্থায় নিয়ে এসেছে। তাই রিগ্যান যদি সেই পুরোনো প্রজন্মের প্রধান আদর্শ হন, তবে তাঁকেও নতুন করে প্রশ্ন করার প্রয়োজন রয়েছে—এমন মনোভাব দেখা যাচ্ছে তাঁদের মধ্যে।
এই প্রেক্ষাপটে নিক্সন তরুণ রক্ষণশীলদের কাছে বিকল্প প্রতীক হয়ে উঠছেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন, প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘাত এবং ক্ষমতার কেন্দ্রে টিকে থাকার লড়াই বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক ভাষ্যের সঙ্গে সহজেই যুক্ত করা যাচ্ছে।
জনপ্রিয়তার নতুন ঢেউ কি বদলাবে নিক্সনের ইতিহাস?
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিক্সনের জনপ্রিয়তা বাড়লেও তাঁর ঐতিহাসিক ভাবমূর্তি বদলে গেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে বিতর্ক এবং শেষ পর্যন্ত পদত্যাগের ঘটনা তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়েই রয়েছে।
বর্তমান অনলাইন প্রবণতা মূলত তাঁর ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের নির্বাচিত দিকগুলোকে সামনে আনছে। এতে তাঁর প্রশাসনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড কিংবা প্রেসিডেন্সির অবসানের কারণগুলো আড়ালে থেকে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
নিক্সনকে ঘিরে নতুন আগ্রহ কত দিন স্থায়ী হবে, তা এখনই বলা কঠিন। তবে তাঁর রাজনৈতিক ভাবমূর্তি যে সময়ের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের কাছে ভিন্নভাবে উপস্থাপিত হতে পারে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই প্রবণতা তারই একটি উদাহরণ। অতীতেও নিক্সনকে রাজনৈতিকভাবে বাতিল বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল। এখন আবার তাঁকে ঘিরে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই নতুন জনপ্রিয়তা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে তাঁর বিতর্কিত অবস্থান কতটা বদলাতে পারবে, তা সময়ই বলে দেবে।












