একসময় ‘মেড ইন চায়না’ বলতেই চোখের সামনে ভেসে উঠত সস্তা টি-শার্ট, প্লাস্টিকের খেলনা, জুতা কিংবা সাধারণ ইলেকট্রনিক পণ্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই পরিচিতি বদলে গেছে। এখন চীনের তৈরি পণ্য বলতে শুধু সস্তা ভোগ্যপণ্য নয়, বৈদ্যুতিক গাড়ি, শিল্পকারখানার রোবট, উন্নত রাসায়নিক উপাদান, এআই প্রযুক্তির অবকাঠামো এবং আধুনিক যন্ত্রপাতিও বোঝায়। বিশ্ববাজারে চীনের রপ্তানির এই পরিবর্তন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রচলিত হিসাব নতুন করে সাজাচ্ছে।
গত এক দশকে চীন উৎপাদনশিল্পে নিজেদের অবস্থান বদলাতে ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ করেছে। আগে যেসব পণ্যে দেশটির প্রধান শক্তি ছিল কম খরচে বিপুল উৎপাদন, এখন সেসবের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর ও তুলনামূলক উচ্চমূল্যের পণ্যেও নিজেদের সক্ষমতা বাড়িয়েছে তারা। এর ফলে একদিকে বিশ্ববাজারে আধুনিক পণ্যের সরবরাহ বেড়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও ইউরোপের অন্যান্য দেশের উৎপাদকদের জন্য প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়েছে।
২০২৫ সালের রপ্তানির পরিসংখ্যানেও এই পরিবর্তনের চিত্র স্পষ্ট। ২০১৫ সালের তুলনায় মূল্যস্ফীতির প্রভাব সমন্বয় করার পর চীনের যানবাহন রপ্তানির মূল্য বেড়েছে ১৯২ শতাংশ। বিপরীতে বোনা পোশাকের রপ্তানি কমেছে ৪০ শতাংশ, জুতার রপ্তানি কমেছে ৩৭ শতাংশ এবং নিট পোশাকের রপ্তানি কমেছে ২৮ শতাংশ। অর্থাৎ, চীনের রপ্তানি শুধু বাড়ছে না; কোন ধরনের পণ্য দেশটির অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে, সেই চিত্রও বদলে যাচ্ছে।
২০২৫ সালে চীনের যানবাহন রপ্তানির মূল্য দাঁড়ায় ২৪৮ বিলিয়ন ডলার, যা দেশটির মোট রপ্তানির ৬ দশমিক ৬ শতাংশ। ইলেকট্রনিক পণ্যের রপ্তানি ছিল ১ হাজার ১৭ বিলিয়ন ডলার বা মোট রপ্তানির ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ। যন্ত্রপাতি ও যান্ত্রিক সরঞ্জামের রপ্তানি দাঁড়ায় ৬০৪ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রপ্তানির ১৬ শতাংশ। অন্যদিকে প্লাস্টিক পণ্যের রপ্তানি ১৪২ বিলিয়ন ডলার এবং ইস্পাতজাত পণ্যের রপ্তানি ১০৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে এক দশকের বেশি সময় ধরে নেওয়া সরকারি শিল্পনীতি, বিপুল উৎপাদন সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং বিভিন্ন খাতে আর্থিক সহায়তা। একই সঙ্গে আবাসন খাতের দীর্ঘস্থায়ী সংকট এবং দুর্বল অভ্যন্তরীণ ভোগ চীনের উৎপাদকদের বিদেশি বাজারের ওপর আরও নির্ভরশীল করে তুলেছে। দেশটির অনেক পরিবারের সম্পদের বড় অংশ আবাসনের সঙ্গে যুক্ত। ফলে আবাসন খাতের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ভোক্তাদের ব্যয় বাড়ানোর আগে উৎপাদনশিল্প সচল রাখতে রপ্তানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বিশ্বের কোটি কোটি ক্রেতার কাছে এর অর্থ হলো তুলনামূলক কম দামে আধুনিক পণ্য পাওয়ার সুযোগ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি কিংবা ইউরোপের অন্য দেশগুলোর যেসব কারখানা চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এ কারণেই চীনের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এখন শুধু অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্প নয়; এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, শিল্পনীতি ও কর্মসংস্থান নিয়ে নতুন বিতর্কেরও কেন্দ্র।
এআইয়ের অবকাঠামোতেও চীনের প্রভাব
এআই প্রযুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। উন্নত চিপ, তথ্য বিশ্লেষণ এবং কম্পিউটিং সক্ষমতায় দুই দেশ নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। তবে এই প্রতিযোগিতার মধ্যেই একটি বাস্তবতা স্পষ্ট হচ্ছে—বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এআই অবকাঠামো তৈরি করতে চীনে উৎপাদিত বিভিন্ন যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরশীল।
সবচেয়ে উন্নত এআই চিপের নকশা সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো করে এবং সেগুলোর উৎপাদনে তাইওয়ানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু একটি আধুনিক তথ্যকেন্দ্র বা ডেটা সেন্টার চালাতে শুধু উন্নত চিপ যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন সাধারণ ও মাঝারি সক্ষমতার চিপ, মেমোরি, সার্ভারের যন্ত্রাংশ, বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার, তার, নিয়ন্ত্রণ বোর্ড এবং বিপুল পরিমাণ অন্যান্য সরঞ্জাম। এসব পণ্যের অনেকগুলোই চীন থেকে সরবরাহ করা হয়।
টনি ব্লেয়ার ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল চেঞ্জের জ্যেষ্ঠ ভূরাজনৈতিক উপদেষ্টা রুবি ওসমানের মতে, এআইয়ের প্রসার চীনের বাণিজ্যিক অবস্থানকে নতুনভাবে গড়ে তুলছে। বিশেষ করে প্রচলিত চিপ এবং এআই অবকাঠামো তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন যন্ত্রাংশে চীন আবারও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে চীনের চিপ রপ্তানি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ১৭৭ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে কম্পিউটার ও সার্ভার রপ্তানি বেড়েছে ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান দেখায়, এআই প্রযুক্তির বিস্তার চীনের জন্য নতুন রপ্তানি বাজার তৈরি করছে।
তবে এসব পণ্যের সবই সরাসরি এআই কাজে ব্যবহৃত হয় না। সংশ্লিষ্ট রপ্তানি শ্রেণিতে এআই অবকাঠামোর জন্য অপরিহার্য যন্ত্রাংশের পাশাপাশি অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত পণ্যও রয়েছে। তারপরও আধুনিক প্রযুক্তির সরবরাহব্যবস্থায় চীনের গুরুত্ব যে বাড়ছে, তা স্পষ্ট।
রাসায়নিক শিল্পে সাধারণ পণ্য থেকে উন্নত উপাদান
একটি বাড়ির দেয়ালের রং, সোফার ফোম, ময়লা ফেলার ব্যাগ কিংবা শ্যাম্পুর মতো দৈনন্দিন পণ্যের পেছনেও চীনের রাসায়নিক শিল্পের ভূমিকা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশটি সাধারণ রাসায়নিক পণ্য উৎপাদন করলেও উচ্চমূল্যের অনেক রাসায়নিকের জন্য ইউরোপ, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করত।
এখন সেই চিত্র বদলাচ্ছে। গাড়ির বাম্পারে ব্যবহৃত নমনীয় প্লাস্টিক, ছাদে বসানো সৌর প্যানেলের উপাদান এবং উন্নত সাইকেলের কাঠামো তৈরিতে ব্যবহৃত কার্বন ফাইবারের মতো পণ্যেও চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
এই অগ্রগতির পেছনে সরকারি আর্থিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে চীনের রাসায়নিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ৭৫ বিলিয়ন ডলারের সরকারি ভর্তুকি পেয়েছে। ২০২৩ সালে এই সহায়তার পরিমাণ প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল।
চীনের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশটিতে প্রায় পাঁচ হাজার নতুন রাসায়নিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এতে উৎপাদনক্ষমতা দ্রুত বেড়েছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ায় সাধারণ রাসায়নিক পণ্যের বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হয়েছে। জুতা ও আঠার মতো পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত রাসায়নিকের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়েছে। কিছু কারখানাকে উৎপাদন কমাতে হয়েছে, আবার অনেক প্রতিষ্ঠান বিদেশি বাজারে পণ্য বিক্রির চেষ্টা করছে।
চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দামের প্রতিযোগিতা বাড়ায় আন্তর্জাতিক রাসায়নিক শিল্পেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিএএসএফ, ডাও, লায়নডেলবাসেল, সুমিতোমো কেমিক্যাল, ইনিওস এবং মিতসুবিশি কেমিক্যালের মতো প্রতিষ্ঠান গত এক বছরে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করেছে যে চীনের উৎপাদনক্ষমতা ও কম দামের প্রতিযোগিতা তাদের মুনাফার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
অর্থাৎ, চীন এখন শুধু বেশি রাসায়নিক উৎপাদন করছে না; উন্নত উপাদানের বাজারেও নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে। এর ফলে শিল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার ধরন বদলে যাচ্ছে।
কারখানা তৈরির যন্ত্রপাতিতেও চীনের উত্থান
কোনো দেশের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে, দেশটির কারখানা বন্ধ হচ্ছে এবং শ্রমিকেরা চাকরি হারাচ্ছেন—এমন পরিস্থিতিতে সহজ সমাধান হিসেবে চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ এবং নিজস্ব কারখানা গড়ে তোলার কথা বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শিল্পনীতি ও শুল্ক কৌশলেও এই লক্ষ্য গুরুত্ব পেয়েছে।
কিন্তু এখানে একটি জটিলতা রয়েছে। চীন এখন শুধু তৈরি পণ্য সরবরাহকারী নয়, অন্য দেশকে কারখানা গড়ে তুলতে যে যন্ত্রপাতি লাগে, তারও বড় সরবরাহকারী। ফলে চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক বসিয়ে নিজস্ব উৎপাদন বাড়াতে চাইলেও সেই উৎপাদন চালুর জন্য চীনে তৈরি যন্ত্রাংশ ও যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হতে পারে।
২০১৫ সালের তুলনায় চীনের শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত রোবটের রপ্তানি ৩০০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও ইতালির কিছু উৎপাদক বাজারের অংশ হারিয়েছে। যন্ত্রপাতি রপ্তানিতেও চীন জার্মানিকে ছাড়িয়ে বিশ্বের বৃহত্তম রপ্তানিকারক হয়ে উঠেছে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের হিসাব অনুযায়ী, পরিমাণের হিসাবে বৈশ্বিক মূলধনি পণ্যের চাহিদায় ইউরোপের অংশ ২০০৫ সালের ৫৪ শতাংশ থেকে কমে ৪৩ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে চীনের অংশ ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৪ শতাংশ হয়েছে।
অবশ্য সব ধরনের শিল্পপ্রযুক্তিতে চীন এখনো সমানভাবে এগিয়ে নেই। উন্নতমানের অপটিক্যাল প্রযুক্তি এবং নেদারল্যান্ডসের বিশেষায়িত চিপ তৈরির যন্ত্রপাতির মতো কিছু ক্ষেত্রে ইউরোপের প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্ত অবস্থান রয়েছে। তবে সাধারণ শিল্পকারখানার জন্য প্রয়োজনীয় নানা যন্ত্রপাতি উৎপাদনে চীন দ্রুত সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
এইচএসবিসির প্রধান এশিয়া অর্থনীতিবিদ ফ্রেড নিউম্যানের মতে, চীনা যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে নতুন কারখানা তৈরি করা সম্ভব হলেও উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রাংশের জন্য চীনের ওপর নির্ভরতা থেকে যেতে পারে। ফলে শুধু শুল্ক আরোপ করে উৎপাদন ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সহজ নয়।
বৈদ্যুতিক গাড়িতে চীনের বড় সাফল্য
চীনের নতুন রপ্তানি শক্তির সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ হলো গাড়ি। একসময় ইউরোপীয় গাড়ির সমালোচক হিসেবে পরিচিত ব্রিটিশ উপস্থাপক ও গাড়িবিষয়ক লেখক জেরেমি ক্লার্কসনের মতো ব্যক্তিরাও চীনের কিছু গাড়ির মান নিয়ে কটাক্ষ করেছেন। কিন্তু ইউরোপের বাজারে চীনা গাড়ির বিক্রি বাড়ার প্রবণতা দেখাচ্ছে, ক্রেতাদের একটি বড় অংশ এখন এসব গাড়ি গ্রহণ করছে।
ইউরোপীয় অটোমোবাইল নির্মাতাদের সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ইউরোপে চীনের লিপমোটর ব্র্যান্ডের গাড়ি বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৫৮ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে বিওয়াইডির গাড়ি বিক্রি বেড়েছে ১৪৬ শতাংশ।
চীনের গাড়ি রপ্তানির মূল্য ২০১৫ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে ১ হাজার ৮৭১ শতাংশ বেড়েছে। বিশেষ করে ২০২০ সালের পর এই প্রবৃদ্ধি দ্রুত হয়েছে। এর পেছনে রয়েছে চীনের বিপুল উৎপাদনক্ষমতা এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে তৈরি হওয়া তীব্র প্রতিযোগিতা।
চীনে অনেক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে উৎপাদন বাড়িয়েছে। ফলে বাজারে প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত গাড়ি দেশের ভেতরে বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিদেশি বাজারে ক্রেতা খোঁজা তখন তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিপুল উৎপাদন, তুলনামূলক কম দাম এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রযুক্তিতে অগ্রগতি চীনা নির্মাতাদের আন্তর্জাতিক বাজারে সুবিধা দিয়েছে।
তবে এই সাফল্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে উদ্বেগও তৈরি করেছে। স্থানীয় গাড়ি নির্মাতারা চীনের সঙ্গে দামের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন। নিজেদের শিল্প ও কর্মসংস্থান রক্ষায় পশ্চিমা দেশগুলো চীনা গাড়ির ওপর বিভিন্ন বাণিজ্যিক বাধা ও শুল্ক আরোপ করেছে।
১৯৮০-এর দশকে জাপানি গাড়ির উত্থান যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের শিল্পে যে চাপ তৈরি করেছিল, চীনা গাড়ির বর্তমান অগ্রগতির সঙ্গে তার তুলনা করা হচ্ছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি এবং সফটওয়্যারনির্ভর প্রযুক্তির গুরুত্ব নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
চীনের গাড়িশিল্পের সাফল্য তাই শুধু একটি পণ্যশ্রেণির রপ্তানি বৃদ্ধির ঘটনা নয়। এটি দেশটির উৎপাদনশিল্পের প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা এবং বাণিজ্যনীতির সংঘাত—সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত।
স্মার্ট গৃহস্থালি যন্ত্রেও বাড়ছে চীনের দাপট
চীনে বিস্তৃত সবুজ লন বা বড় ব্যক্তিগত বাগানের সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও দেশটি এখন রোবটচালিত ঘাস কাটার যন্ত্রের বড় উৎপাদক। নিজস্ব বাজারে চাহিদা সীমিত হওয়ায় চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি ক্রেতাদের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। এতে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠিত উৎপাদকদের ওপর চাপ বাড়ছে।
চীন দীর্ঘদিন ধরে কম দামের ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদনে এগিয়ে ছিল। এখন দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নত গৃহস্থালি যন্ত্রের বাজারেও প্রবেশ করছে। ২০১৫ সাল থেকে রপ্তানি মূল্যের হিসাবে ভ্যাকুয়াম ক্লিনার এবং বিদ্যুৎচালিত ঘাস কাটার যন্ত্রের বাজারে চীন শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগীদের তুলনায় তাদের ব্যবধানও বেড়েছে।
এই প্রবৃদ্ধির পেছনে রয়েছে গাড়িশিল্পে তৈরি হওয়া প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ব্যবহার। বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য উন্নত অবস্থান নির্ণয়, এআই, বড় তথ্যভান্ডার বিশ্লেষণ এবং স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরিতে যে প্রযুক্তি ও দক্ষতা গড়ে উঠেছে, সেগুলো এখন অন্যান্য পণ্যেও কাজে লাগানো হচ্ছে।
রোবটচালিত ঘাস কাটার যন্ত্রে উচ্চনির্ভুল উপগ্রহভিত্তিক অবস্থান নির্ণয় প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এর সাহায্যে যন্ত্রটি বাগানের সীমানা শনাক্ত করতে পারে এবং নির্ধারিত এলাকার বাইরে না গিয়ে ঘাস কাটতে পারে। বৈদ্যুতিক গাড়ির সহায়ক চালনা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত প্রযুক্তির সঙ্গে এর কিছু মিল রয়েছে।
এই খাতের প্রতিযোগিতায় পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসভিত্তিক আইরোবট, জনপ্রিয় রুম্বা রোবট ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের নির্মাতা, গত বছরের ডিসেম্বরে দেউলিয়া সুরক্ষার আবেদন করে। চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে বাজারের অংশ হারানো প্রতিষ্ঠানটির সংকটের অন্যতম কারণ ছিল। শেনজেনভিত্তিক পিসিয়ার মতো চীনা প্রতিষ্ঠান, যারা একসময় আইরোবটের সরবরাহকারী ছিল, এখন নিজেরাই আন্তর্জাতিক বাজারে শক্তিশালী প্রতিযোগী। পিসিয়া পরবর্তী সময়ে আইরোবটের মালিকও হয়।
রোবটচালিত ঘাস কাটার যন্ত্রের বাজারেও ইউরোপ চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মহাদেশটি এই পণ্যের বিশ্বের বৃহত্তম ক্রেতাবাজার। চীনা উৎপাদকদের কম দাম ও দ্রুত উৎপাদনক্ষমতা তাদের সেখানে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সাহায্য করছে।
তবে এই প্রতিযোগিতা নিয়ে ইউরোপেও উদ্বেগ বাড়ছে। গত বছরের নভেম্বরে স্থানীয় এক উৎপাদকের অভিযোগের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন চীনা রোবটচালিত ঘাস কাটার যন্ত্রের বিরুদ্ধে ডাম্পিংবিরোধী তদন্ত শুরু করে। অভিযোগ ছিল, চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীরা প্রায় ৪০ শতাংশ কম দামে পণ্য বিক্রি করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও এই পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট। দেশটির বিদ্যুৎচালিত ঘাস কাটার যন্ত্রের রপ্তানির মূল্য ২০২৩ সালের ১ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে গত বছর ৭৪৬ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। বিপরীতে একই সময়ে চীনের রপ্তানি ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার থেকে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
বিশ্ববাণিজ্যে নতুন বাস্তবতা
চীনের রপ্তানিতে এই রূপান্তর দেখায়, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার ধরন বদলে যাচ্ছে। আগে কম মজুরি ও বিপুল শ্রমশক্তিকে কাজে লাগিয়ে সস্তা পণ্য উৎপাদন ছিল চীনের প্রধান সুবিধা। এখন সেই সুবিধার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উন্নত প্রযুক্তি, বৃহৎ উৎপাদনব্যবস্থা, সরকারি সহায়তা এবং বিভিন্ন শিল্পের মধ্যে প্রযুক্তি ও দক্ষতা ভাগ করে নেওয়ার সক্ষমতা।
এর ফলে চীন একই সঙ্গে ভোগ্যপণ্য, শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি, গাড়ি, রাসায়নিক উপাদান এবং এআই অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী হয়ে উঠছে। একটি দেশের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করে অন্য দেশে উৎপাদন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলেও উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চীনের ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি কাটানো কঠিন হতে পারে।
অন্যদিকে, চীনের অতিরিক্ত উৎপাদনক্ষমতা এবং কম দামের পণ্য বিদেশি বাজারে প্রবেশ করায় স্থানীয় শিল্প ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে বিভিন্ন দেশ একদিকে সস্তা ও আধুনিক পণ্যের সুবিধা নিতে চাইছে, অন্যদিকে নিজেদের উৎপাদনশিল্প রক্ষায় বাণিজ্যিক বাধা তৈরি করছে।
চীনের সামনে এখন বড় প্রশ্ন হলো, এই রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কতটা টেকসই হবে এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা কতটা শক্তিশালী করা যাবে। আর বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো, চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে কীভাবে নিজেদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, শিল্পভিত্তি ও কর্মসংস্থান রক্ষা করা যায়।
‘মেড ইন চায়না’র নতুন পরিচয় তাই শুধু সস্তা পণ্য থেকে উন্নত পণ্যে উত্তরণের গল্প নয়। এটি বিশ্ব উৎপাদনব্যবস্থায় ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাওয়ারও ইঙ্গিত।












