শিক্ষার মান উন্নয়ন, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং বাধ্যতামূলক সামরিক বাহিনীতে যোগদানের বিরোধিতা করে জার্মানির ৩৪টি শহরে বড় ধরনের বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিয়েছে তরুণ প্রজন্ম। আয়োজকদের দাবি, শনিবার হ্যালোইন উৎসবের দিন দেশজুড়ে এসব কর্মসূচিতে ১ লাখ ৬০ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নিতে পারেন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জেন-জি নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় জার্মানিতেও ছড়িয়ে পড়ছে এই প্রতিবাদ।
বার্লিন, ফ্রাঙ্কফুর্ট ও মিউনিখসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে বিক্ষোভের আয়োজন করেছে ‘জেন জেড রেগেল্ট’ (Gen Z regelt) নামের একটি প্রচারাভিযানভিত্তিক সংগঠন। নামটির অর্থ, জেন-জি নিজেরাই দায়িত্ব নিচ্ছে। সংগঠনটির দাবি, তরুণদের উদ্বেগ উপেক্ষা করে সরকার শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ না বাড়িয়ে বরং ব্যয় সংকোচনের পথে হাঁটছে। একই সঙ্গে তরুণদের ওপর বাড়তি আর্থিক ও সামাজিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ
জার্মানির অর্থনীতি ইউরোপের বৃহত্তম হলেও সাম্প্রতিক সময়ে দেশটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হিমশিম খাচ্ছে। অন্যদিকে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর অবসরের কারণে পেনশন ও সরকারি সেবার ওপর চাপ বাড়ছে। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এসব খাতের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে তরুণদের দাবি, শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
মিউনিখের সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী স্টিভের। তাঁর অভিযোগ, তরুণদের উদ্বেগের জবাবে সরকার ব্যয় কমানো এবং তাঁদের ওপর আরও চাপ বাড়ানো ছাড়া কার্যকর কিছু করছে না। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার প্রয়োগ অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
বার্লিনের টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী শন বেকারও বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনগুলোর অবস্থা অত্যন্ত জরাজীর্ণ। নিয়মিত ক্লাস করতে হয় এমন কক্ষগুলোও পরিত্যক্ত ভবনের মতো দেখায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত দুরবস্থা সামনে আনতে চান তিনি।
ফ্রান্সের সহিংসতার পুনরাবৃত্তি নিয়ে সতর্কতা
জার্মানির কর্তৃপক্ষের ধারণা, শনিবারের বিক্ষোভগুলো মোটের ওপর শান্তিপূর্ণ থাকবে। তবে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো আন্দোলনকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা করতে পারে বলে সতর্ক করেছে তারা।
ফেডারেল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জার্মানির কিছু উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠী এবং বিদেশি উগ্রপন্থী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু পক্ষ বিক্ষোভে সমর্থন জোগাড়ের চেষ্টা করছে।
হেসে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোমান পোজেক বিশেষভাবে ফ্রান্সের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন। সেখানে তরুণদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া বিক্ষোভের কিছু অংশ সহিংসতা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের ওপর হামলায় গড়িয়েছে। জার্মানিতে যেন এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়ে সতর্ক করেছেন তিনি।
সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলার আশঙ্কায় বার্লিনের অভিজাত কেনাকাটার এলাকা কুরফুরস্টেনডামে কয়েকটি দোকান আগেভাগেই প্রস্তুতি নিয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান তাদের দোকানের কাচের জানালা কাঠের পাটাতন দিয়ে ঢেকে দিয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ রাখার পরিকল্পনা করেছে।
আন্দোলনের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন
বিক্ষোভের আয়োজক সংগঠনটি তরুণদের আন্দোলন হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিলেও এর নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক সংগঠনের সম্পৃক্ততার কারণে আন্দোলনটি কতটা প্রকৃত অর্থে তরুণদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
জার্মানির জাতীয় স্কুলশিক্ষার্থী সংগঠন বিএসকে এই উদ্যোগ থেকে নিজেদের দূরে রেখেছে। তবে সংগঠনটির মহাসচিব অ্যামি কির্খফ বলেছেন, আন্দোলনের আয়োজকদের সঙ্গে একমত না হলেও শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ ও দাবিগুলো যৌক্তিক। আগামী ২০ নভেম্বর তারা আলাদা বিক্ষোভ কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা করেছে।
জার্মানির এই আন্দোলন ইউরোপজুড়ে তরুণদের রাজনৈতিক সক্রিয়তার নতুন প্রবণতার অংশ। সার্বিয়ায় শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলন নির্বাচনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন নেতৃত্বের পতনে ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে ফ্রান্সে একই ধরনের বিক্ষোভের কিছু অংশ সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। ফলে জার্মানির শনিবারের কর্মসূচি শুধু তরুণদের দাবি-দাওয়া নয়, আন্দোলনের শান্তিপূর্ণ চরিত্র বজায় রাখার সক্ষমতারও পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।












