জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির উচ্চমূল্য, শিক্ষা ও সরকারি পরিষেবার দুরবস্থা এবং প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সরকারের ওপর ক্ষোভ থেকে ফ্রান্সে আবারও বড় ধরনের বিক্ষোভের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শনিবার দেশজুড়ে ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত দুই সপ্তাহ আগে বিক্ষোভের সময় দাঙ্গা, ভাঙচুর ও লুটপাটে বিভিন্ন শহরের দোকানপাট, সরকারি ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর এবার নিরাপত্তা জোরদার করা হচ্ছে।
শনিবারের বিক্ষোভটি হ্যালোইন উৎসবের দিন হওয়ায় মুখোশ ব্যবহার করে দাঙ্গাকারীরা নিজেদের পরিচয় আড়াল করতে পারে বলে আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেছেন, কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে কঠোরভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হবে। তাঁর ভাষায়, বিক্ষোভ ঘিরে অস্থিরতার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।
জীবনযাত্রার ব্যয় থেকে ক্ষোভের বিস্তার
গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ফ্রান্সের ২০২৭ সালের বাজেট নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার পর বিক্ষোভের গতি বাড়তে থাকে। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শ্রমিক সংগঠন এবং নতুন করে সক্রিয় হওয়া ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সমর্থকেরাও এতে যুক্ত হয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দেশটির অনেক স্কুলের অবকাঠামো জরাজীর্ণ, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অতিরিক্ত এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যবস্থায় বৈষম্য রয়েছে। অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের ক্ষোভের বড় কারণ জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও জ্বালানির উচ্চমূল্য।
সরকার শিক্ষা খাতে সংস্কার এবং জ্বালানির ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও তাতে বিক্ষোভকারীদের অসন্তোষ কমেনি।
প্যারিসের উপশহর নোজঁ-সুর-মার্নের ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থী অ্যারন বের্তিয়ে দ্য গ্রঁদ্রি টানা তৃতীয় সপ্তাহের মতো বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, তরুণদের দেশের ভবিষ্যৎ বলা হলেও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা না থাকলে সেই ভবিষ্যৎই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
ঋণের চাপে সরকারের সীমিত সুযোগ
বিক্ষোভ সামাল দেওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপও মোকাবিলা করতে হচ্ছে মাখোঁ সরকারকে। দেশটির সরকারি ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১২০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। ঋণ নেওয়ার ব্যয়ও বাড়ছে। ফলে সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের চাপের মধ্যে নতুন অর্থ বরাদ্দ দিয়ে জনঅসন্তোষ প্রশমনের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে।
শুক্রবার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে ফ্রান্সের অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে। এর মধ্যে ধারাবাহিক বিক্ষোভ ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতিও বাড়াচ্ছে।
ফ্রান্সের চেম্বার অব কমার্সের হিসাব অনুযায়ী, বিক্ষোভের কারণে খুচরা ব্যবসায়ীদের ক্ষতির পরিমাণ ১০০ কোটি ইউরো ছাড়িয়েছে। বিমাবিহীন ক্ষয়ক্ষতি ও হারানো রাজস্ব হিসাব করলে মোট ক্ষতির পরিমাণ দ্বিগুণ হতে পারে বলে অন্যান্য হিসাব থেকে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।
ইউরোপের অন্য দেশেও ছড়াচ্ছে আন্দোলন
ফ্রান্সের বিক্ষোভ ইউরোপের অন্যান্য দেশেও তরুণদের আন্দোলনে উৎসাহ জুগিয়েছে। শনিবার জার্মানির ৩০টির বেশি শহরে বিক্ষোভের পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে ফ্রান্সে চলমান অস্থিরতা রাজনৈতিক সমীকরণেও প্রভাব ফেলছে। আগামী এপ্রিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছেন কট্টর ডানপন্থী নেতা মারিন ল্য পেন। অন্যদিকে মাখোঁর সম্ভাব্য মধ্যপন্থী উত্তরসূরিরা এখনো নিজেদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলতে পারেননি।
বিক্ষোভকারীদের ক্ষতিপূরণ দিতে নতুন আইন
দাঙ্গা ও ভাঙচুর ঠেকাতে সরকার নতুন একটি বিতর্কিত আইন কার্যকরের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রস্তাবিত বিধান অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি কিংবা যে গোষ্ঠীর সঙ্গে তাকে যুক্ত বলে বিবেচনা করা হবে, তাদের সংঘটিত ক্ষয়ক্ষতির জন্য সর্বোচ্চ ১০ হাজার ইউরো পর্যন্ত জরিমানা দিতে হতে পারে।
তবে মানবাধিকার সংগঠন ও কয়েকজন আইনজীবীর আশঙ্কা, এই আইন শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার অধিকার ক্ষুণ্ন করতে পারে।
বিক্ষোভের আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসও ফ্রান্সে অবস্থানরত ভ্রমণকারীদের সম্ভাব্য সমাবেশ ও বিক্ষোভস্থল এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। ফলে শনিবারের পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার যেমন ব্যাপক নিরাপত্তা প্রস্তুতি নিয়েছে, তেমনি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপও বাড়ছে।












