প্যারিসের বিখ্যাত লুভর জাদুঘরে চুরির ঘটনার পর ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ছোট ও আঞ্চলিক জাদুঘরগুলোতেও একের পর এক চুরির ঘটনা ঘটছে। ইতালি, ফ্রান্স ও স্পেনের বিভিন্ন জাদুঘর থেকে মূল্যবান চিত্রকর্ম, প্রাচীন স্বর্ণমুদ্রা ও ঐতিহাসিক নিদর্শন চুরি হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বড় জাদুঘরের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে পাশ কাটানোর পর অপরাধীরা এখন তুলনামূলক কম সুরক্ষিত ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে।
গত ২২ মার্চ ইতালির পারমার কাছে ফন্ডাজিওনে মান্যানি রোক্কা জাদুঘরে সংঘটিত চুরিটি এই উদ্বেগের বড় উদাহরণ। রাতে মাথায় আলো লাগানো টর্চ পরে দুই ব্যক্তি জাদুঘরের একটি ভাঙা জানালা দিয়ে ভেতরে ঢোকে। মাত্র তিন মিনিটের মধ্যে পল সেজান, পিয়ের-অগুস্ত রেনোয়া ও অঁরি মাতিসের তিনটি চিত্রকর্ম দেয়াল থেকে খুলে সহযোগীর হাতে তুলে দিয়ে পালিয়ে যায় তারা। চিত্রকর্মগুলোর আনুমানিক মূল্য ছিল ৯০ লাখ ইউরো বা প্রায় ১ কোটি ডলার।
জাদুঘরের প্রধান ফটকে থাকা আরেক সহযোগী অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ব্যবহার করে নিরাপত্তারক্ষীর মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দেয়। জাদুঘরটির পরিচালক স্তেফানো রোফির ভাষায়, নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রায় সব জায়গাতেই ব্যর্থতা ছিল।
ছোট জাদুঘর কেন অপরাধীদের লক্ষ্য
গত বছরের লুভর চুরির পর ইউরোপের বিভিন্ন জাদুঘরে চুরির ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে। আগস্টে ইতালির সিসিলিতে চিত্রশিল্পী আন্তোনেল্লো দা মেসিনার জন্মশহরের একটি জাদুঘর থেকে তাঁর শিল্পকর্ম উধাও হয়। পরের মাসে ফ্রান্সের কাগন-সুর-মের থেকে রেনোয়ার দুটি চিত্রকর্ম চুরি হয়।
স্পেনেও কয়েকটি জাদুঘর থেকে শত শত ঐতিহাসিক স্বর্ণমুদ্রা এবং ব্রোঞ্জ যুগের একটি মূল্যবান প্রত্নসম্পদ চুরি হয়েছে।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবিষয়ক অপরাধ নিয়ে গবেষণাকারী বার্সেলোনার মার্ক বালসেলস এই প্রবণতাকে ‘লুভর প্রভাব’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত জাদুঘরেও যদি চুরি সম্ভব হয়, তাহলে ছোট শহর বা গ্রামীণ এলাকার সীমিত নিরাপত্তার জাদুঘরগুলো অপরাধীদের কাছে আরও সহজ লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে।
ফ্রান্সের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ২০২৪ সালের এক জরিপে দেখা যায়, দেশটির মাত্র চার ভাগের এক ভাগ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের জরুরি পরিস্থিতি ও ঝুঁকি মোকাবিলার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রায় অর্ধেক প্রতিষ্ঠানে ভিডিও নজরদারির ব্যবস্থাও নেই। মে মাসে ফরাসি পার্লামেন্টের এক প্রতিবেদনে জাদুঘরগুলোর নিরাপত্তা ঘাটতি ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির অভাবের কথা তুলে ধরা হয়।
হাজারো প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন
ইতালিতে ৪ হাজার ৪০০টির বেশি জাদুঘর ও সমজাতীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। স্পেনে এই সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৫০০। ফ্রান্সে সরকারি স্বীকৃত ‘মিউজে দ্য ফ্রান্স’ মর্যাদাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১ হাজার ২০০-এর বেশি। এর বাইরে আরও অনেক ছোট সংগ্রহশালা রয়েছে।
এত বিস্তৃত নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বিশেষ করে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কঠিন। কারণ এসব জাদুঘরের অনেকগুলো স্থানীয় সরকারের সীমিত অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল।
ইতালির আন্তর্জাতিক জাদুঘর পরিষদের সভাপতি আন্তোনেল্লা পিন্না বলেছেন, দেশটির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিভিন্ন শহর ও অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকায় শিল্পকর্মগুলোকে তাদের নিজস্ব ঐতিহাসিক পরিবেশেই সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে। তবে অপরাধীদের জন্য চুরি কঠিন করে তুলতে হবে। তাঁর মতে, শুধু প্রযুক্তি স্থাপন করলেই হবে না, অ্যালার্ম বাজলে সেটি পরীক্ষা করার জন্য দায়িত্বশীল কাউকে উপস্থিত থাকতে হবে।
নিরাপত্তায় বাড়ছে বিনিয়োগ
লুভর চুরির পর ইতালির সানসেপলক্রো শহরের নাগরিক জাদুঘরেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। রেনেসাঁ শিল্পী পিয়েরো দেলা ফ্রানচেস্কার চারটি শিল্পকর্ম সেখানে প্রদর্শিত হয়। নিরাপত্তা পর্যালোচনার পর দেশটির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুরক্ষা ইউনিট বেশি ক্যামেরা স্থাপন, সিসিটিভি ফুটেজ দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ এবং ব্যাগ ও বড় পোশাকের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর সুপারিশ করে। জাদুঘর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা এসব ব্যবস্থা কার্যকর করেছে।
ফ্রান্সের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ও জুলাইয়ে ৩৩ দফা নিরাপত্তা পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। স্থানীয় জাদুঘরগুলোর জন্য তিন বছরে ৩ কোটি ইউরো বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
ইতালিতে ২০২৫ সালে জাদুঘর ও আর্ট গ্যালারি থেকে ১৭টি চুরির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, আগের বছর যা ছিল ১৪টি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ইউরোপোলের আগস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাদুঘর চুরির ঘটনা ক্রমেই বেশি সংঘবদ্ধ ও সহিংস হচ্ছে। মূল্যবান ধাতু, রত্ন এবং অন্যান্য দামি প্রত্নবস্তুতে অপরাধীদের আগ্রহ বাড়ছে।
নিরাপত্তা বাড়বে, কিন্তু দর্শনার্থীদের প্রবেশাধিকার?
জাদুঘরের নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার বজায় রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ। নিরাপত্তার নামে অতিরিক্ত তল্লাশি ও বিধিনিষেধ আরোপ করলে দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তবে ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পকর্ম পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ছাড়া প্রদর্শন না করার পক্ষেও মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। চুরি যাওয়া শিল্পকর্ম কালোবাজারে বিক্রি করা কঠিন হলেও অপরাধীরা সেগুলো গোপন রাখা, মুক্তিপণ দাবি কিংবা ব্যক্তিগতভাবে বিক্রির চেষ্টা করতে পারে।
পারমার জাদুঘর থেকে চুরি হওয়া তিনটি চিত্রকর্ম আগস্টে একটি অ্যাপার্টমেন্টের কার্ডবোর্ডের বাক্স থেকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মলদোভার পাঁচ নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে শিল্পকর্মগুলো জাদুঘরে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে স্থানীয় একটি পনির উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে সেখানে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তারক্ষী রাখা হয়েছে।
জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে এই চুরি শুধু তিনটি শিল্পকর্ম হারানোর ঘটনা ছিল না; এটি ছিল সবার সম্মিলিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর আঘাত।












