রাজধানীর মিরপুর যেন যুদ্ধক্ষেত্র। টানা তিন দিন ধরে পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, সাউন্ড গ্রেনেডের বিস্ফোরণ আর টিয়ার গ্যাসের ধোঁয়ায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়। রাস্তায় বের হতে ভয় পাচ্ছেন বাসিন্দারা। শিশুদের স্কুলে পাঠানো নিয়েও উদ্বেগে আছেন অভিভাবকেরা। অনেক চায়ের দোকান ও বড় দোকানপাট বন্ধ থাকায় এলাকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও ব্যাহত হচ্ছে।
পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় এই উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মিরপুর ১০, ২, ১১ ও ১৪ নম্বরসহ আশপাশের এলাকায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় বাড়ছে।
সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার গ্যাসে আতঙ্ক
মিরপুরের পুরবী এলাকার বাসিন্দা আবু হানিফ বলেন, রোববার থেকে তাঁর কাছে এলাকাটিকে যুদ্ধক্ষেত্র মনে হচ্ছে। ভোর থেকেই সাউন্ড গ্রেনেডের বিকট শব্দ শোনা যায়। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে টিয়ার গ্যাসের ঝাঁজ। দিনভর পুলিশ ও শ্রমিকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
এ পরিস্থিতিতে সন্তানদের স্কুলে পাঠাতেও ভয় পাচ্ছেন তিনি। কখন কোথায় সংঘর্ষ শুরু হয়, তা নিয়ে সব সময় উদ্বেগে থাকতে হচ্ছে।
মিরপুরের আরেক বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম জানান, মানুষ প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। পুলিশ আন্দোলনকারীদের আটক করছে, বিভিন্ন গলিতে গিয়ে লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। কাউকে কাউকে আটক করতেও দেখা গেছে।
মিরপুর-২ এলাকার বাসিন্দা কাওসারের ভাষায়, সংঘর্ষের কারণে এলাকার মানুষ কেউ শান্তিতে নেই। গৃহিণী শরিফা বেগমও জানান, তাঁদের কাছে এখন ঘরে বন্দি থাকার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বাইরে বের হতে ভয় লাগে। আগের দিন একবার বের হয়ে দ্রুত বাসায় ফিরেছেন; এরপর আর বাইরে যাওয়ার সাহস পাননি।
বন্ধ চায়ের দোকান ও বড় দোকানপাট
মিরপুরের বিভিন্ন গলির চায়ের দোকান বন্ধ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে দোকান বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। সড়কের পাশের অনেক বড় দোকানও বন্ধ দেখা গেছে।
সংঘর্ষের আশঙ্কায় মানুষ যেমন বাইরে বের হওয়া কমিয়ে দিয়েছেন, তেমনি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখতেও অনেকে নিরাপদ বোধ করছেন না। ফলে এলাকার জনজীবনে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
রোববার থেকে সংঘর্ষ, মঙ্গলবারও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া
শ্রমিকদের আন্দোলন বেশ কিছুদিন ধরে চললেও রোববার তা সহিংস রূপ নেয়। ওই দিন সংঘর্ষের মধ্যে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এরপর পুলিশ ও শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
সোমবার শ্রমিকেরা আবারও সড়কে নামার চেষ্টা করলে পুলিশের কঠোর অবস্থানের কারণে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। মঙ্গলবার সকালেও নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়। পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে। শ্রমিকেরাও পুলিশের ওপর হামলা চালান। দুপুরের পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও বাসিন্দাদের আতঙ্ক কাটেনি।
সংঘর্ষের ঘটনায় ১১ মামলা
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, সোমবার বিশৃঙ্খলার অভিযোগে প্রায় ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত দুই দিনের সংঘর্ষের ঘটনায় ১১টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ১০ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।
শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন ঘিরে সংঘর্ষের প্রভাব এখন মিরপুরের বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনেও পড়েছে। কখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন এলাকার মানুষ।












