অস্বাভাবিক ছুটির শিবির
দক্ষিণ রাশিয়ার রোস্তভ অঞ্চলে এ সপ্তাহে নদীর তীরে শিশুদের জন্য আয়োজন করা হয় এক বিশেষ শিবির। তবে এটি ছিল না সাধারণ কোনো গ্রীষ্মকালীন ছুটির ক্যাম্প। এখানে খেলাধুলা বা বিনোদনের বদলে চলছিল সামরিক ধাঁচের কঠোর অনুশীলন।
৮ থেকে ১৭ বছর বয়সী মোট ৮৩ জন শিশু অংশ নেয় এই ক্যাম্পে। প্রশিক্ষকদের নির্দেশে তারা “রুট মার্চ”-এ অংশ নেয়—যেখানে কখনো দৌড়াতে হয়েছে, কখনো হামাগুড়ি দিয়ে বালির ভেতর কিংবা পানির অগভীর স্রোতের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়েছে। শিশুদের কণ্ঠে ক্লান্তি থাকলেও তাদের মুখে ছিল এক ধরনের রোমাঞ্চ।
সামরিক সাজসজ্জা ও অনুশীলনের ধরন
অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই ছিল সামরিক পোশাকে। কারও হাতে ছিল আসল অস্ত্র, আবার অনেকের হাতে ছিল খেলনা অস্ত্র। প্রশিক্ষণের মধ্যে ছিল শারীরিক সক্ষমতা যাচাইয়ের নানা ধাপ, দৌড়ঝাঁপ, হামাগুড়ি দিয়ে অগ্রসর হওয়া, এমনকি হ্যান্ড গ্রেনেড ছোড়া ও ডামি শট চালানোর মতো কার্যক্রমও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এই পুরো কার্যক্রমের তত্ত্বাবধানে ছিলেন ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে ফেরা অভিজ্ঞ সৈন্যরা। তারা শিশুদের হাতে-কলমে শিখিয়েছেন যুদ্ধক্ষেত্রে কিভাবে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে হয়, কিভাবে অস্ত্র ব্যবহার করতে হয়, আর কিভাবে দলগতভাবে অগ্রসর হতে হয়।
শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট, মাত্র ৮ বছর বয়সী ইভান গ্লুশচেঙ্কো বলল, তার সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতা ছিল—“আমরা হ্যান্ড গ্রেনেড ছুড়েছি আর ডামি গুলি চালিয়েছি।”
শিশুদের ভবিষ্যৎ ভাবনা
এই শিবিরে অংশ নেয় মূলত কসাক সম্প্রদায়ের শিশু ক্যাডেটরা। তাদের অনেকেই ভবিষ্যতে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে চায়।
বড় ছেলে আন্তন বলল—“আমি ভবিষ্যৎকে সামরিক সেবার সঙ্গে যুক্ত করতে চাই। আমার লক্ষ্য হলো দেশকে সেবা করা এবং শেষ পর্যন্ত নিজের দায়িত্বে অবিচল থাকা।”
আরেকজন, দাভিদ, বলল যে রুট মার্চ তাকে নিজের ইচ্ছাশক্তি পরীক্ষা করার সুযোগ দিয়েছে। “আমি বুঝেছি আমার ভেতরের শক্তি কতটা। এই অভিজ্ঞতা আমাকে নিজের উপর আত্মবিশ্বাসী করেছে।”
বিতর্ক: দেশপ্রেম নাকি প্রোপাগান্ডা?
এই ধরণের উদ্যোগ নিয়ে রাশিয়ার ভেতরে-বাইরে সমালোচনা উঠেছে। স্বাধীন শিশু অধিকার সংগঠন “নে নর্মা” বলছে, অল্প বয়সী শিশুদের এমনভাবে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া আসলে এক ধরনের মানসিক নিয়ন্ত্রণ। স্কুলে অস্ত্র চালানো শেখানো কিংবা ড্রোন তৈরি শেখানো কোনো শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যায় না। তাদের মতে, এ কার্যক্রম শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত করছে এবং যুদ্ধমুখী প্রজন্ম তৈরি করছে।
তবে রাশিয়ার কর্তৃপক্ষ ভিন্ন মত দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, এ ধরনের কার্যক্রম শিশুদের মধ্যে “সুস্থ দেশপ্রেম” গড়ে তোলে, জাতীয় সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুত করে এবং তাদের মানসিক দৃঢ়তা বাড়ায়।
সেনাদের অংশগ্রহণ ও পারিবারিক দৃষ্টিভঙ্গি
এই প্রশিক্ষণ পরিচালনায় ছিলেন আলেকজান্ডার শোপিন নামের এক রুশ সেনা, যিনি ইউক্রেনে যুদ্ধে আহত হয়েছেন এবং অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় আছেন। তার মধ্যম কন্যা এই ক্যাম্পে অংশ নিয়েছিল।
শোপিন বলেন, “এটা আমার প্রথম নয়। আমি বাচ্চাদের কাছে আমার অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে চাই। এখানে তারা দল হিসেবে কাজ করতে শেখে, যেন একটি পরিবারের মতো হয়ে ওঠে।”
তিনি আরও জানান, তার মেয়ের জন্য প্রশিক্ষণটা কঠিন ছিল, তবে সে দলগতভাবে দৌড়ানো আর বন্ধুবান্ধবকে হতাশ না করার বিষয়টি উপভোগ করেছে। তার ভাষায়, “একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার যে চ্যালেঞ্জ, সেটাই ওকে সবচেয়ে বেশি টেনেছে।”
প্রশিক্ষণের পর শিশুদের প্রতিক্রিয়া
অনুশীলন শেষে শিশুদের মধ্যে প্রবল উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা যায়। কেউ কেউ হেসে বলছিল, “আমি তো প্রায় মরে যাচ্ছিলাম!” আবার কেউ গর্ব করে বলছিল, “আমরা দৌড়টা তিনবার করেছি!”
তাদের শরীর ধুলো আর ক্লান্তিতে ভরা, কিন্তু চোখেমুখে ছিল রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার ঝিলিক। এ যেন ছিল তাদের কাছে খেলাধুলার নতুন রূপ—যেখানে কষ্টের ভেতরেও তারা আনন্দ খুঁজে পাচ্ছে।
দেশপ্রেম শিক্ষা নাকি শৈশবের ক্ষয়?
প্রশিক্ষক ভ্লাদিমির ইয়ানেঙ্কো মনে করেন, এ ধরনের ক্যাম্প শিশুদের শুধু শারীরিক দক্ষতাই নয়, বরং বোঝাপড়া ও শৃঙ্খলাও শেখায়। তার মতে, “দেশপ্রেমিক শিক্ষা খুবই জরুরি। এতে তারা অকারণে রাস্তায় ঘোরাঘুরি করে সময় নষ্ট করে না, বরং নতুন কিছু শিখে আনন্দ পায়।”
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন—শৈশবের স্বাভাবিক খেলাধুলা, কল্পনা আর সৃজনশীলতাকে চাপা দিয়ে যদি শিশুদের এত তাড়াতাড়ি সামরিক আবহে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, তবে তারা কি ভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠতে পারবে? নাকি যুদ্ধমুখী মানসিকতা তাদের মানবিকতা গ্রাস করবে?
আন্তর্জাতিক
“আমরা হ্যান্ড গ্রেনেড ছুড়েছি!” – রাশিয়ায় ৮ বছর বয়স থেকেই শিশুদের সামরিক প্রশিক্ষণ
অস্বাভাবিক ছুটির শিবিরদক্ষিণ রাশিয়ার রোস্তভ অঞ্চলে এ সপ্তাহে নদীর তীরে শিশুদের জন্য আয়োজন করা হয় এক বিশেষ শিবির। তবে এটি ছিল না সাধারণ কোনো গ্রীষ্মকালীন ছুটির ক্যাম্প। এখানে খেলাধুলা বা বিনোদনের বদলে চলছিল সামরিক ধাঁচের
Facebook
WhatsApp
X
আরও পড়ুন
সর্বশেষ খবর
আবুধাবিতে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজের দলে প্রথমবার ডাক পেলেন আলিস আল ইসলাম
পোশাক রপ্তানিতে প্রথম তিন মাসে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি, আয় ১,০৫৮ কোটি ডলার
ছাদের সৌরবিদ্যুতে এক মাসে যোগ ৬০ মেগাওয়াট, লক্ষ্য নিয়ে সংসদীয় কমিটির প্রশ্ন
রিয়াদ বিমানবন্দর বন্ধ: ঢাকা থেকে ৮ ফ্লাইট বাতিল, বিপাকে ২,৯৫১ যাত্রী
মিয়ানমারে জান্তার ফাঁদ: যুক্তরাষ্ট্র কি বিরল খনিজের স্বার্থে গণতন্ত্রের প্রশ্নে আপস করবে?
বহুমেরুর বিশ্বে পররাষ্ট্রনীতির নতুন সমীকরণ: কৌশলগত স্বাধীনতা রক্ষার লড়াইসর্বাধিক পঠিত
আরও পড়ুন
সর্বশেষ
দৈনিক নিউজলেটার
প্রতিদিন সকালে সেরা ৫টি খবর আপনার ইনবক্সে
বিনামূল্যে সাবস্ক্রাইব করুন · যেকোনো সময় বাতিল করুন
প্রকাশনা
সম্পাদক ও প্রকাশক: স্বদেশ রায়
নিবন্ধন নম্বর: ১৭১
সম্পাদকীয় কার্যালয়
প্রথম তলা, ক্যাপিটা লেক ফ্রন্ট, ব্লক জে, বাড়ি ৬৬,
বনানী রোড ১৮ এক্সটেনশন, ঢাকা ১২১৩
ইমেইল: contact@sarakhon.com / news@sarakhon.com
ফোন: +৮৮০৯৬৩৮১৫৫২২৭
বাণিজ্যিক অফিস
এ-১৩, ১০/এ সেগুনবাগিচা, ঢাকা ১০০০
বিজ্ঞাপন ও প্রশাসনিক যোগাযোগ
admin@sarakhon.com
ফোন: +৮৮০৯৬৩৮১৫৫২২৭
আরও বিভাগ
সম্পাদকীয়
সেবাসমূহ
© ২০২৬ সারাক্ষণ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।






