নাইজেরিয়ায় মায়েদের দীর্ঘ অপেক্ষা
গত নভেম্বরে নাইজেরিয়ার মাইদুগুরিতে নারী ও শিশুদের ভিড় জমেছিল পুষ্টি কেন্দ্রে। তারা ভোর থেকে লাইন ধরেছিল হাতে ক্ষুধার্ত ও হাড্ডিসার সন্তান নিয়ে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর মিলছিল ছোট্ট লাল রঙের এক প্যাকেট—যেখানে ছিল বিশেষ পুষ্টিকর পেস্ট। এই খাবারই শিশুদের মৃত্যুসীমা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারত।
শিশুরা অস্বাভাবিকভাবে নিশ্চল—দৌড়ায় না, হাসে না, এমনকি মুখে ভনভন করা মাছিকেও তাড়াতে পারছিল না। দুই বছরের ফাতিমা, যার ওজন ছিল মাত্র ৭ কেজি, মায়ের কোলেই দুর্বল হয়ে ঝুলে ছিল।
মার্কিন সহায়তা বন্ধ, জীবনরক্ষাকারী খাদ্য ঘাটতি
এই শিশুদের জন্য ‘রেডি-টু-ইউজ থেরাপিউটিক ফুড’ (RUTF) ছিল ভরসা। প্রতি প্যাকেটের দাম ৩০ সেন্টেরও কম, যাতে থাকে চিনাবাদাম, দুধগুঁড়া, চিনি, তেল ও ভিটামিন–খনিজ। ছয় সপ্তাহের চিকিৎসার খরচ হয় ৪৫ ডলারেরও কম।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (USAID) বিলুপ্ত করার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। আগে এই সংস্থা বিশ্বের প্রায় অর্ধেক থেরাপিউটিক খাদ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করত। এখন ছয় মাস কেটে গেছে মার্কিন সহায়তা বন্ধ হওয়ার পর, ফলে বহু ক্লিনিক বন্ধ হয়ে গেছে, বাকিগুলোতে মজুদ প্রায় শেষ।
সীমিত অর্থায়ন, বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি
২০২৪ সালে ইউএসএইড ২০০ মিলিয়ন ডলারের মতো ব্যয় করেছিল এ খাতে। কিন্তু ২০২৫ সালের জন্য এখনো তহবিল ছাড়া হয়নি। গত মাসে ইউনিসেফকে নতুন করে ৯৩ মিলিয়ন ডলার দেওয়া হলেও তা আগের অঙ্কের অর্ধেক।
সরকার দাবি করছে, পুষ্টি কর্মসূচি এখনো অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তবে তারা বলছে, “জাতীয় সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে।”
অন্যদিকে সহায়তা সংস্থাগুলোর মতে, তহবিল বিলম্বের কারণে ইতিমধ্যেই হাজার হাজার শিশু মৃত্যুর ঝুঁকিতে আছে। নাইজেরিয়ায় জুলাই শেষে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির ১৫০টি ক্লিনিক বন্ধ হয়েছে। কেবল একটি প্রদেশে হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল ১৭টির মধ্যে ১৬টি কেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে।
বিশ্বজুড়ে চিকিৎসাকেন্দ্র বন্ধ
শুধু আফ্রিকাই নয়—চাদ, মালি, নাইজার, সিরিয়া, বুরকিনা ফাসো, কেনিয়া, দক্ষিণ সুদান, আফগানিস্তান, নেপালসহ এক ডজনের বেশি দেশে খাদ্য ঘাটতি বা চিকিৎসা বন্ধ হয়ে গেছে।
আফগানিস্তানে ৯ লাখ শিশুর চিকিৎসার প্রয়োজন থাকলেও গুদামে কিছুই নেই। নেপালে অর্ধেক প্রদেশে সরবরাহ নেই, শিগগিরই সারা দেশে সংকট দেখা দেবে—২ লাখ শিশু ঝুঁকিতে।
মানবিক সংকট আরও গভীর হচ্ছে
এইড গ্রুপগুলোর হিসাব অনুযায়ী, যদি এ অবস্থা চলতে থাকে তবে প্রতিবছর ১.৬ লাখ শিশুর মৃত্যু হতে পারে। বিশ্বজুড়ে বর্তমানে ৪ কোটি ৩০ লাখ শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে।
অপুষ্টির প্রথম ১,০০০ দিন মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় চিকিৎসা না হলে শিশুর মস্তিষ্কে স্থায়ী ক্ষতি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার দুর্বলতা এবং মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণ বাড়ে।
সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ার প্রভাব
আগে আমেরিকান কৃষকরা চিনাবাদাম, দুধগুঁড়া, সয়াবিন সরবরাহ করত। উৎপাদিত পণ্য জাহাজে করে আফ্রিকা পাঠানো হতো। এখন তহবিল বন্ধ ও ইউএসএইড ভেঙে দেওয়ায় পুরো প্রক্রিয়া অচল।
জাতিসংঘ বলছে, নতুন তহবিল দিয়েও অন্তত দুই-তিন মাস সময় লাগবে খাদ্য পৌঁছাতে। দক্ষিণ সুদানের মতো দেশে রাস্তার দুরবস্থার কারণে তিন মাস পর্যন্ত দেরি হয়। আফগানিস্তানে পৌঁছাতে সময় লাগতে পারে আট-নয় মাস—যা অনেক শিশুর জন্য অনেক দেরি।
সংকট মোকাবিলায় বেসরকারি প্রচেষ্টা
কিছু প্রতিষ্ঠান নিজেদের অর্থে কার্যক্রম চালাচ্ছে। মানা কোম্পানি এক ব্রিটিশ দাতার কাছ থেকে ২০ মিলিয়ন ডলার পেয়েছে, যা দিয়ে ইউনিসেফকে পাঁচ লাখ প্যাকেট দিয়েছে। এডেসিয়া ২০ লাখ ডলার সংগ্রহ করে কিছু সরবরাহ নিজ উদ্যোগে পাঠাচ্ছে।
তবুও তারা সতর্ক করেছে—অর্থ না এলে কৃষকদের কাছ থেকে কাঁচামাল কেনার সামর্থ্য থাকবে না। ইতিমধ্যেই কয়েকটি ছোট সংস্থা ভেঙে পড়েছে।
উপসংহার
বিশ্বজুড়ে অপুষ্ট শিশুদের জন্য সহজলভ্য চিকিৎসা থাকলেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে তা তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। নাইজেরিয়ার ফাতিমার মতো অসংখ্য শিশুর জীবন এখন তহবিল সিদ্ধান্তের ওপর ঝুলছে। সংকট যদি দ্রুত না সামাল দেওয়া হয়, তবে আগামী মাসগুলোতে হাজার হাজার শিশু অকালেই প্রাণ হারাবে।
আন্তর্জাতিক
যুক্তরাষ্ট্রের তহবিল কাটা: অপুষ্ট শিশুদের জন্য বৈশ্বিক সংকট
নাইজেরিয়ায় মায়েদের দীর্ঘ অপেক্ষাগত নভেম্বরে নাইজেরিয়ার মাইদুগুরিতে নারী ও শিশুদের ভিড় জমেছিল পুষ্টি কেন্দ্রে। তারা ভোর থেকে লাইন ধরেছিল হাতে ক্ষুধার্ত ও হাড্ডিসার সন্তান নিয়ে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর মিলছিল ছোট্ট লাল রঙের এক
Facebook
WhatsApp
X
আরও পড়ুন
সর্বশেষ খবর
তথ্য আছে, সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ব্যবস্থা নেই: জলবায়ু দুর্যোগে পাকিস্তানের মূল দুর্বলতা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ধাক্কায় ভারতের কর্মসংস্থান: সংকট থেকে কি নতুন সুযোগ তৈরি হবে?
ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধেও মেক্সিকোকে ঠেকানো কঠিন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির সঙ্গে গভীর বন্ধনই শক্তি
তেলের নতুন সংকট: সরবরাহ নয়, এখন বড় বাধা পরিবহন
রাজনৈতিক বিভাজন থেকে গুলির লড়াই, কুকুরের পার্কে দুই মার্কিন নাগরিকের জীবন বদলে গেল
ভেনেজুয়ার তেলবাজারে সাবেক ট্রাম্প কর্মকর্তাদের ভিড়, উঠছে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্নসর্বাধিক পঠিত
আরও পড়ুন
সর্বশেষ
৫ মিনিটে পড়া
মতামত
তেলের নতুন সংকট: সরবরাহ নয়, এখন বড় বাধা পরিবহন
৪ মিনিটে পড়া
অর্থনীতি
পাকিস্তানকে ১.২ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিতে আইএমএফের সম্মতি
দৈনিক নিউজলেটার
প্রতিদিন সকালে সেরা ৫টি খবর আপনার ইনবক্সে
বিনামূল্যে সাবস্ক্রাইব করুন · যেকোনো সময় বাতিল করুন
প্রকাশনা
সম্পাদক ও প্রকাশক: স্বদেশ রায়
নিবন্ধন নম্বর: ১৭১
সম্পাদকীয় কার্যালয়
প্রথম তলা, ক্যাপিটা লেক ফ্রন্ট, ব্লক জে, বাড়ি ৬৬,
বনানী রোড ১৮ এক্সটেনশন, ঢাকা ১২১৩
ইমেইল: contact@sarakhon.com / news@sarakhon.com
ফোন: +৮৮০৯৬৩৮১৫৫২২৭
বাণিজ্যিক অফিস
এ-১৩, ১০/এ সেগুনবাগিচা, ঢাকা ১০০০
বিজ্ঞাপন ও প্রশাসনিক যোগাযোগ
admin@sarakhon.com
ফোন: +৮৮০৯৬৩৮১৫৫২২৭
আরও বিভাগ
সম্পাদকীয়
সেবাসমূহ
© ২০২৬ সারাক্ষণ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।






