শুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪, ০৬:৩৮ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
ঈদে ‘তিথিডোর’ নিয়ে আসছে মেহজাবীন চৌধুরী কলেজ ছাত্র মুরাদ হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা ফের আইটেম গানে প্রিয়া অনন্যা স্মার্ট কর্মক্ষেত্র বুদ্ধিনির্ভর কাজের ক্ষমতা বাড়ায় নিরাপত্তা বিশ্লেষক আবদুর রশীদের মৃত্যুতে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির শোক প্রকাশ চে গেভারা যেভাবে কিউবার সশস্ত্র বিপ্লবের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন ট্রাম্প পুনঃনির্বাচিত হলে ইউয়ানের উপর চাপ ও বৈদেশিক মুদ্রার অস্থিরতা বাড়তে পারে মিরনজিল্লার হরিজন সম্প্রদায়কে পূনর্বাসন না করে উচ্ছেদ করা যাবে না নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়ের তিনটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’ নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশীদ মারা গেছেন

ইতালির রূপকথা (বিকটাঙ্গ)

  • Update Time : সোমবার, ২০ মে, ২০২৪, ৮.৩৪ পিএম

মাক্সিম গোর্কি

দিনটা গরম। সবকিছু চুপচাপ। পৃথিবীতে নেমেছে নীরব শাস্তি। আকাশের স্বচ্ছ ফিকে নীল চোখ সন্দেহে তাকিয়ে আছে পৃথিবীর দিকে। যে চোখের অগ্নিময় মণি-টা যেন সূর্য।

মসৃণ নীল ধাতুর একখানা পাতের মতো সমুদ্র। নানা রঙের মাছ-ধরা নৌকো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে, আকাশের মতোই তারা উজ্জ্বল। উপসাগরের অর্ধচক্রবালে যেন রাঙ-ঝালাই করে তাদের এঁটে রাখা হয়েছে। আলস্যে ডানা নেড়ে উড়ে যায় একটা গাংচিল, আর জলের ওপর ছায়া জাগে তার আকাশের পাখিটার চেয়েও তা আরো শাদা, আরো সুন্দর।

সুদুরের ঝিলমিলির মধ্যে লালচে একটু দ্বীপ যেন শান্তভাবে ভেসে আছে জলের ওপর, নাকি বুঝি গলে যাচ্ছে সূর্যের জ্বলন্ত রোদ্দুরে – সমুদ্রের মধ্য থেকে মাথা উঁচু করা ঐ নিঃসঙ্গ শিলাস্তূপকে মনে হয় যেন ন্যে উপসাগরের চক্রে এক উজ্জ্বল মুকুটমণি।

বন্ধুর থাক কেটে কেটে সমুদ্রে নেমে গেছে পাথুরে উপকূল।

কালো কালো আঙুরলতা, কমলা গাছ, লেবু আর জুনুব গাছ আর ফিকে রূপালী অলিত পাতায় তা আচ্ছন্ন। ঘন পল্লবের মধ্যে লাল সোনালী আর শাদা শাদা ফুলগুলো কোমলভাবে হেসে খাঁড়া ঝরে পড়ে সমুদ্রের বুকে। হলদে আর কমলা রঙের ফলগুলো দেখে মনে পড়ে যায় কোনো এক উষ্ণ কৃষ্ণপক্ষ রাতের তারার কথা, আকাশটা যখন অন্ধকার, বাতাস জলভেজা।

আকাশ, সাগর আর মন সব স্তব্ধ। এই স্তব্ধতার মধ্যে জীবন যে নীরব স্তোত্রের অর্ঘ্য প্রেরণ করছে সূর্যদেবের কাছে, ইচ্ছে হয় তা শুনি।

কালো পোষাকের একটি দীর্ঘাঙ্গী নারী হেঁটে চলে বাগিচার ভেতরকার আঁকাবাঁকা পথ ধরে, পাথর থেকে পাথরে আলগোছে লাফিয়ে লাফিয়ে। রোদ্দুরে তার পোষাক বিবর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে নোংরা বাদামীতে। দূর থেকেও তার জীর্ণ পোষাকের ওপর তালিগুলো চোখে পড়ে। মাথা তার খোলা, পাকা চুলগুলো ঝকমক করে রূপোর মতো, ছোটো ছোটো গুচ্ছে চূর্ণ কুন্তল উড়ে পড়ে তার দীর্ঘ কপালে রগের পাশে, গাঢ় রঙের গালের ওপর – সে চুল এমন যে আঁচড়িয়ে তাকে গুছিয়ে রাখা মুশকিল।

চোখা মুখ চোখ মেয়েটির, কাঠিন্যে ভরা। এ মুখ একবার দেখলে আর ভোলা যায় না। ঐ বিশুদ্ধ মুখখানায় গম্ভীর এবং প্রাচীন কি যেন একটা আছে; মেয়েটির কালো চোখের দিকে সোজাসুজি তাকালে মনে পড়বেই পূর্বাঞ্চলের জলন্ত মরুভূমিগুলোর কথা, দেবোরা আর জুডিথের কথা।

হাঁটতে হাঁটতে মাথা নিচু করে লাল রঙের কিছু একটা বুনে চলে মেয়েটা। বোনার লোহার কাঁটাটা চকচক করে ওঠে। উলের বল কাপড়ের তলে কোথায় ঢাকা, মনে হয় যেন লাল রঙের উলের সুতোটা বুঝি বেরিয়ে আসছে সোজা যেয়েটির হৃৎপিণ্ড থেকে। পথচা খাড়াই, আঁকাবাঁকা। গড়িয়ে পড়া পাথর নুড়ির শব্দ শোনা যায় মাঝে মাঝে। কিন্তু শ্বেতকেশ। মেয়েটির পদক্ষেপ এমন নিশ্চিন্ত যে ননে হয় পা দিয়েই যে পথ দেখতে পায় বুঝি।

মেয়েটি সম্পর্কে লোকে যা বলে তা এই: মেয়েটি বিধবা, স্বামী ছিল একজন জেলে, বিয়ের কিছু পরেই লোকটা মাছ ধরতে গিয়ে আর ফেরেনি। পেটে একটি ছেলে নিয়ে মেয়েটি একা পড়ল।

ছেলে হবার পর ছেলেটাকে ও লুকিয়ে রাখতে লাগল লোকের কাছ থেকে। সব মায়েই তার বাচ্চাকে রাস্তায় আর রোদ্দুরে নিয়ে গিয়ে লোককে দেখাতে চায়, কিন্তু এ সে সব কিছুই করল না। ন্যাতাকানি জড়িয়ে ছেলেটাকে সে রেখে দিলে তার কুঁড়ের এক অন্ধকার কোণের মধ্যে। দীর্ঘদিন ধরে লোকে শুধু একটা নস্ত বড়ো মাথা আর হলদে মুখের ওপর স্থির বড়ো বড়ো একজোড়া চোখ ছাড়া শিশুটির আর কিছুই দেখেনি। এই করিৎকর্মা মেয়েটি এতদিন দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে অবিরাম লড়াই করে আসছিল বেশ স্ফতির সঙ্গে, সে লড়াই থেকে অন্যেরাও শক্তি ও উৎসাহ বোধ করত। কিন্তু এর পর থেকে সে কেমন চুপচাপ বিষণ্ণ হয়ে উঠতে লাগল, সংসারের দিকে তাকাত কেমন একটা দুঃখের কুয়াশা থেকে, চোখে তার একটা বিচিত্র সপ্রশ্ন দৃষ্টি।

কিছু দিনের মধ্যেই অবশ্য লোকে তার দুঃখের কারণটা জানতে পারল: ছেলেটি তার বিকলাঙ্গ; সেই জন্যেই সে ছেলেটিকে লুকিয়ে রাখত এবং এইটেই তার বিষাদের কারণ।

লোকে যখন ব্যাপারটা জানল, তখন তারা মেয়েটিকে বোঝালে, বিকলাঙ্গ ছেলের জন্ম দেওয়া মায়ের পক্ষে যে লজ্জার বিষয় তা তারা বোঝে, কোন পাপের জন্যে এ দুর্ভাগ্য, তা মাঙোনাই জানেন, কিন্তু সে যাই হোক না কেন, ছেলেটার তো কোনো দোষ নেই, তাকে হোদুর থেকে সরিয়ে রাখা অন্যায়।

মেয়েটি শুনলে ওদের কথা। তার ছেলেটিকে দেখালে। যা দেখা গেল, সেটি একটি বিকলাঙ্গ জীববিশেষ, হাত পাগুলো এত ছোটো যেন মাছের পাখনা, রোগা নির্জীব ঘাড়ের ওপর একটা প্রকাও ফুলে। জুইলা মাখা, বুড়ো মানুষের মতো লোন মুখ, ঝাপসা চোখ আর নস্ত হাঁ-মুখখানা মরণের হাসির মতো প্রসারিত।

দেখে কাঁদতে লাগল মেয়েরা, পুরুষেরা বিতৃষ্ণায় তাকিয়ে দেখে নীরবে চলে গেন। আর নাটির ওপর বসে বিকলাঙ্গের মা একবার করে মুখ ঢাকলে আর একবার করে মাথা তুলে পাড়া-পড়শীদের দিকে তাকিয়ে থাকল এক দুর্বোধ্য নির্বাক প্রশ্ন নিয়ে।

পাড়ার লোকেরা কফিনের মতো একখানা বাক্স করে তাতে পশম আঁর কম্বলের আঁশ দিয়ে একটা উষ্ণ কোমল বাসা বানিয়ে ওকে রাখলে তার মধ্যে। বাক্সটাকে রেখে দেওয়া হল উঠোনের একটা ছায়ায়। গোপন আশা রইল, অঘটনঘটন-পটীয়সী সূর্য থেকে হয়ত অলৌকিক কিছু একটা ঘটবে।

কিন্তু দিন গেল, সেই প্রকাণ্ড মাথা, দীর্ঘ দেহ আর অসহায় চারটে হাঁত পার কোনো বদল হল না। ছেলেটার হাসিটা শুধু বদলে গিয়ে একটা অতৃপ্ত লোভের স্পষ্ট চেহারা নিলে আর মুখখানা ভরে উঠল বাঁকা বাঁকা ধারালো দুই সারি দাঁতে। নুলো হাতগুলো শিখে গেল কি করে রুটির টুকরো আঁকড়ে ধরে প্রায় নির্ভুলভাবে ওর সেই মন্ত গরম মুখখানার মধ্যে পুরতে হয়।

ছেলেটার মুখে কথা ছিল না। কিন্তু যেই খাবারের গন্ধ ভেসে আসত, অমনি প্যানপেনে কান্না জুড়ত ছেলেটা, মস্ত মুখটা বার করত, প্রকাও মাথাখানা নাড়তে শুরু করত, আার রক্ত-নাড়ির লালু জাগে আচ্ছন্ন হয়ে উঠত চোখের খোলা খোলা শাদা অংশটা। বেদম খেত ছেলেটা, খাবার ক্ষমতা তার বেড়ে চলল দিনের পর দিন, প্যানপেনে চিৎকারেরও বিরাম ছিল না। না দিনরাত খাটত, কিন্তু রোজগার হত সামান্য কখন সখন একেবারেই না। এর জন্যে সে কোনো নালিশ করে বেড়াত না। পড়শীরা যা সাহায্য দিত তা নিত অনিচ্ছার সঙ্গে, মুখ খুঁজে। কিন্তু যখন সে বাড়ি থাকত না তখন ছেলেটার প্যানপেনে কান্নায় বিরক্ত হয়ে পাড়া-পড়শীরা উঠোনে এসে রুটির ছাঁট, শশ্রী, ফল- যা কিছু খাওয়া সম্ভব সব ঠেসে দিয়ে আসত ওই অপরিতৃপ্ত মুখখানার মধ্যে।

‘শীগগিরই ও তোমাকেও খেয়ে শেষ করবে।’ ওরা বললে, ‘ওকে কোনো হাসপাতাল কি আতুর-আশ্রমে পাঠিয়ে দাও না কেন?’

গম্ভীর ‘মুখে মেয়েটি জবাব দিত, ‘আমি ওকে জন্য দিয়েছি, ওকে খাওয়াতেও যে হবে আমাকেই।’

দেখতে ভালো ছিল মেয়েটি, একাধিক পুরুষ ওর প্রণয়ের প্রত্যাশী ছিল। কিন্তু কোনো ফল হয়নি। ওদের মধ্যে যেটিকে সে অন্যদের চেয়ে বেশি সুনজরে দেখত, তাকে সে বলেছিল:

‘তোমার স্ত্রী হওয়া আমার চলবে না। ভয় হয়, পাছে আর একটা বিকলাঙ্গ জীবের জন্ম দিই যদি। তোমার লজ্জার কারণ হতে আমি চাই না। না, চলে যাও।’ লোকটা ওকে বোঝাবার চেষ্টা করেছিল। বলেছিল, সব মাকেই মাডোনা কূপা করেন, নিজের বোনের মতো দেখেন তাদের। কিন্তু বিকলাঙ্গের মা জবাব দিলে:

‘কি পাপ করেছি আমি জানি না, কিন্তু দেখেছো তো কি নিষ্ঠুর শাস্তি!’

লোকটা মিনতি করলে, কাঁদলে, ক্ষেপে উঠল, কিন্তু মেয়েটার ওই এক কথা:

না, আমার যা বিশ্বাস হয়েছে তার বিরুদ্ধে যাওয়া চলবে না। তুমি চলে যাও!’ কোন একটা দূর দেশে চলে গিয়েছিল লোকটা, আর ফেরেনি।

এবং এই ভাবে ঐ অতল পেটখানা, সর্বদা চিবিয়ে চলা ঐ হাঁখানার জন্যে মেয়েটি খাদ্য জাগিয়ে চলল বহুদিন। তার মেহনতের ফল সব নিঃশেষে খেয়ে চলল জীবটা শুষে চলল তার রক্ত, তার জীবন। মাথাখানা তার ক্রমেই বড়ো হতে লাগল, ক্রমেই আরো বিকটাকার। মনে হত যেন একটা প্রকাণ্ড গোলক, দূবলা নড়বড়ে ঘাড় থেকে যেন যে কোনো মুহূর্তে খসে গিয়ে পথের বাড়িগুলোর কোণা-কানাচে ধাক্কা বেয়ে উড়ে বেড়াবে, আর আলস্যে দুলতে থাকবে এদিক ওদিক।

বাইরের লোক কেউ যদি দৈবাৎ উঠোনের দিকে তাকাত, তাহলে দেখে আতঙ্কে থমকে যেত, বুঝে উঠতে পারত না কি দেখছে। আঙুরলতার ঢাকা দেয়ালের পাশে, যজ্ঞ-বেদীর মতো উঁচু করা একটা পাথরনুড়ির স্তূপের ওপর বসানো থাকত সেই বাক্সটা; তা থেকে বেরিয়ে থাকত শুধু বিকটাকার মাথাখানা। সবুজ আঙুরলতার পটভূমির ওপর হলুদরঙা, লোলচর্ম, চোয়াড়ে মুখখানার ওপর আটকে যেত দর্শকের দৃষ্ট। আর সেই ঠেলে বেরিয়ে আসা শূন্য চোখগুলো চমকাত, তির তির করত চওড়া ভোঁতা নাক, অস্বাভাবিক বড়ো বড়ো দুই গণ্ড আর চোয়াল উঠানামা করত, নিষ্ঠুর দুই সারি দাঁত বার করা অধর কাঁপতে থাকত, জানোয়ারের মতো সজাগ দুই প্রকাণ্ড কান মনে হত যেন পৃথক একটা জীবন পেয়ে খাড়া হয়ে উঠেছে, আর এই গোটা বিকটাকার অবয়বের ওপর নেমে আসত নিগ্রোর মতো অতি কুঞ্চিত কালো চুলের টোপর।

টিকটিকির থাবার মতো ছোটো ছোটো ক্ষুদে ক্ষুদে হাতে একটুকরো খাবার ধরে ছেলেটা দাঁত বসাত তাতে, মাথাটা উঁচু নিচু করত কাঠ-ঠোকরা পাখির মতো, জোরে জোরে ঘোঁৎ ঘোঁৎ করা একটা আওয়াজ বেরুত তার মুখ দিয়ে। খাবার খাওয়া হলে ছেলেটা আশেপাশের লোকেদের দিকে তাকিয়ে দাঁত বার করত, তারপর চোখ দুটো ঠেলে তুলত শিবনেত্রের মতো, মৃত্যু যন্ত্রণায় বিকৃত একখানা মুখের সঙ্গে যে চোখ দুটো মিশে যেত একটা ঘোলাটে পৌঁচের মতো। খিদে পেলে লম্বা করে দিত ঘাড়খানা, লাল মুখখানা বার করত, আর সাপের মতো লকূলকে লম্বা জিতখানা বাঁকিয়ে বাঁকিয়ে প্যান প্যান শুরু করত খাবার জন্যে।

এ দৃশ্য দেখে ক্রশ করে প্রার্থনা শুরু করে দিত দর্শকেরা, মুখ ফিরিয়ে নিত, আর হঠাৎ তাদের মনে পড়ে যেত যতো অভিশাপ তারা দেখেছে, যতো দুর্ভাগ্য জীবনে সয়েছে, তার কথা।

রুক্ষ স্বভাবের বুড়ো কামারটা বহুবার মন্তব্য করেছে:

‘ঐ সর্বভুক হাঁখানাকে যতো দেখি, ততোই মনে হয় অমনি একটা কিছুই যেন আমারও শক্তি সামর্থ্য ও শুষে খেয়ে নিচ্ছে; আমার ধারণা, আমাদের সবারই জীবন হল শুধু পরভুকদের খাওয়াবার জন্যে, ওই করেই আমাদের জীবন শেষ।’

নির্বাক ওই মুওখানা দেখে সকলের মনেই বিষাদের চিন্তাভাবনা জেগে উঠত, আতঙ্কে মন পেছিয়ে আসতে চাইত ওর কাছ থেকে। বিকলাঙ্গটা সম্পর্কে যে যা বলত, মা তা সব শুনে যেত নীরবে। দ্রুত ওর চুল পেকে যেতে লাগল, মুখ ভরে উঠল বলি রেখায়; হাসতে ভুলে গিয়েছিল সে অনেক আগেই। লোকে জানত, রাত্রে মেয়েটা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকত নিশ্চল হয়ে, আকাশের দিকে তাকিয়ে, যেন কার প্রতীক্ষা করছে।

ওরা বলাবলি করত, ‘অমন করে দাঁড়িয়ে থাকে কার জন্যে?’ ‘ছেলেটাকে গিয়ে রেখে আয় ওই গির্জার পাশের আঙিনায়।’

দোকে পরামর্শ দিলে, ‘ওখান দিয়ে বিদেশী লোকেরা রোজ সব লোকে পরানকরে। ওকে দেখে দু’এক পরয়া করে ছুঁড়ে দেবে দেখিস। কিন্তু যে কথা শুনে কেঁপে উঠল মা।

বললে, ‘অন্য দেশের লোক ওকে দেখবে, সে ভারি ভয়ানক। কি তারা ভাববে আমাদের?’

ওয়া বললে, ‘গরিব সব দেশেই আছে। সে তো সকলেই জানে।’ তবু মাথা নাড়ল মা।

কিন্তু একঘেঁয়েমির চাপে বিদেশীরা ছুঁড়ে বেড়াত সবখানে, উঁকি দিয়ে বেড়াত সবারই উঠোনে। এবং স্বভাবতই তারা এই মেয়েটির উঠোনেও এসেছিল একদিন। মেয়েটি বাড়িতেই ছিল, এই সব অলস লোকগুলোর ভোজনতৃপ্ত মুখের ওপর বিতৃষ্ণার রেখা ফুটে উঠতে দেখলে সে। শুনলে, চোখ কুঁচকে, মুখ বেঁকিয়ে ওরা তার ছেলের সম্পর্কে কি বলছে। খোলাখুলি ঘেন্না আর বিতৃষ্ণার সুরে উচ্চারিত কয়েকটা শব্দ ওর কানে গিয়ে ওকে ব্যথিত করে তুলেছিল।

বিদেশী শব্দগুলোকে সে বার বার আউড়ে মুখস্থ করে নিয়েছিল। কেননা ওর মনের কাছে, ইতালিয়ান একজন নারী ও মায়ের মনের কাছে ধরা পড়তে বাকি থাকেনি যে কথাগুলো অপমানকর। পরিচিত একজন কমিশনারের কাছে গিয়ে সে জিগ্যেস করলে, শব্দগুলোর মানে কি।

ভুরু কুঁচকে সে বললে, ‘কে বলছে তার ওপর নির্ভর করে। এর মানে: “অন্যান্য রোমান জাতগুলোর চেয়েও ইতালী তাড়াতাড়ি মরতে শুরু করেছে।” এ মিথ্যে কথাটা কোথায় শুনলে?’

উত্তর না দিয়ে সে চলে এসেছিল।

পরের দিন তার ছেলে অপর্যাপ্ত খেয়ে খিঁচনি উঠে মারা গেল। ছেলের প্রাণহীন মাথাটার ওপর একটা হাত রেখে ও বসে রইল আঙিনায় বাক্সটার পাশে, কিসের যেন অপেক্ষা করতে লাগল শান্তভাবে, আর মড়া দেখবার জন্যে যারা এল তাদের দিকে তাকাতে লাগল সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে।

কেউ কথা বললে না, কেউ কোনো প্রশ্ন জিগ্যেস করলে না ওকে। অথচ অনেকেই হয়ত তাকে তার দাসত্বের হাত থেকে মুক্তির জন্যে অভিনন্দন জানাতে চাইছিল, কথা বলতে চাইত কিছু সান্তনার, কেননা হাজার হোক, ছেলে মারা গেছে মেয়েটির। কিন্তু কেউ কিছু বললে না। কখনো কখনো লোকে বোঝে, এমন কথা আছে যা অনুক্ত রাখাই ভালো।

এর পর অনেক দিন ধরে মেয়েটা তার পাড়া-প্রতিবেশীদের দিকে তাকাত সেই অকখিত প্রশ্নের দৃষ্টি নিয়ে, তারপর কাল ক্রমে সেও সহজ হয়ে এল সকলের মতোই।

 

ইতালির রূপকথা (মা)

ইতালির রূপকথা (মা)

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

kjhdf73kjhykjhuhf
© All rights reserved © 2024