সোমবার, ২৪ জুন ২০২৪, ১১:৩১ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
নীলের বিশ্বায়ন – নীল ও ঔপনিবেশিক বাংলায় গোয়েন্দাগিরি (পর্ব-২১) ফেরদৌসের আয়োজনে ‘উচ্ছ্বাসে উৎসবে’ মুগ্ধতা ছড়ালেন তারা ওকে গাইতে দাও (পর্ব-২) বিদেশে শিক্ষা বাণিজ্যে পা রাখার চেষ্টা করছে চায়না সুচিকিৎসা পাচ্ছেন বলেই খালেদা জিয়া এখন পর্য্যন্ত সুস্থ আছেন: আইনমন্ত্রী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরিতে বিসিপিএসকে কার্যকরী ভূমিকা রাখার তাগিদ রাষ্ট্রপতির সরকার বিজ্ঞান-প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে বহুমাত্রিক করেছে : প্রধানমন্ত্রী জনগণের সম্মতি ছাড়া রেল চলালচলের চুক্তি মানিনা – ‘এবি পার্টি’ যুদ্ধ এবং ‘এআই’ বরেন্দ্র এলাকায় পানির হাহাকার: মাটির নিচের পানি কোথায় গেলো?

ইতালির রূপকথা (বে-ইমানের মা)

  • Update Time : মঙ্গলবার, ২১ মে, ২০২৪, ৭.১৪ পিএম

মাক্সিম গোর্কি

মায়েদের সম্পর্কে কাহিনীর শেষ নেই।

কয়েক সপ্তাহ যাবৎ শত্রু-সৈন্যেরা অস্ত্রের নিশ্ছিদ্র বেড়াজালে অবরোধ করে রেখেছে শহরটাকে। রাত্রে আগুন জ্বলে উঠে মসীকৃষ্ণ অন্ধকারের মধ্যে লক্ষ লক্ষ লাল চোখের মতো উঁকি দিতে থাকে শহরের দেয়ালের দিকে। হিংস্রের মতো সে আগুন জ্বলতেই থাকে। তার আক্রোশভরা দপদপানিতে শঙ্কা জেগে ওঠে অবরুদ্ধ শহরের অভ্যন্তরে।

নগর-প্রাচীর থেকে দেখা যেত শত্রুর বেড়াজাল চেপে বসছে কঠিন হয়ে; চোখে পড়ত আগুনের আশেপাশে কালো কালো ছায়া নড়ছে, কানে আসত তাগড়াই ঘোড়াগুলোর ডাক, অস্ত্রের বঝনঝন, উচ্চ হাসি আর জয়লাভ সম্পর্কে স্থিরনিশ্চিত লোকগুলোর ফুর্তির গান- আর শত্রুর গান আর হাসি যে পরিমাণ কানে বেঁধে, তা আর কিছুতেই নয়।

শহরের জল সরবরাহ করার মতো যতোকটি নদী ছিল, তার সবকটিতে মড়া ফেলেছে শত্রুরা, নগর-প্রাচীরের চারিপাশের আঙুর- বাগিচা পুড়িয়ে ছাই করেছে, দলিত করে গেছে শস্যক্ষেত্র, কেটে নিঃশেষ করেছে ফলের বাগান- সবদিক থেকে নগর এখন শত্রুপক্ষের কাছে উন্মুক্ত। আর প্রায় প্রতিদিন শত্রুপক্ষের কামান আর বন্দুক থেকে গীসে আর লোহা ঝরে পড়ত শহরের বুকে।

শহরের সঙ্কীর্ণ রাস্তা দিয়ে যুদ্ধক্রান্ত, অর্ধভুক্ত সৈন্যের এক একটা বাহিনী টহল দিয়ে ফিরত গোমড়া মুখে। ঘরবাড়িগুলোর জানলা থেকে ভেসে আসত আহতদের গোঙানি, বিকারগ্রস্তদের চিৎকার, নারীকণ্ঠের প্রার্থনা, আর শিশুদের কান্না। লোকে কথা কইত বিষণ্ণভাবে ফিসফিস করে, কথার মাঝখানে হঠাৎ থেমে যেত উৎকর্ণ শঙ্কায় শত্রুরা এগিয়ে এল নাকি?

সবচেয়ে অসহ্য ছিল রাত: নিশীথ স্তব্ধতার মধ্যে আরো স্পষ্ট হয়ে উঠত গোঙানি আর চিৎকার। দূরের পাহাড়টার খাদ বেয়ে অর্ধভগ্ন প্রাচীরের দিকে চুপি চুপি এগিয়ে আসত নীল-কালো ছায়া, শত্রুর ছাউনিকে আড়াল করে। পাহাড়ের অন্ধকার পিঠের ওপর তরোয়ালের ঘা খাওয়া এক পরাভূত ঢালের মতো দেখা দিত চাঁদ। আর সাহায্যের সম্ভাবনায় হতাশ হয়ে, দিন দিন কমে আসা মুক্তির আশায়, ক্ষুধায় আর পরিশ্রমে কাতর নগরবাসীরা সেই চাঁদের দিকে তাকাত আতঙ্কে, তাকাত পাহাড়ের দাঁত বার করা রূপটার দিকে, খাদের অন্ধকার গহ্বরের দিকে, শত্রুপক্ষের শিবিরের হল্লার দিকে। এর সবকিছু থেকেই ভেসে আসত মৃত্যুর বার্তা। সান্ত্বনা পাবার মতো একটা তারাও আকাশে দেখা যেত না।

ঘরে বাতি জ্বালতে সাহস পেত না কেউ, ঘন অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে থাকত রাস্তাঘাট। আর এই অন্ধকারের মধ্যে আপাদমস্তক কালো পোষাকে ঢাকা একটি নারী মুতি নদীর গভীরে মাছের নতে। এগিয়ে যেত নিঃশব্দে।

ওকে দেখলে লোকে ‘কানাকানি করত।

‘এই সেই না?’

‘এই সেই!’

তারপর নিঃশব্দে লুকিয়ে পড়ত খিলানের নিচে, নয়ত মাথা নিচু করে দ্রুত পাশ কাটিয়ে যেত তাকে। টহলদার প্রহরীরা ওকে কঠোর- ভাবে হাঁশিয়ার করে দিত: ‘আবার বেরিয়েছো, মোন। মারিয়ানা? হুঁশিয়ার। মারা পড়বে কিন্তু, কে খুন করল তা নিয়ে কেউ মাথাও ঘামাবে না…’

খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করত মেয়েটা। কিন্তু টহলদার সৈন্যগুলো হয় সাহস পেত না, নয় ওর গায়ে হাত তুলতে ঘেন্না হত তাদের। ওকে পাশ কাটিয়ে চলে যেত তারা। সশস্ত্র লোকেরা ওকে এড়িয়ে যেত যেন একটা মড়া। তারপর অন্ধকারে একলা একলা আবার সে তার স্তব্ধ নিঃসঙ্গ পরিভ্রমণ শুরু করত রাস্তা থেকে রাস্তায়, নিঃশব্দে, ছায়ার মতো। যেন নগরের দুর্দশাটাই চলেছে মূর্তি ধরে আর তার চারপাশে যেন তার পিছু নিয়ে এগিয়ে আসছে যতো রাত্রির ক্লেশের শব্দ-গোঙানি, কান্না, প্রার্থনা আর হতাশ্বাস সৈন্যদের রুক্ষ বিড়বিড়ানি।

মানুষ সে, এবং মা। ভাবনা তার নিজের ছেলেকে নিয়ে, আর দেশকে নিয়ে, কেননা যে লোকগুলো এই নগরখানাকে ধ্বংস করে চলেছে তার নেতৃত্বে রয়েছে তারই ছেলে, তারই হাসিখুশি, সুপুরুষ, হৃদয়হীন পুত্র। অথচ কিছু দিন আগেও এ ছেলেকে দেখে তার গর্ব হত, মনে হত যেন দেশের জন্য সে ছেলে এক মূল্যবান অর্থ্য; যে নগরে তার জন্ম, যে নগরে জন্ম নিয়ে বেড়ে উঠেছে তার ছেলে, সেই নগরের জনগণকে সাহায্যের জন্য এক কল্যাণময় শক্তি। হৃদয় তার অসংখ্য অদৃশ্যবন্ধনে এই পাথরগুলোর সঙ্গে বাঁধা- এই পাগর- গুলো দিয়েই তার পূর্ব পুরুষেরা সৌধ গড়েছে, প্রাচীর তুলেছে। হৃদয় তার বাঁধা এই মাটির সঙ্গে যেখানে সমাধিস্থ হয়ে আছে তার আত্মপরিজনের অস্থি, বাঁধা এখানকার লোককথা, গান, আশার সঙ্গে। এ হৃদয় আজ তার এক প্রিয় জনকে হারিয়েছে বলে অশ্রুভারাক্রান্ত। মনে মনে সে যেন তুলাদণ্ডে ওজন করে দেখতে চাইছিল, কোনটা বেশি, পুত্রের জন্য তার স্নেহ নাকি তার জন্মন্মভূমি নগরের জন্য ভালোবাসা? কোনটা বেশি তা সে বুঝে উঠতে পারছিল না কিছুতেই।

আর তাই এমনি ভাবেই সে রাত্রে ঘুরে ঘুরে বেড়াত পথে পথে। চিনতে না পেরে অনেকেই ভয়ে পেছিয়ে আসত তার কাছ থেকে, তার কালো মূর্তিটাকে ভাবত বুঝিবা মূর্তিমতী মৃত্যু, কেননা মৃত্যু তাদের ভারি কাছে। তারপর যদি চিনতে পারত, তাহলে বে-ইমানের মায়ের কাছ থেকে নিঃশব্দে মুখ ফেরাত তারা।

কিন্তু একদিন একটু দূরে নগর-প্রাচীরের পাশে ও দেখল একটি মেয়ে হাঁটু গেড়ে বসে আছে একটি মৃতদেহের পাশে এত নিস্তব্ধ মেয়েটি যে মনে হয় যেন মাটিরই একটা অংশ। নক্ষত্রের দিকে বেদনার্ত মুখখানা তুলে প্রার্থনা করছিল সে। আর প্রাচীরের ওপর নিচু গলায় কথা কইছিল প্রহরীরা, পাথরের ওপর শব্দ হচ্ছিল ওদের অস্ত্রের।

বে-ইয়ানের মা জিগ্যেস করলে, ‘তোমার স্বামী?’

‘না।’

‘ভাই?’

‘না, আমার ছেলে। স্বামী মারা পড়েছে তের দিন আগে, আজ গেল আমার ছেলে।’

তারপর উঠে দাঁড়িয়ে নিহতের মা বললে বিনীতভাবে, ‘নাডোনা সবই দেখছেন, সবই জানেন, তাঁর কাছে আমি কৃতজ্ঞ।’

প্রথম নারী জিগ্যেস করলে, ‘কেন?’

দ্বিতীয় বললে, ‘এখন যখন দেশের জন্যে যুদ্ধ করে সসম্মানে ও প্রাণ দিতে পারল, এখন বলা যায় ওর জন্যে মনে মনে ভয় ছিল আমার; বজ্ঞো অগভীর প্রকৃতির ছেলে ছিল ও, বড়ো ভালোবাসত ফুর্তির জীবন, ভয় হত ও হয়ত দেশের প্রতি বে-ইমানি করবে, যেমন করেছে মারিয়ানার ঐ ছেলে, ঈশ্বরের শত্রু, মানুষের শত্রু, ওই আমাদের শত্রুপক্ষের নেতা, অভিশাপ লাগুক ওকে, আর যে ওকে পেটে ধরেছে তাকে!…’

মুখ ঢেকে চলে এল মারিয়ানা। পরদিন সে নগর-রক্ষীদের কাছে গিয়ে বললে:

‘আমার ছেলে তোমাদের শত্রু। হয় আমাকে মেরে ফেলো, নয়ত গেট খুলে দাও, আমি ছেলের কাছে চলে যাবো…’

ওরা বললে:

‘তুমি মানুষ, তোমার কাছেও তোমার দেশ বড়ো। তোমার ছেলে যেমন আমাদের শত্রু তেমনি তোমারও শত্রু।’

‘আমি ওর মা। আমি ওকে ভালোবাসি। ও যা করেছে তার জন্যে আমিও দোষী বলে আমার ধারণা!’

পরস্পর আলোচনা করে ওরা সিদ্ধান্ত করলে:

‘তোমার ছেলের অপরাধের জন্যে তোমার প্রাণ হরণ করা অনুচিত। আমরা জানি এই ভয়ঙ্কর অপরাধের জন্যে তুমি তোমার ছেলেকে প্ররোচিত করোনি- তোমার যন্ত্রণা আমরা বুঝতে পারছি। কিন্তু জামীন হিসাবে তোমাকে ধরে রাখব, এরও কোনো দরকার দেখছি না, কেননা তোমার ছেলে তোমার জন্যে মোটেই চিন্তিত নয়।

ও এক শয়তান, তোমার কথা ও ভুলেই গেছে বলে আমাদের বিশ্বাস। তোমার শাস্তি পাওয়া দরকার বলে যদি তোমার ধারণা হয়ে থাকে তবে এই যথেষ্ট শাস্তি। মৃত্যুর চেয়েও এ অবস্থা ভয়ঙ্কর বলে আমাদের ধারণা।’ ও বললে, ‘হ্যা, মৃত্যুর চেয়েও এটা ভয়ঙ্কর।’

সুতরাং ওরা ফটক খুলে নগর ছেড়ে চলে যেতে দিল ওকে। ওর ছেলে যে রক্ত ঝরিয়েছে তাতে স্বদেশ আজ রক্তাক্ত। এই স্বভূমি ছেড়ে ও চলেছে, প্রাকারের ওপর থেকে ওরা তা দেখলে তাকিয়ে তাকিয়ে। আস্তে আস্তে হাঁটছিল ও, দেশ ছেড়ে চলে যেতে ওর পা দুটো যেন চাইছিল না। নগর রক্ষা করতে গিয়ে যারা মারা পড়েছে সেই সব মৃতদেহের দিকে লক্ষ্য করে মাথা নোয়ালে ও। ভাঙা একটা হাতিয়ার ফেলে দিলে লাথি দিয়ে, কারণ যাতে জীবন রক্ষা পায় এমন হাতিয়ার ছাড়া আর সব হাতিয়ারই মায়েদের কাছে ঘৃণার বস্তু।

ও হাঁটছিল এমন ভাবে যেন ওর কাপড়ের তলে এক পাত্র পবিত্র জল বহন করে নিয়ে চলেছে ও সতর্কভাবে যাতে একটি ফোঁটাও না পড়ে। নগর-প্রাকার থেকে যারা ওকে লক্ষ্য করছিল তাদের চোখে ওর মূর্তিটা ক্রমেই ছোটো হয়ে আসতে লাগল। ওদের মনে হল, ঐ মেয়েটার সঙ্গে সঙ্গে হতাশা আর নৈরাশ্যও যেন ছেড়ে চলে যাচ্ছে ওদের।

ওরা দেখলে, মাঝখান পর্যন্ত গিয়ে থামল মেয়েটা, তারপর মাথার আবরণ ফেলে দিয়ে ফিরে দাঁড়িয়ে বহুক্ষণ তাকিয়ে রইল নগরের দিকে। আর অন্য পাশে, শত্রুশিবিরের লোকেরা দেখল মাঠের মধ্যে ও একা, ওরই মতো কালো কালো কয়েকটা ছায়া এগিয়ে এল ওর দিকে। এগিয়ে এসে জিগ্যেস করলে কে সে, কোথা থেকে আসছে।

‘তোমাদের অধিনায়ক আমার ছেলে।’ ও বললে, এবং একজন সৈনিকও সে কথা অবিশ্বাস করল না। ওর সামনে গিয়ে ওরা তার পুত্রের প্রশংসা করতে লাগল, বদলে কি রকম বুদ্ধিমান, কি রকম সাহসী সে। একটুও অবাক না হয়ে সগর্বে মাথা তুলে ও শুনে গেল, কেননা ওর ছেলে এ ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না, তা ওর জানা।

তারপর অবশেষে ও গিয়ে দাঁড়াল সেই তাঁর কাছে যাকে সে চেনে তার জন্যের নয় মাস আগে থেকে, যাকে সে কখনো তার নিজের হৃদয় থেকে আলাদা কবে দেখতে পারেনি। রেশম আর মখমলের পোষাকে যে তারই সামনে দাঁড়িয়ে, বহুমূল্য মণিতে তার অস্ত্রশস্ত্র সুশোভিত। যা হওয়া দরকার সব কিছুই ঠিক তেমনি, ঠিক এই মুতিতেই ও বহুবার তার ছেলেকে দেখেছে স্বপ্নে- ঐশ্বর্যশালী, খ্যাতনামা, জনপ্রিয়।

মায়ের হাত চুম্বন করে ছেলে বললে, ‘মা, তুমি আমার কাছে এসে গেছো, তাহলে বুঝতে পেরেছো আমাকে, আর ভাবনা নেই কালই ওই অভিশপ্ত নগরখানা আমি দখল করছি!’

‘যে নগরে তোর জন্য’, ও মনে করিয়ে দিল ছেলেকে।

ক্ষমতায় মাতাল, আরো গৌরবের আশায় উন্মাদ তার ছেলে যৌবনের উদ্ধত স্পর্ধায় জবাব দিলে:

‘আমি জন্মেছি দুনিয়ার বুকে, দুনিয়ার জন্যে, আমি চাই আমাকে দেখে বিস্ময়ে দুনিয়া কাঁপবে! এ নগরকে আমি এত দিনও কিছু করিনি তোমার জন্যে- কাঁটার মতো এ নগরটা আমায় বিঁধে আছে, এর জন্যেই, ঠেকে আছে আমার যতো গৌরব। কিন্তু কালই এই নির্বোধ গোঁয়ারের বাসা আমি চূর্ণ করছি!’

‘যেখানে প্রত্যেকটি পাথর তোকে ছেলেবেলা থেকে জানে, ছেলেবেলা থেকে মনে করে রেখেছে,’ মা বললে।

‘মানুষ যদি পাথরকে দিয়ে কথা না বলায়, তাহলে পাথর তো বোবা। আমার কথা বলুক পাহাড়-পর্বত, এই আমার ইচ্ছা!’

‘শুধু পাহাড়-পর্বত। আর মানুষ?’ জিগ্যেস করলে না। ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, মানুষের কথাও আমি ভুলিনি, না। তাদেরও আমার চাই, কেননা মানুষের স্মৃতির মধ্যেই অমর হয়ে থাকে বীরেরা।’

মা বললে:

‘সেই বীর, যে জীবন সৃষ্টি করে মৃত্যুর বিরুদ্ধে, যে জয় করে

মৃত্যুকে…’

ও আপত্তি করে বললে, ‘না। নগর যে ধ্বংস করে সেও নগর- স্রষ্টার মতোই বিখ্যাত। দ্যাখো, রোম কে গড়েছে আয়েনিয়াস না রোমুলাস্ তা আমরা জানি না- কিন্তু রোম যারা ধ্বংস করেছিল সেই আলারিহ আর অন্যান্য বীরদের নাম আমরা ভালো করেই জানি…’

‘সব নামের চেয়েও বেশি বাঁচবে রোমের নাম’, মা মনে করিয়ে দিলে ছেলেকে।

সূর্যাস্ত পর্যন্ত এই ভাবেই কথা কইলে তারা; ছেলের উদ্ধত ভাষণের প্রতিবাদ ক্রমেই বিরল হয়ে এল মায়ের, ক্রমেই নিচু হয়ে এল তার অহংকৃত শির।

মার কাজ সৃষ্টি করা, রক্ষা করা। তার কাছে ধ্বংসের কথা বলার অর্থ মায়ের বিরুদ্ধেই কথা বলা। কিন্তু ছেলে সে কথা বোঝেনি, বোঝেনি যে সে মায়ের অস্তিত্বের যুক্তিটাকেই খণ্ডন করতে চাইছে।

মা সর্বদাই মৃত্যুর প্রতিবাদী; যে হাত সংসারে মৃত্যু টেনে আনে যে হাত মায়ের কাছে ঘৃণ্য, বর্জনীয়। কিন্তু ছেলের নজরে তা পড়ল না, কেননা সে অন্ধ সেই গৌরবের তুহিন ঔজ্জ্বল্য দিয়ে, যা হৃদয়কে নিষ্প্রাণ করে আনে।

এও তার জানা ছিল না, যে-জীবন মা সৃষ্টি করে ধারণ করে, যখন প্রশ্ন আসে সেই জীবনকে নিয়েই, তখন যেমন নির্ভীক তেমনি চতুর ও নির্মম হয়ে উঠতে পারে মা।

মাথা নিচু করে বসে রইল না, আর অধিনায়কের সুসজ্জিত শিবিরের ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে দেখল যেই নগরকে, যেখানে সে প্রণম তার নিজের মধ্যে অনুভব করেছিল একটা জীবনের মধুর স্পন্দন, অনুভব করেছিল তার সন্তানের প্রসব যন্ত্রণা, আর সেই সন্তানই কিনা আজ ধ্বংসের নেশায় পাগল।

সূর্যের লাল আলোয় নগরের প্রাচীর আর মিনার রাঙা হয়ে উঠেছে রক্তের মতো; জানলায় শার্সিগুলোতে জ্বলছে আক্রোশ। সমস্ত শহরটাকেই মনে হচ্ছে একাকার একটা ক্ষত, প্রত্যেকটা ক্ষতমুখ থেকে বেরিয়ে আসছে রক্তিম প্রাণরস। কিছু ক্ষণের মধ্যেই শহরটা মৃতদেহের মতো কালো হয়ে উঠল আর অন্ত্যেষ্টি দীপের মতো জ্বলতে লাগল মাথার ওপরকার তারা।

ও দেখলে সেই অন্ধকার ভবনগুলিকে, শত্রুর চোখে পড়ার ভয়ে যেখানে লোকে বাতি জ্বলাতে সাহস পায় না, দেখলে রাস্তাগুলোকে, অন্ধকারে ঢাকা, শবদেহের পূতিগন্ধে ভরা, কানে এল মৃত্যু-প্রতীব্ মানুষগুলোর ত্রস্ত ফিস ফিস কথা- এই সব কিছু দেখলে সে, তার অতি ঘনিষ্ঠ ও প্রিয় এই সবকিছু যেন নির্বাক হয়ে তার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে, নগরের এই সমস্ত লোকের মা বলে তার মনে হল নিজেকে।

অন্ধকার পাহাড় চূড়ো থেকে মেষ নেমে এল উপত্যকার, মৃত্যু দণ্ডিত নগরটার ওপর সে মেঘ ঝাঁপিয়ে পড়ল একদল পক্ষীরাজ ঘোড়ার মতো।

ছেলে বললে, ‘রাতটা যদি বেশ অন্ধকার হয়ে যায় তাহলে আজ রাতেই আক্রমণ করা যাবে। চোখের ওপর যখন রোদ এসে পড়ে, তখন হত্যা করা মুশকিল। অস্ত্রের ঝকমকে চোখ ধাঁধিয়ে গিয়ে মার ফসকিয়ে যায় অনেক।’ তরোয়ালটা পরখ করতে করতে ছেলে মন্তব্য করলে।

মা বললে:

‘আয় খোকা, আমার বুকে মাথা দিয়ে একটু শো। মনে করে দ্যাখ দিকি, ছেলেবেলায় কি রকম হাসিখুশি ছিলি তুই, কি রকম মায়াদয়া ছিল। সকলে তোকে কি ভালোই না বাসত…’

ছেলে মার কথা শুনে মার কোলে মাথা রেখে চোখ বুজলে। বললে, ‘আমি ভালোবাসি শুধু গৌরব, আর তোমাকে ভালোবাসি কারণ আমি যা হয়েছি তা হয়েছি তোমার জন্যে।’

‘আর মেয়েদের ভালোবাসিস না তুই?’ ছেলের ওপর ঝুঁকে পড়ে জিগ্যেস করলে মা।

‘মেয়েরা সংখ্যায় অনেক, ক্লান্তি লাগে, অতি সুমধুর জিনিসে যেমন ক্লান্তি এসে যায়।’

‘ছেলে চাস না তুই?’ শেষ কালে জিগ্যেস করলে না।

‘কি হবে ছেলেতে? শেষ পর্যন্ত নিহত হবে এই জন্যে তো? আমার মতো কারো হাতে তারা মারা পড়বে শুধু শুধু, তাতে ব্যথা লাগবে আমার অথচ বুড়ো বয়সে দুর্বল শরীরে তার কোনো প্রতিশোধও নিতে পারব না।’

দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে মা বললে, ‘তুই সুপুরুষ, কিন্তু বিদ্যুতের ঝলকের মতোই তুই নিষ্ফল।’

‘ঠিক, আমি বিদ্যুতের মতোই…’ ছেলে জবাব দিলে হেসে। আর মায়ের কোলের ওপরেই শিশুর মতো ঘুমিয়ে পড়ল সে। তারপর তার গায়ের কালো পোষাকটা দিয়ে ছেলেকে ঢেকে দিয়ে মা তার বুকে বসিয়ে দিলে ছোরাখানা। কেঁপে উঠে মারা গেল তার ছেলে, ছেলের বুকটা কোথায় ধুকধুক করছিল তা কে বেশি জানত মায়ের চেয়ে! তারপর বিমূঢ় প্রহরীদের পায়ের কাছে নিজের কোল থেকে ছেলের শবদেহ ফেলে দিয়ে নগরের দিকে তাকিয়ে সে বললে:

‘মানুষ হিসেবে দেশের জন্যে আমার যা করবার তা যানি করেছি; মা হিসেবে আনার জায়গা ছেলের সঙ্গে। আর একটি সন্তান প্রসব করার বয়স আমার পেরিয়ে গেছে- আমার জীবনে আর কারে। কোনো কাজ হবে না।’

ছেলের রক্তে, তারই রক্তে ছোরাখানা তখনও তপ্ত। সে-ছোরা সে তার নিজের বুকে বসিয়ে দিল দৃঢ়ভাবে, এবারও তার লক্ষ্য ভ্রষ্ট হল না, কেননা ব্যখিত হৃদয় খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়।

 

 

ইতালির রূপকথা (বিকটাঙ্গ)

ইতালির রূপকথা (বিকটাঙ্গ)

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

kjhdf73kjhykjhuhf
© All rights reserved © 2024