সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ১০:৫৮ অপরাহ্ন
শিরোনাম :

মুর্শিদাবাদ-কাহিনী (পর্ব-১২)

  • Update Time : সোমবার, ১ এপ্রিল, ২০২৪, ১১.০০ পিএম

শ্রী নিখিলনাথ রায়

লইয়া সমরক্ষেত্রে আত্মবিসর্জন দেন; কিন্তু স্বীয় পরিবারবর্গের অবস্থা স্মরণ করিয়া তাহা হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইলেন। তাঁহার এইরূপ বিশ্বাস ছিল, যে তাঁহার মৃত্যুর পর তদীয় পরিবারবর্গ মুর্শিদাবাদে বন্দী হইয়া মুসলমান ধর্ম্মে দীক্ষিত হইবে। সেই বিশ্বাসে রাজা সপরিবারে পলায়ন করিতে বাধ্য হইলেন। তিনি যুদ্ধে প্রাণত্যাগ করিয়া যশোলাভ অপেক্ষা ধর্ম্মরক্ষাকে গুরুতর মনে করিলেন। পুত্র সাহেবরামও যুদ্ধে পরাজিত হইয়াছিলেন। অতঃপর তাঁহারা বীরকিটির রাজভবন হইতে বহির্গত হইয়া সপরিবারে অরণ্যে ও পর্ব্বতময় দেশে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। যেখানে গমন করেন, সেই খানে মনে হয়, যেন নবাবসৈন্যগণ তাঁহার অনুসরণ করিতেছে, এবং তাঁহাকে মুসলমানধৰ্ম্মে দীক্ষিত করিতে ইচ্ছা করিতেছে। এইরূপ ভয়ানক চিন্তায় তিনি কাতর হইয়া উঠেন ও অবশেষে দেবীনগর নামক স্থানে উপস্থিত হন। দেবীনগরেও তাঁহার এক বাসভবন ছিল। প্রবাদ ও প্রচলিত ইতিহাস অনুসারে উদয়নারায়ণ দেবীনগরে হংস-সরোবর তীরে উপস্থিত হইয়া বিষপানে প্রাণ বিসর্জন -করিয়াছিলেন। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে তিনি ও সাহেবরাম বন্দী হইয়া তথা হইতে মুর্শিদাবাদে নীত হন এবং কারাযন্ত্রণা ভোগে তাঁহার অবশিষ্ট জীবনকাল পর্য্যবসিত হয়। দেবীনগর সাঁওতাল পরগণা জেলার অন্তর্ব্বর্ত্তী। হংস-সরোবর অস্থাপি বর্তমান আছে।

এইরূপে উদয়নারায়ণের অবসান হয়। তাঁহার ন্যায় উপযুক্ত জমীদার তৎকালে অতি অল্পই দৃষ্ট হইত। সর্ব্বাপেক্ষা তাঁহার ধর্মপরায়ণতাই প্রসিদ্ধ ছিল। হিন্দু ধর্ম্মের শ্রীবৃদ্ধিসাধন জন্য তিনি অনেক যত্ন করিয়াছিলেন। তাঁহার প্রতিষ্ঠিত নানা স্থানের দেববিগ্রহ তাঁহার ধর্মানুরাগের সাক্ষ্য প্রদান করিতেছে। সাওতাল পরগণা জেলাস্থ বীরকিটি নামক স্থানের রাধাগোবিন্দ, বননওগাঁ গ্রামস্থ গিরিধারি-মূর্তি প্রভৃতি তাঁহার প্রতিষ্ঠিত। রামপুরহাট উপবিভাগস্থ কনকপুর গ্রামে যে অপরাজিতা মূর্তি আছেন, তিনি তাঁহার সেবা করিয়াছিলেন। তাঁহারই স্থাপিত মদন- গোপাল মূর্তি মুর্শিদাবাদ-বড়নগরে নাটোর-রাজগণ কর্তৃক অস্থাপি পূজিত হইতেছেন। উদয়নারায়ণের হস্ত হইতে নবাব রাজসাহী প্রদেশ গ্রহণ করিয়া, রামজীবন ও কুমার কালুকে তাহার ভার অর্পণ করেন। রাম- জীবন নাটোর রাজবংশের আদি পুরুষ রঘুনন্দনের ভ্রাতা।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে আমরা আর এক উদয়নারায়ণের বিবরণ অবগত হইয়া থাকি। শেষোক্ত উদয়নারায়ণ বঙ্গজ, কায়স্থ মিত্রবংশসম্ভূত; পূর্ব্ববঙ্গের উলাইল গ্রাম তাঁহার জন্মস্থান। তিনি দৌহিত্রসূত্রে বাকলা চন্দ্রদ্বীপের রাজ্যাধিকার প্রাপ্ত হন। মিত্র উদয়নারায়ণও অত্যন্ত পরাক্রান্ত ছিলেন। তাঁহার সম্বন্ধে অনেক ঘটনা শুনিতে পাওয়া যায়। এইরূপ প্রবাদ আছে যে, নবাব-শ্যালক খাজি মজুমদার তাঁহাকে রাজ্যচ্যুত করিলে, তিনি নবাবের নিকট রাজ্য প্রার্থনা করেন। নবাব তাঁহার আবেদনে উত্তর দেন যে, তুমি একটি ব্যাঘ্রের সহিত যুদ্ধ করিয়া জয় লাভ করিতে পারিলে, রাজ্য পুনঃপ্রাপ্ত হইবে। উদয়নারায়ণ তাহাতেই স্বীকৃত হইয়া, দ্বিতীয় ফরিদের ন্যায় মল্লযুদ্ধে এক “শের” নিহত করিয়া অক্ষত-শরীরে প্রত্যাবৃত্ত হইলেন; কিন্তু নবাবের বেগম তাঁহার রাজ্যপ্রাপ্তির অন্তরায় হইয়া উঠেন। উদয়নারায়ণ অবশেষে কৌশল- ক্রমে রাজ্য হস্তগত করেন।

 

 

 

মুর্শিদাবাদ-কাহিনী (পর্ব-১১)

মুর্শিদাবাদ-কাহিনী (পর্ব-১১)

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

kjhdf73kjhykjhuhf
© All rights reserved © 2024