০৫:২০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রপ্তানি বাড়ছে, অর্ডার কমছে—বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের মুনাফা যাচ্ছে কোথায়? ‘Belonging: A Journey of Love’: সোনিয়া গান্ধীর বহুল আলোচিত স্মৃতিকথা ১০ নভেম্বর ভারতে প্রকাশ সিলেটে প্রতিমন্ত্রীর অনুষ্ঠান বয়কট সাংবাদিকদের, বিএনপির বিরুদ্ধেও হয়রানির অভিযোগ বিএনপির মন্ত্রীদের মান্নার কড়া বার্তা: ‘সত্য বলুন, দম্ভ দেখাবেন না’ ভারী বৃষ্টিতে দিল্লি অচল, কনট প্লেস থেকে বিমানবন্দর পানির নিচে বিশ্বে খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ, বাড়ছে সরবরাহ ঝুঁকি বেলুচিস্তানে ৭২ ঘণ্টার অভিযানে ৪৮ ‘সন্ত্রাসী’ নিহত, দাবি পাকিস্তানের হৃদয় থেকে রান্না, স্বাস্থ্য থেকে মানুষের পাশে: উদ্ভিদভিত্তিক খাবারে বদলের গল্প চট্টগ্রামে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, ব্যবসায়ীকে ‘ছেলেমেয়ের লাশ ফেলে রাখার’ হুমকি ইসলামী ব্যাংকে এস আলম-সংশ্লিষ্ট ৮১.৯২ শতাংশ শেয়ার ফ্রিজের নির্দেশ হাইকোর্টের

আটলান্টিকের ‘এরিন’ থেকে শিক্ষা: জলবায়ু ঝুঁকিতে বাংলাদেশ উপকূলও অরক্ষিত

আটলান্টিকে শক্তিশালী হারিকেন এরিন
আটলান্টিক মহাসাগরে গঠিত শক্তিশালী হারিকেন এরিন ইতিহাসের অন্যতম দ্রুত শক্তিশালী হওয়া ঝড় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। মাত্র এক দিনেরও কম সময়ে এটি ক্যাটাগরি-১ থেকে ক্যাটাগরি-৫ পর্যায়ে পৌঁছায়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা ও সমুদ্রের বাড়তি তাপমাত্রার কারণেই এ ধরনের ঝড় ক্রমেই সাধারণ হয়ে উঠছে।

যদিও এরিন সরাসরি কোনো ভূমিতে আঘাত হানবে না, তবে এর বিশাল আকার ও শক্তিশালী বাতাস ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ ও যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা
বাংলাদেশ সরাসরি আটলান্টিক ঝড়ের প্রভাবে পড়ে না, তবে এরিনের মতো ঘটনাগুলো আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বঙ্গোপসাগরেও ঘূর্ণিঝড়গুলো দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতে সিডর, আইলা বা আম্পানের মতো ঝড় হঠাৎ শক্তি সঞ্চয় করে উপকূলে আঘাত হেনেছিল। এরিনের ঘটনাটি দেখাচ্ছে, এ প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে।

গত ৫০ বছরের ঘূর্ণিঝড় পরিসংখ্যান
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী:

১৯৭০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩০টির বেশি বড় ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশ উপকূলে আঘাত হেনেছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল ১৯৭০ সালের ভোলা ঘূর্ণিঝড়, যেখানে প্রায় ৩ থেকে ৫ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারান।

১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ১,৩৮,০০০ মানুষের মৃত্যু হয়।

২০০৭ সালের সিডর প্রায় ৩,৫০০ মানুষের মৃত্যু ঘটায় এবং কৃষি ও অবকাঠামোতে কয়েক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি করে।

২০০৯ সালের আইলা দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা লবণাক্ত পানিতে ডুবিয়ে দেয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় ৪০ লাখ মানুষ।

২০২০ সালের আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় ২৬ লাখ মানুষ, ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৩.৫ বিলিয়ন ডলার।

ক্ষয়ক্ষতি ও পুনরুদ্ধার
বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড় মানেই প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়। তবে আশ্রয়কেন্দ্র, পূর্বাভাস ব্যবস্থা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আধুনিক হওয়ায় প্রাণহানি আগের তুলনায় কমেছে।

১৯৭০ সালের ভোলা ঘূর্ণিঝড়ে মৃত্যু হয়েছিল কয়েক লক্ষ মানুষের, অথচ ২০২০ সালের আম্পানে মৃত্যু হয় ২০ জনেরও কম।

তবে অর্থনৈতিক ক্ষতি বেড়েই চলেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ, চিংড়ি খামার ও কৃষি নির্ভর জীবিকা এসব ক্ষতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ দীর্ঘমেয়াদে কৃষি, পানীয় জল ও মানুষের বসবাসকে অনিশ্চিত করে তুলছে।

বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আরিফুল হক বলেন, “এরিনের মতো ঝড় প্রমাণ করে যে জলবায়ু পরিবর্তন ঘূর্ণিঝড়ের প্রকৃতি বদলে দিচ্ছে। বঙ্গোপসাগরে আগামী দশকে আরও দ্রুত শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় দেখা দিতে পারে।”

পরিবেশ বিশেষজ্ঞ সেলিনা আখতার বলেন, “আমরা প্রাণহানি কমাতে পেরেছি, কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষতির ধাক্কা সামলানো কঠিন হচ্ছে। এরিন থেকে শিক্ষা হলো, আমাদের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও আধুনিক করা জরুরি।”

বাংলাদেশ উপকূলের ভবিষ্যৎ ঝুঁকি
বাংলাদেশ উপকূলের প্রায় ৩ কোটি মানুষ ঘূর্ণিঝড়প্রবণ অঞ্চলে বসবাস করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগামী এক দশকে ঝড়ের ঘনত্ব ও তীব্রতা আরও বাড়বে।

উপকূলীয় বাঁধগুলো দুর্বল এবং অনেক জায়গায় ভেঙে পড়েছে।

আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়লেও এখনও প্রায় ৫০% মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের বাইরে থেকে যায়।

মৎস্যশিল্প, চিংড়ি খামার ও কৃষি—সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত খাত।


আটলান্টিকের এরিন কেবল একটি বিদেশি ঝড়ের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের জন্যও এক সতর্কবার্তা। গত ৫০ বছরের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে—প্রাণহানি কমলেও অর্থনৈতিক ক্ষতি বহুগুণ বেড়েছে। তাই এখনই উপকূলীয় প্রতিরক্ষা, আধুনিক পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং পুনর্বাসন সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। নইলে এরিনের মতো সুপার সাইক্লোন ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগরে দেখা দিলে বাংলাদেশ ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

রপ্তানি বাড়ছে, অর্ডার কমছে—বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের মুনাফা যাচ্ছে কোথায়?

আটলান্টিকের ‘এরিন’ থেকে শিক্ষা: জলবায়ু ঝুঁকিতে বাংলাদেশ উপকূলও অরক্ষিত

০৩:১১:২৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৫

আটলান্টিকে শক্তিশালী হারিকেন এরিন
আটলান্টিক মহাসাগরে গঠিত শক্তিশালী হারিকেন এরিন ইতিহাসের অন্যতম দ্রুত শক্তিশালী হওয়া ঝড় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। মাত্র এক দিনেরও কম সময়ে এটি ক্যাটাগরি-১ থেকে ক্যাটাগরি-৫ পর্যায়ে পৌঁছায়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা ও সমুদ্রের বাড়তি তাপমাত্রার কারণেই এ ধরনের ঝড় ক্রমেই সাধারণ হয়ে উঠছে।

যদিও এরিন সরাসরি কোনো ভূমিতে আঘাত হানবে না, তবে এর বিশাল আকার ও শক্তিশালী বাতাস ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ ও যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা
বাংলাদেশ সরাসরি আটলান্টিক ঝড়ের প্রভাবে পড়ে না, তবে এরিনের মতো ঘটনাগুলো আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বঙ্গোপসাগরেও ঘূর্ণিঝড়গুলো দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতে সিডর, আইলা বা আম্পানের মতো ঝড় হঠাৎ শক্তি সঞ্চয় করে উপকূলে আঘাত হেনেছিল। এরিনের ঘটনাটি দেখাচ্ছে, এ প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে।

গত ৫০ বছরের ঘূর্ণিঝড় পরিসংখ্যান
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী:

১৯৭০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩০টির বেশি বড় ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশ উপকূলে আঘাত হেনেছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল ১৯৭০ সালের ভোলা ঘূর্ণিঝড়, যেখানে প্রায় ৩ থেকে ৫ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারান।

১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ১,৩৮,০০০ মানুষের মৃত্যু হয়।

২০০৭ সালের সিডর প্রায় ৩,৫০০ মানুষের মৃত্যু ঘটায় এবং কৃষি ও অবকাঠামোতে কয়েক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি করে।

২০০৯ সালের আইলা দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা লবণাক্ত পানিতে ডুবিয়ে দেয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় ৪০ লাখ মানুষ।

২০২০ সালের আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় ২৬ লাখ মানুষ, ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৩.৫ বিলিয়ন ডলার।

ক্ষয়ক্ষতি ও পুনরুদ্ধার
বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড় মানেই প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়। তবে আশ্রয়কেন্দ্র, পূর্বাভাস ব্যবস্থা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আধুনিক হওয়ায় প্রাণহানি আগের তুলনায় কমেছে।

১৯৭০ সালের ভোলা ঘূর্ণিঝড়ে মৃত্যু হয়েছিল কয়েক লক্ষ মানুষের, অথচ ২০২০ সালের আম্পানে মৃত্যু হয় ২০ জনেরও কম।

তবে অর্থনৈতিক ক্ষতি বেড়েই চলেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ, চিংড়ি খামার ও কৃষি নির্ভর জীবিকা এসব ক্ষতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ দীর্ঘমেয়াদে কৃষি, পানীয় জল ও মানুষের বসবাসকে অনিশ্চিত করে তুলছে।

বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আরিফুল হক বলেন, “এরিনের মতো ঝড় প্রমাণ করে যে জলবায়ু পরিবর্তন ঘূর্ণিঝড়ের প্রকৃতি বদলে দিচ্ছে। বঙ্গোপসাগরে আগামী দশকে আরও দ্রুত শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় দেখা দিতে পারে।”

পরিবেশ বিশেষজ্ঞ সেলিনা আখতার বলেন, “আমরা প্রাণহানি কমাতে পেরেছি, কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষতির ধাক্কা সামলানো কঠিন হচ্ছে। এরিন থেকে শিক্ষা হলো, আমাদের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও আধুনিক করা জরুরি।”

বাংলাদেশ উপকূলের ভবিষ্যৎ ঝুঁকি
বাংলাদেশ উপকূলের প্রায় ৩ কোটি মানুষ ঘূর্ণিঝড়প্রবণ অঞ্চলে বসবাস করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগামী এক দশকে ঝড়ের ঘনত্ব ও তীব্রতা আরও বাড়বে।

উপকূলীয় বাঁধগুলো দুর্বল এবং অনেক জায়গায় ভেঙে পড়েছে।

আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়লেও এখনও প্রায় ৫০% মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের বাইরে থেকে যায়।

মৎস্যশিল্প, চিংড়ি খামার ও কৃষি—সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত খাত।


আটলান্টিকের এরিন কেবল একটি বিদেশি ঝড়ের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের জন্যও এক সতর্কবার্তা। গত ৫০ বছরের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে—প্রাণহানি কমলেও অর্থনৈতিক ক্ষতি বহুগুণ বেড়েছে। তাই এখনই উপকূলীয় প্রতিরক্ষা, আধুনিক পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং পুনর্বাসন সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। নইলে এরিনের মতো সুপার সাইক্লোন ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগরে দেখা দিলে বাংলাদেশ ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।