০৫:২৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আমেরিকার সর্বশক্তিমান ভ্রম ভাঙছে ইরান যুদ্ধের বাস্তবতায়

বিশ্ব রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে দেখে আসা যুক্তরাষ্ট্র আজ এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। ইরানকে কেন্দ্র করে নতুন সংঘাত সেই পুরনো বিশ্বাসকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, নাকি এটি ছিল এক দীর্ঘদিনের ভ্রান্ত ধারণা?

ট্রাম্প না ইতিহাসের ধারাবাহিকতা

ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি দ্বৈত ধারণা কাজ করেছে। একদিকে অনেকে মনে করেন, তিনি ব্যতিক্রমী ও বিপজ্জনক একজন নেতা, যার সময় শেষ হলে গণতন্ত্র আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে। অন্যদিকে আরেকটি মত বলছে, ট্রাম্প আসলে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও মানসিক কাঠামোরই ফল, যেখানে দেশটি নিজেকে সবসময় সঠিক ও শ্রেষ্ঠ মনে করে।

এই দুই ধারণার মধ্যে দোলাচল চললেও ইরান যুদ্ধ সেই বিভাজনকে ভেঙে দিয়েছে। এটি যেমন ট্রাম্পের ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তের ফল, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক ও রাজনৈতিক মনোভাবেরও পরিণতি।

Trump's New Term: US Public Split on Whether Changes Will Be Good, Bad |  Pew Research Center

সর্বশক্তিমান ধারণার শিকড়

বিশ শতকের মাঝামাঝি থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি বিশ্বাস তৈরি হয়—তারা যা করবে, তা সফল হবেই। ব্যর্থতা হলে সেটি নিজেদের ভুল নয়, বরং বিশ্বাসঘাতকতা বা অন্য কারও কারণে হয়েছে বলে মনে করা হয়।

শীতল যুদ্ধ, চীন ইস্যু, ভিয়েতনাম যুদ্ধ কিংবা পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যে হস্তক্ষেপ—সব ক্ষেত্রেই একই মনোভাব দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে বিশ্ব নিয়ন্ত্রক হিসেবে কল্পনা করেছে, যেখানে অন্য দেশগুলো কেবল সেই পরিকল্পনার অংশ।

Opinion: America does not know how to exist in a world it does not control

সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের শিক্ষা

২০০১ সালের হামলার পর আফগানিস্তান ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ এই ধারণাকে আরও স্পষ্ট করে। দ্রুত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা বাস্তবে ব্যর্থ হয়। দীর্ঘ যুদ্ধ, হাজারো প্রাণহানি এবং অস্থিতিশীলতা তৈরি হলেও যুক্তরাষ্ট্র সেই ব্যর্থতাকে পুরোপুরি স্বীকার করতে পারেনি।

এই সময় থেকেই রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বেড়ে যায় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা শক্তিশালী হয়।

ইরান যুদ্ধ: বাস্তবতার মুখোমুখি

ইরানকে ঘিরে বর্তমান সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের সেই পুরনো বিশ্বাসের বড় পরীক্ষা। ভৌগোলিক বাস্তবতা, জ্বালানি পথের নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সম্ভাবনা যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে ফেলেছে।

বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকার কারণে এই যুদ্ধের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও পড়ছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, সুদের হার বাড়া এবং বাজার অস্থিরতা দেখিয়ে দিচ্ছে—দূরের যুদ্ধও আর দূরে থাকে না।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ তিনদিন পার হলেও কোন দিকে  যাচ্ছে এখনও স্পষ্ট নয় - BBC News বাংলা

ভেঙে পড়ছে ‘অপরাজেয়’ ধারণা

ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি আরও স্পষ্টভাবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্র ও ব্যক্তির সীমারেখা ঝাপসা হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবতা দেখাচ্ছে, কোনো দেশই এককভাবে বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।

ইরান যুদ্ধ সেই সত্যকে সামনে এনেছে—যুক্তরাষ্ট্রও বিশ্ব ব্যবস্থার একটি অংশ মাত্র, তার বাইরে নয়।

সামনে কী

এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় শিক্ষা হতে পারে। দীর্ঘদিনের ভ্রান্ত ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পথে হাঁটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশ্ব এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আন্তঃসংযুক্ত। এখানে একক আধিপত্য নয়, বরং পারস্পরিক নির্ভরতা ও বাস্তবতার স্বীকৃতিই ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণ করবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সরবরাহ সংকটের পরও কেন ১০০ ডলার ছাড়াচ্ছে না তেলের দাম?

আমেরিকার সর্বশক্তিমান ভ্রম ভাঙছে ইরান যুদ্ধের বাস্তবতায়

১১:০১:৩৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬

বিশ্ব রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে দেখে আসা যুক্তরাষ্ট্র আজ এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। ইরানকে কেন্দ্র করে নতুন সংঘাত সেই পুরনো বিশ্বাসকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, নাকি এটি ছিল এক দীর্ঘদিনের ভ্রান্ত ধারণা?

ট্রাম্প না ইতিহাসের ধারাবাহিকতা

ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি দ্বৈত ধারণা কাজ করেছে। একদিকে অনেকে মনে করেন, তিনি ব্যতিক্রমী ও বিপজ্জনক একজন নেতা, যার সময় শেষ হলে গণতন্ত্র আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে। অন্যদিকে আরেকটি মত বলছে, ট্রাম্প আসলে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও মানসিক কাঠামোরই ফল, যেখানে দেশটি নিজেকে সবসময় সঠিক ও শ্রেষ্ঠ মনে করে।

এই দুই ধারণার মধ্যে দোলাচল চললেও ইরান যুদ্ধ সেই বিভাজনকে ভেঙে দিয়েছে। এটি যেমন ট্রাম্পের ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তের ফল, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক ও রাজনৈতিক মনোভাবেরও পরিণতি।

Trump's New Term: US Public Split on Whether Changes Will Be Good, Bad |  Pew Research Center

সর্বশক্তিমান ধারণার শিকড়

বিশ শতকের মাঝামাঝি থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি বিশ্বাস তৈরি হয়—তারা যা করবে, তা সফল হবেই। ব্যর্থতা হলে সেটি নিজেদের ভুল নয়, বরং বিশ্বাসঘাতকতা বা অন্য কারও কারণে হয়েছে বলে মনে করা হয়।

শীতল যুদ্ধ, চীন ইস্যু, ভিয়েতনাম যুদ্ধ কিংবা পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যে হস্তক্ষেপ—সব ক্ষেত্রেই একই মনোভাব দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে বিশ্ব নিয়ন্ত্রক হিসেবে কল্পনা করেছে, যেখানে অন্য দেশগুলো কেবল সেই পরিকল্পনার অংশ।

Opinion: America does not know how to exist in a world it does not control

সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের শিক্ষা

২০০১ সালের হামলার পর আফগানিস্তান ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ এই ধারণাকে আরও স্পষ্ট করে। দ্রুত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা বাস্তবে ব্যর্থ হয়। দীর্ঘ যুদ্ধ, হাজারো প্রাণহানি এবং অস্থিতিশীলতা তৈরি হলেও যুক্তরাষ্ট্র সেই ব্যর্থতাকে পুরোপুরি স্বীকার করতে পারেনি।

এই সময় থেকেই রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বেড়ে যায় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা শক্তিশালী হয়।

ইরান যুদ্ধ: বাস্তবতার মুখোমুখি

ইরানকে ঘিরে বর্তমান সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের সেই পুরনো বিশ্বাসের বড় পরীক্ষা। ভৌগোলিক বাস্তবতা, জ্বালানি পথের নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সম্ভাবনা যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে ফেলেছে।

বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকার কারণে এই যুদ্ধের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও পড়ছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, সুদের হার বাড়া এবং বাজার অস্থিরতা দেখিয়ে দিচ্ছে—দূরের যুদ্ধও আর দূরে থাকে না।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ তিনদিন পার হলেও কোন দিকে  যাচ্ছে এখনও স্পষ্ট নয় - BBC News বাংলা

ভেঙে পড়ছে ‘অপরাজেয়’ ধারণা

ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি আরও স্পষ্টভাবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্র ও ব্যক্তির সীমারেখা ঝাপসা হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবতা দেখাচ্ছে, কোনো দেশই এককভাবে বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।

ইরান যুদ্ধ সেই সত্যকে সামনে এনেছে—যুক্তরাষ্ট্রও বিশ্ব ব্যবস্থার একটি অংশ মাত্র, তার বাইরে নয়।

সামনে কী

এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় শিক্ষা হতে পারে। দীর্ঘদিনের ভ্রান্ত ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পথে হাঁটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশ্ব এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আন্তঃসংযুক্ত। এখানে একক আধিপত্য নয়, বরং পারস্পরিক নির্ভরতা ও বাস্তবতার স্বীকৃতিই ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণ করবে।