অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ আরও দ্রুত হচ্ছে। ছোট কৃষিখামার, পশুপালন, পূর্বনির্মিত ঘর, রাস্তা ও বেড়া নির্মাণের মাধ্যমে একের পর এক নতুন বসতি গড়ে উঠছে। এই কার্যক্রমের অন্যতম আলোচিত মুখ হয়ে উঠেছেন ইসরায়েলি দুই ভাই ইলিয়াভ লিবি ও হারেল ‘কোকো’ লিবি।
তাদের মালিকানাধীন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকায় বসতি স্থাপনের জন্য পূর্বনির্মিত ঘর তৈরি করছে। একই সঙ্গে সরকারি অনুমোদন, কৃষি অনুদান, পশু চরানোর অনুমতি এবং রাজনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ে যোগাযোগের তথ্যও সামনে এসেছে।
ছোট খামার থেকেই বড় বসতি
পশ্চিম তীরের শিলো এলাকায় লিবি পরিবারের শিল্পপ্রাঙ্গণে একাধিক গুদাম, নির্মাণসামগ্রী এবং সারি সারি পূর্বনির্মিত ঘর রয়েছে। সেখানে নতুন কারখানার নির্মাণও চলছে। এই কারখানায় আরও দ্রুত বসতি স্থাপনের উপযোগী ঘর তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পশ্চিম তীরে নতুন বসতি তৈরির কৌশলটি অনেক ক্ষেত্রেই বেশ সরল। একটি বা দুটি পূর্বনির্মিত ঘর দিয়ে শুরু হয় একটি ছোট কৃষিখামার। এরপর সেখানে তরুণ ইসরায়েলি পশুপালকেরা গবাদিপশু নিয়ে আসে। ধীরে ধীরে তৈরি হয় রাস্তা, বেড়া ও অন্যান্য অবকাঠামো। এর মাধ্যমে বিস্তৃত জমির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সহজ হয়।
তিন বছরে ১৮৪ অননুমোদিত বসতি
ইসরায়েলি বসতি পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন পিস নাওয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পশ্চিম তীরে ১৮৪টি অননুমোদিত বসতি তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ২০২৫ সালেই গড়ে উঠেছে ৮৬টি।
পশ্চিম তীরে এ ধরনের মোট বসতির সংখ্যা এখন প্রায় ৪১০ বলে সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকদের হিসাব। স্যাটেলাইট ছবি ও সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে এসব বসতির একটি অংশের অস্তিত্বও যাচাই করা হয়েছে।
তদন্তে দেখা গেছে, লিবি ভাইয়েরা অন্তত নয়টি নতুন কৃষিভিত্তিক বসতি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত।
ঘিরে যাচ্ছে শত বছরের পুরোনো ডুমা
লিবি ভাইদের কার্যক্রমের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ফিলিস্তিনি গ্রাম ডুমায়। শত বছরেরও বেশি পুরোনো এই গ্রামটি এখন বিভিন্ন ইসরায়েলি বসতিতে ঘেরা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নতুন বসতি গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তাদের চারণভূমি, পানির উৎস এবং চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে আসছে।
ডুমা গ্রামের পরিষদপ্রধান সুলেইমান দাওয়াবশেহ অভিযোগ করেছেন, বসতি সম্প্রসারণের ফলে স্থানীয়দের মধ্যে ভয় তৈরি হয়েছে এবং তাদের জমি ছেড়ে যেতে চাপ দেওয়া হচ্ছে।
বাড়ছে বাস্তুচ্যুতি
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বসতি সম্প্রসারণের আশপাশের এলাকা থেকে শত শত ফিলিস্তিনি পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
২০২২ সাল থেকে লিবি ভাইদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বসতিগুলোর আশপাশের এলাকা থেকে অন্তত ৪৩৪ জন মানুষ চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন বলে একটি ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠনের তথ্যের ভিত্তিতে হিসাব করা হয়েছে। তাদের বড় অংশই যাযাবর বা আধা-যাযাবর পশুপালক।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তাদের ওপর নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। বাড়ির আশপাশে গবাদিপশু ছেড়ে দেওয়া, পানির ও বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, উচ্চ শব্দে বিরক্ত করা এবং ভয় দেখানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে বলে তারা জানিয়েছেন।
সহিংসতার অভিযোগ
পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের পাশাপাশি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার ঘটনাও বেড়েছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় অন্তত ১৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ২৩ এবং আহতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে।
জাতিসংঘের একটি তদন্তে ইসরায়েলি সেনাদের বিরুদ্ধে বসতি স্থাপনকারীদের হামলার সময় তাদের সুরক্ষা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
তবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, অননুমোদিত বসতিগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনারা সমন্বয় করে থাকে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনি মানুষ বা তাদের সম্পত্তির ওপর হামলা ঠেকানোও সেনাদের দায়িত্ব বলে জানিয়েছে তারা।
সরকারি সহায়তার অভিযোগ
লিবি পরিবারের কার্যক্রমে সরকারি সহায়তার বিষয়টিও তদন্তে উঠে এসেছে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, তাদের প্রতিষ্ঠানকে কারখানা নির্মাণের অনুমতি, পশু চরানোর অনুমোদন এবং কৃষি খাতে অর্থসহায়তা দেওয়া হয়েছে। কয়েক বছরে তাদের প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট বসতিগুলোকে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে কয়েক লাখ শেকেল সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এমন একটি সংগঠনও সরকারি অর্থ পেয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় লিবিদের প্রতিষ্ঠানকে গাজায় ধ্বংসযজ্ঞের কাজে ভারী যন্ত্রপাতি ও চালক সরবরাহের জন্য নিয়োগ করেছিল বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।
গাজায় ছেলের মৃত্যু, এরপর আরও দ্রুত বসতি সম্প্রসারণ
লিবি পরিবারের কার্যক্রমের সঙ্গে গাজা যুদ্ধেরও যোগসূত্র রয়েছে।
ইলিয়াভ লিবি জানিয়েছেন, গাজায় ফিলিস্তিনি বাড়িঘর ধ্বংসের কাজে তার প্রতিষ্ঠান সেনাবাহিনীকে খননযন্ত্র, বুলডোজার ও চালক সরবরাহ করেছিল।
২০২৫ সালের ২৯ মে ভারী যন্ত্রপাতি পরিচালনার সময় বিস্ফোরণে তার ১৯ বছর বয়সী ছেলে ডেভিড লিবি নিহত হন। পরে ইলিয়াভ জানান, ছেলের মৃত্যুর পর তিনি পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের কাজ আরও দ্রুত করেন।
পশ্চিম তীরে ‘বাস্তব নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা?
ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিকদের একটি অংশ পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা ঠেকাতে বসতি সম্প্রসারণকে কৌশল হিসেবে দেখছে।
সরাসরি পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত না হলেও নতুন বসতি, কৃষিখামার, সড়ক ও অবকাঠামোর মাধ্যমে ধীরে ধীরে সেখানে বাস্তব নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ রয়েছে।
ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ পশ্চিম তীরে ‘বাস্তব সার্বভৌমত্ব’ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা মনে করেন, এই প্রক্রিয়া কার্যত পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করার পথ তৈরি করছে।
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা
লিবি ভাইদের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, নরওয়ে ও যুক্তরাজ্য নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে জমি দখল এবং ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও বাস্তুচ্যুতিতে সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছে।
এর আগে যুক্তরাজ্য হারেল লিবির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং তার প্রতিষ্ঠিত একটি বসতির সম্পদ জব্দের ব্যবস্থা নেয়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে। জো বাইডেন প্রশাসনের সময় কট্টরপন্থী ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলেও ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় ফিরে তা বাতিল করেন।
বদলে যাচ্ছে পশ্চিম তীরের মানচিত্র
লিবি ভাইদের কর্মকাণ্ড পশ্চিম তীরে দ্রুত বদলে যাওয়া বাস্তবতার একটি চিত্র তুলে ধরেছে। বড় শহর বা পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা তৈরির পরিবর্তে ছোট কৃষিখামার ও কয়েকটি ঘর দিয়ে শুরু হচ্ছে নতুন বসতি। পরে সেখানে যুক্ত হচ্ছে রাস্তা, বেড়া, পশুপালন ও অন্যান্য অবকাঠামো।
ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি এলাকাগুলোর মধ্যে ভৌগোলিক যোগাযোগ আরও দুর্বল হবে। ফলে ভবিষ্যতে একটি স্বাধীন ও সংলগ্ন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাও কঠিন হয়ে পড়বে।
পশ্চিম তীরে এখন তাই শুধু বসতি বাড়ছে না, বদলে যাচ্ছে জমির নিয়ন্ত্রণ, মানুষের বসবাসের ধরন এবং সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের ভৌগোলিক চিত্রও।
পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দুই ইসরায়েলি ভাইয়ের কার্যক্রম, সরকারি সহায়তা ও ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতির অভিযোগ এই সংকটকে আরও গভীর করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















