যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিমান বিক্রি করতে হলে দেশটির মাটিতেই উৎপাদন করতে হবে—কানাডার বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোম্বার্ডিয়ারকে এমন কঠোর শর্ত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন শুরু না করলে বোম্বার্ডিয়ারের উড়োজাহাজ আর মার্কিন বাজারে বিক্রি করতে দেওয়া হবে না।
ট্রাম্প সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বোম্বার্ডিয়ারের উড়োজাহাজের মান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি যদি যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ধরে রাখতে চায়, তাহলে তাদের যুক্তরাষ্ট্রেই উৎপাদন করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রই বোম্বার্ডিয়ারের বড় বাজার
ট্রাম্পের এই অবস্থান এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্যিক উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। কানাডা আগামী মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের নতুন পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে।
বোম্বার্ডিয়ারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাজার। প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকদের পরিচালিত প্রায় ৫ হাজার ১০০টি উড়োজাহাজের অর্ধেকই যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছে। ফলে মার্কিন বাজারে প্রবেশাধিকার হারানোর আশঙ্কা প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে বাস্তবে ট্রাম্পের ঘোষণাটি কীভাবে কার্যকর করা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বোম্বার্ডিয়ারের উড়োজাহাজগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের অনুমোদনপ্রাপ্ত। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্য চুক্তির সঙ্গেও প্রতিষ্ঠানটির উড়োজাহাজগুলো সামঞ্জস্যপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রেও বড় বিনিয়োগ বোম্বার্ডিয়ারের
বোম্বার্ডিয়ার অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রে একেবারে অনুপস্থিত কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। দেশটিতে তাদের প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কর্মী রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২ হাজার ৮০০ সরবরাহকারী কাজ করে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা ও সেবা কেন্দ্র পরিচালনা করে বোম্বার্ডিয়ার। টেক্সাসে তাদের সবচেয়ে উন্নত ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ গ্লোবাল ৮০০০-এর ডানা তৈরি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের ষষ্ঠ সেবা কেন্দ্র চালুর কাজও এগিয়ে চলছে।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, প্রতিবছর তারা যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহকারীদের কাছ থেকে ২৫০ কোটি ডলারের বেশি পণ্য ও সেবা কেনে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির সঙ্গেও বোম্বার্ডিয়ারের ব্যবসা গভীরভাবে যুক্ত।
ট্রাম্পের হুমকি কতটা কার্যকর হবে?
মার্কিন বিমান চলাচল খাতের বিশ্লেষক রিচার্ড আবুলাফিয়া মনে করেন, ট্রাম্পের হুমকির কারণে বোম্বার্ডিয়ারের গ্রাহকেরা সহজে তাদের ক্রয়াদেশ বাতিল করবেন না। এমনকি বাস্তবে বোম্বার্ডিয়ারের উড়োজাহাজ যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি বন্ধ করা কতটা সম্ভব, তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।
এর একটি বড় কারণ হলো বোম্বার্ডিয়ারের ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে ব্যবহৃত অনেক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশই যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি। প্রতিষ্ঠানটির অধিকাংশ ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে ব্যবহৃত ইঞ্জিন তৈরি করে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো।
অর্থাৎ কানাডায় তৈরি একটি উড়োজাহাজের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পখাতের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। ফলে বোম্বার্ডিয়ারকে লক্ষ্য করে কঠোর বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নিলে এর প্রভাব মার্কিন সরবরাহকারী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও পড়তে পারে।
এর আগেও বোম্বার্ডিয়ারকে চাপ দিয়েছিলেন ট্রাম্প
বোম্বার্ডিয়ারকে ঘিরে ট্রাম্পের সঙ্গে বিরোধ অবশ্য নতুন নয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনি বোম্বার্ডিয়ারের গ্লোবাল এক্সপ্রেস ব্যক্তিগত উড়োজাহাজের অনুমোদন বাতিলের কথা জানিয়েছিলেন এবং কানাডায় তৈরি সব উড়োজাহাজের ওপর ৫০ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন।
তবে সেই পদক্ষেপগুলো শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। পরবর্তী সময়ে কানাডা কয়েকটি মার্কিন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের তৈরি উড়োজাহাজের অনুমোদন দেয়।
এবার নতুন করে ট্রাম্পের হুমকি যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্য সম্পর্কের উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে বিমান নির্মাণের মতো আন্তঃনির্ভরশীল একটি শিল্পে এমন সিদ্ধান্ত শুধু একটি কানাডীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর নয়, দুই দেশের সরবরাহব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
বোম্বার্ডিয়ারের ব্যবসায় এখনো চাহিদা শক্তিশালী
বাণিজ্যিক চাপের মধ্যেও বোম্বার্ডিয়ারের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের দুর্বলতার লক্ষণ দেখা যায়নি। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটির আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ শতাংশ বেড়ে ২১৫ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
বিশেষ করে উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরবর্তী সেবা খাতে শক্তিশালী চাহিদা প্রতিষ্ঠানটির আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় সামনে বোম্বার্ডিয়ারকে একই সঙ্গে ব্যবসা, উৎপাদন ও কূটনৈতিক চাপ—তিন দিকই সামলাতে হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















