যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের কারাগারে যাবজ্জীবন সাজা ভোগ করছেন দুই বন্দি। গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত এই দুই ব্যক্তি কারাগারে থেকেই আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করেছেন। এখন তাঁদের সামনে নতুন পরীক্ষা—আইনজীবী হওয়ার জন্য বার পরীক্ষায় বসা এবং পেশাগত সনদ পাওয়ার লড়াই।
কারাগারে বসে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ যুক্তরাষ্ট্রে একেবারে নতুন নয়। তবে মিনেসোটার এই উদ্যোগকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। কারণ, এখানকার দুই শিক্ষার্থী এমন একটি আইন বিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি পেয়েছেন, যা আমেরিকান বার অ্যাসোসিয়েশনের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। সংশ্লিষ্টদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে কারাগারে থাকা ব্যক্তিদের জন্য এ ধরনের স্বীকৃত আইন ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি প্রথম উদ্যোগ।
কারাগারের পোস্টকার্ড থেকেই শুরু
২০২২ সালে মিনেসোটার একটি কারাগারে একটি পোস্টকার্ড ঘুরছিল। সেখানে জানানো হয়েছিল, বন্দিদের জন্য নতুন একটি কর্মসূচি চালু হচ্ছে। এর মাধ্যমে কারাগারে থেকেই অনলাইনে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করে ডিগ্রি অর্জন করা যাবে।
পোস্টকার্ডটি পৌঁছে যায় ৪৮ বছর বয়সী জেফেরি ইয়ংয়ের কাছে। ২০০৪ সাল থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন। ২০০২ সালে নিজের এক আত্মীয়ের ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত এক ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনায় তিনি দণ্ডিত হন।
ইয়ং কর্মসূচিতে আবেদন করেন এবং নির্বাচিত হন। চলতি বছরের জুনে তিনি ও মরিন ওনিয়েলোবি এই কর্মসূচির প্রথম দুই স্নাতক হিসেবে আইন ডিগ্রি অর্জন করেন।
ইয়ং আগে নিজের মামলার আপিলের সময় আদালতে জমা দেওয়ার জন্য আইনি নথি নিজেই প্রস্তুত করেছিলেন। তাঁর ভাষ্য, আইন বিষয়ে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ তাঁকে নিজের আইনি দক্ষতা আরও বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে প্যারোলে মুক্তির আবেদনের ক্ষেত্রেও প্রস্তুত হতে সাহায্য করেছে।
চার বছর ধরে কারাগারেই আইন পড়া
ইয়ং ও ওনিয়েলোবি চার বছর ধরে অনলাইনে আইন বিষয়ে ক্লাস করেছেন। কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতো তাঁদের পড়াশোনার পরিবেশ ছিল না।
কারাগারের নিরাপত্তা বিধিনিষেধ, প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা এবং বিভিন্ন সময় কারাগারে চলা নিরাপত্তাজনিত বিধিনিষেধের কারণে তাঁদের অনেক ক্লাসে সমস্যা হয়েছে। কখনো কখনো কারাগারে তালাবদ্ধ অবস্থার কারণে ক্লাসও মিস করতে হয়েছে।
ইয়ং বলেন, প্রায় ২৫০ বন্দির একটি ব্যস্ত কারা ভবনে বসে পড়াশোনা করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। চারপাশের শব্দের মধ্যে মনোযোগ ধরে রাখা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে ওনিয়েলোবির কাছে সবচেয়ে কঠিন ছিল এই কর্মসূচির প্রথম শিক্ষার্থী হিসেবে নানা ধরনের প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত সমস্যার মধ্য দিয়ে পথ তৈরি করা।
তবু দুজনই তাঁদের পড়াশোনা শেষ করেছেন। ওনিয়েলোবি কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক হয়েছেন, আর ইয়ং পেয়েছেন সর্বোচ্চ কৃতিত্বের স্বীকৃতি।
এবার সামনে বার পরীক্ষা
আইন ডিগ্রি অর্জন করাই তাঁদের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। এখন তাঁরা আইনজীবী হিসেবে পেশাগত অনুমোদন পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
কর্মসূচিটির আয়োজক প্রতিষ্ঠান তাঁদের আগামী ফেব্রুয়ারিতে দুই দিনব্যাপী বার পরীক্ষায় বসার অনুমতি পাওয়ার জন্য কাজ করছে। তবে এর জন্য তাঁদের কারাগার থেকে বের হয়ে নির্ধারিত পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতে হবে।
বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও তাঁদের সামনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ থাকবে। আইনজীবী হিসেবে কাজ করার যোগ্যতা যাচাইয়ে তাঁদের চরিত্র ও পেশাগত উপযুক্ততা নিয়ে আলাদা পর্যালোচনা হবে।
মিনেসোটায় অপরাধের জন্য দণ্ডিত হওয়া মানেই আইনজীবী হওয়ার সুযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায় না। তবে হত্যার মতো গুরুতর অপরাধের কারণে তাঁদের ক্ষেত্রে এই যাচাই অত্যন্ত কঠিন হতে পারে।
অতীতের অপরাধই সবচেয়ে বড় বাধা
আইন বিষয়ে স্নাতক হওয়ার পর এখন তাঁদের সবচেয়ে বড় লড়াই অতীতের অপরাধের সঙ্গে। ইয়ংয়ের মামলার সঙ্গে যুক্ত এক সরকারি আইন কর্মকর্তা তাঁর আইনজীবী হিসেবে অনুমোদন পাওয়ার সম্ভাবনাকে তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তাঁর অভিযোগ, নিজের দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল করার মাধ্যমে ইয়ং তাঁর কর্মকাণ্ডের দায় পুরোপুরি স্বীকার করেননি। তিনি আরও বলেন, ইয়ংয়ের আইনজীবী হিসেবে কাজ করার অনুমোদন দেওয়ার পক্ষে তাঁর কার্যালয় কখনো অবস্থান নেবে না।
তবে আইন পেশায় দণ্ডিত ব্যক্তিদের প্রবেশের নজির যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার আইনজীবী ও অপরাধবিচারবিষয়ক অধ্যাপক জেমস বিনল নিজেও কারাগারে সময় কাটানোর পর আইন বিষয়ে পড়াশোনা করে পরবর্তীতে আইনজীবী ও শিক্ষক হয়েছেন।
তাঁর মতে, শুধু অতীতের অপরাধের কারণে কাউকে আইন পেশা থেকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া হলে সমাজ একজন সম্ভাবনাময় দক্ষ মানুষকে হারাতে পারে। অপরাধের পর একজন মানুষ কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছেন, পুনর্বাসনের প্রমাণ কী এবং সমাজের জন্য তিনি কীভাবে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেন—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
আইনজ্ঞান দিয়ে অতীতের প্রায়শ্চিত্ত
মিনেসোটার কারা কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারাও কর্মসূচিটির পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তাঁদের ধারণা, কারাগারে থাকা ব্যক্তিরা আইন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করে ভবিষ্যতে অন্যদের আইনি সহায়তা করতে পারলে সেটি তাঁদের অতীত কর্মকাণ্ডের প্রায়শ্চিত্তের একটি পথ হতে পারে।
এই কর্মসূচির আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল কারাগারে থাকা শিক্ষার্থীদের সরাসরি নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে যুক্ত করা। আগে থেকে ধারণ করা পাঠের বদলে সরাসরি অনলাইন ক্লাসে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে তাঁরা অন্যান্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একই শিক্ষাব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছেন। এর ফলে কারাগারে থাকা মানুষদের সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাও বদলাতে পারে বলে আয়োজকদের আশা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















