যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য বিরোধ আরও তীব্র করল কানাডা। যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা শুল্কের জবাবে মঙ্গলবার মধ্যরাতের পর থেকে মার্কিন পণ্যের ওপর নতুন করে পাল্টা শুল্ক কার্যকর করেছে কানাডা। এর ফলে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বাণিজ্য সংঘাত আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কানাডার নতুন পাল্টা শুল্কের আওতায় পড়েছে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্য। পণ্যভেদে শুল্কের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। ইস্পাত, আসবাবপত্র, পোশাক, বৈদ্যুতিক পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যে এই শুল্ক কার্যকর হয়েছে।
আলোচনার টেবিল থেকে আরও দূরে দুই দেশ
কানাডার এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা কার্যত থমকে আছে। গত মাসে দুই দেশের আলোচনায় সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এর আগে জানিয়েছিলেন, দুই দেশের জন্যই লাভজনক একটি বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছাতে তার সরকার প্রস্তুত। তবে বর্তমানে দুই দেশের মন্ত্রী বা সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে না বলে কানাডার একটি সরকারি সূত্র জানিয়েছে।
কানাডার পাল্টা শুল্ককে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের জবাব হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে ‘শুল্কের পাল্টা শুল্ক’ পরিস্থিতি আরও জটিল আকার নিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কেও চাপে কানাডা
গত মাসে কানাডার বিভিন্ন পণ্যের ওপর প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এর আওতায় পড়ে কানাডার মদ, আসবাবপত্র, দুগ্ধজাত পণ্য, সিমেন্ট, পোশাক, মাছ ধরার সরঞ্জাম এবং বরফের খেলাধুলার সরঞ্জামসহ বিভিন্ন পণ্য।
চলতি বছরে কানাডার মোট রপ্তানির প্রায় ৬৮ শতাংশই গেছে যুক্তরাষ্ট্রে। এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ পণ্য উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়েছে।
তবে নতুন মার্কিন শুল্কে সেই চুক্তির সুরক্ষা সব ক্ষেত্রে কার্যকর হচ্ছে না। ফলে কানাডার অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক পরিবেশ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
বড় অর্থনীতির সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে উদ্বেগ
কানাডার অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক ছোট। ফলে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য সংঘাতে কানাডার ওপর চাপ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা।
কানাডার কৃষি ও খাদ্যপণ্য বাণিজ্য খাতের প্রতিনিধিরা সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করছেন সম্ভাব্য পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ নিয়ে। তাদের আশঙ্কা, একবার শুল্ক বাড়ানোর চক্র শুরু হলে তা দ্রুত আরও বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
তবে একই সঙ্গে কানাডা সরকারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরির মতো কিছু সুবিধা বা দর-কষাকষির সুযোগ তৈরি করাও জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে।
গাড়ি শিল্পেও বাড়ছে ঝুঁকি
বাণিজ্য বিরোধের সবচেয়ে বড় ঝুঁকির একটি হতে পারে কানাডার গাড়ি শিল্প। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত মাসে হুমকি দিয়েছিলেন, কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া সব গাড়ি, ট্রাক ও গাড়ির যন্ত্রাংশের ওপর আগামী বছরের ১ জানুয়ারি থেকে শুল্কের হার ৫০ শতাংশে উন্নীত করা হতে পারে।
এমন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে দুই দেশের গভীরভাবে সংযুক্ত গাড়ি উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে বিদ্যমান উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। চুক্তিটির নিয়মিত পর্যালোচনা সামনে থাকায় বর্তমান শুল্ক সংঘাত এর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন দীর্ঘস্থায়ী হলে বিনিয়োগকারীরা নতুন কারখানা স্থাপন, উৎপাদন সম্প্রসারণ কিংবা সরবরাহব্যবস্থা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হয়ে উঠতে পারেন।
রাজনৈতিক চাপও বাড়তে পারে
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কারণে দেশের ভেতরে ব্যাপক সমর্থন পাচ্ছেন। তবে বাণিজ্যযুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবন ও ব্যবসায় স্পষ্ট হয়ে উঠলে সেই সমর্থন দ্রুত কমে যেতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রেও ট্রাম্পের কানাডাবিরোধী শুল্কনীতির প্রতি জনসমর্থন খুব শক্তিশালী নয়। সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে মাত্র ২০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক কানাডীয় পণ্যের ওপর ট্রাম্পের নতুন শুল্ককে সমর্থন করেছেন।
সব মিলিয়ে, কানাডার পাল্টা শুল্ক দুই দেশের বাণিজ্য বিরোধকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—দুই দেশ কি আবার আলোচনার টেবিলে ফিরবে, নাকি পাল্টাপাল্টি শুল্কের মাধ্যমে সংঘাত আরও দীর্ঘ হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















