০৮:৪১ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হিমালয় বদলে গেছে, এবার নেপালকেও বদলাতে হবে দেরিতে ফুটলেও ফুল ফোটে: শেখার কোনো বয়স নেই বিরামপুর সীমান্তে ১২ থেকে ১৫ জনকে পুশইনের চেষ্টা, বিজিবি-গ্রামবাসীর বাধায় পিছু হটল বিএসএফ নতুন ছাঁটে চমকে দিলেন কনর স্টোরি, ক্রিয়েটিভ আর্টস এমিসে আত্মপ্রকাশ ‘বাজকাট’ লুকে জঙ্গলে মিলল নিখোঁজ যুবকের কঙ্কাল, পোশাক দেখে শনাক্ত করলেন বাবা কৃষিকে বদলে দিতে বিশ্বব্যাংকের ‘এগ্রিকানেক্ট’, লক্ষ্য ৩০ কোটি ক্ষুদ্র কৃষক সাইফুর রহমানের মৃত্যু দুর্ঘটনা নাকি ষড়যন্ত্র, তদন্ত চান রিজভী শরতের ফ্যাশনে জেন বারকিনের পুরোনো ছবিই আজকের নতুন অনুপ্রেরণা শরতের সাজে সুয়েড জ্যাকেট, ৬ দারুণ স্টাইলিং আইডিয়া সিয়ারা মা হচ্ছেন পঞ্চমবার, রাসেল উইলসনের সঙ্গে আসছে নতুন অতিথি

গাজীপুরে শত কোটি টাকার স্টেশন, থামে দিনে মাত্র একটি ট্রেন—অচল অবকাঠামোর করুণ চিত্র 

গাজীপুরের হাইটেক সিটি পার্ক রেলস্টেশন—দৃষ্টিনন্দন নকশা, আধুনিক সুবিধা আর বিলাসবহুল অবকাঠামো—সব মিলিয়ে এটি উন্নত বিশ্বের কোনো স্টেশনের মতোই মনে হয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন। প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই স্টেশনটি এখন কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

পরিকল্পনা আর বাস্তবতার ফারাক

২০১৯ সালে চালু হওয়া এই স্টেশনটির লক্ষ্য ছিল প্রতিদিন গাজীপুর, টঙ্গী, সাভার শিল্পাঞ্চল এবং উত্তরবঙ্গের প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার যাত্রী পরিবহন করা। কিন্তু বাস্তবে সেখানে যাত্রী থাকলেও ট্রেন থামে না। ফলে স্টেশনটি ব্যবহারহীন হয়ে পড়েছে।

যাত্রীরা জানাচ্ছেন, টিকিট কাউন্টার প্রায়ই বন্ধ থাকে। কেউ টিকিট কাটতে এসে ফিরে যাচ্ছেন হতাশ হয়ে। যাত্রী উপস্থিত থাকলেও ট্রেন না থামায় পুরো ব্যবস্থাটিই অচল হয়ে গেছে।

দিনে মাত্র একটি ট্রেন, সীমিত টিকিট

গাজীপুরে শত কোটি টাকায় বানানো স্টেশনে থামে মাত্র ...

স্থানীয়দের অভিযোগ, সারাদিনে মাত্র একটি ট্রেন স্টেশনে থামে এবং তাতেও টিকিট বরাদ্দ থাকে মাত্র ২২টি। ফলে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও স্টেশনটি কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।

এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, স্টেশনটি এখন অনেকটা বিনোদনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিকেলের দিকে মানুষ এখানে ভিড় করেন, অনেকে ভিডিও তৈরি করেন। কিন্তু যাত্রীসেবার উদ্দেশ্যটি একেবারেই অনুপস্থিত।

অব্যবহৃত আধুনিক সুবিধা

স্টেশনটিতে আধুনিক টিকিট কাউন্টার, ভিআইপি বিশ্রামাগার, উন্নত সিগন্যাল কক্ষ ও রিলে রুম রয়েছে। কিন্তু এসব এখন ব্যবহার না হওয়ায় অবহেলায় পড়ে আছে। এমনকি কিছু স্থানে রেলকর্মীরাই বসবাস করছেন।

দায়িত্বশীলদের তথ্য অনুযায়ী, স্টেশনটির মাসিক পরিচালন ব্যয় প্রায় ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা হলেও কোনো আয় নেই। যন্ত্রপাতি সচল থাকলেও ট্রেন না থামায় সেগুলো কার্যত নিষ্ক্রিয়।

অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্টেশনটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না হওয়ার পেছনে অবকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। ঢাকা অভিমুখী প্ল্যাটফর্মের পাশে একটি লেভেল ক্রসিং গেট এবং টাঙ্গাইল প্রান্তে একটি ছোট ব্রিজ থাকার কারণে প্রয়োজনীয় ক্লিয়ারিং স্ট্যান্ডিং লেংথ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে নিয়মিত ট্রেন থামানো যাচ্ছে না।

৫২ কোটি টাকার স্টেশন কিন্তু ট্রেন থামে দিনে মাত্র একটি

রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের প্রশ্ন

বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন প্রকল্প রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা বলছেন, কেন এমন পরিকল্পনা করা হলো এবং কোথায় ভুল হয়েছে—তা দ্রুত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

যোগাযোগ খাতের বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বিভিন্ন স্থানে গুরুত্বপূর্ণ অনেক স্টেশন বন্ধ পড়ে থাকলেও সেগুলো সংস্কার না করে এ ধরনের বিলাসবহুল কিন্তু অচল অবকাঠামো নির্মাণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।

রেলখাতে দীর্ঘমেয়াদি সংকট

বঙ্গবন্ধু হাই-টেক সিটি রেল স্টেশন: ৩৮ ট্রেনের মধ্যে থামছে মাত্র একটি,  ভোগান্তিতে হাজারো যাত্রী | The Business Standard

গত এক দশকের বেশি সময়ে শতাধিক লোকাল ও কমিউটার ট্রেন বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে দেশের বহু প্রয়োজনীয় স্টেশন বন্ধ রয়েছে। কিন্তু সেগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ না নিয়ে নতুন ব্যয়বহুল প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, যা বাস্তবে কাজে আসছে না।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এ ধরনের অপরিকল্পিত বিনিয়োগ চলতে থাকলে বাংলাদেশ রেলওয়ে আরও বড় আর্থিক সংকটে পড়তে পারে।

গাজীপুরের এই স্টেশনটি তাই শুধু একটি স্থাপনা নয়, বরং পরিকল্পনা ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের বিচ্ছিন্নতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

হিমালয় বদলে গেছে, এবার নেপালকেও বদলাতে হবে

গাজীপুরে শত কোটি টাকার স্টেশন, থামে দিনে মাত্র একটি ট্রেন—অচল অবকাঠামোর করুণ চিত্র 

১২:৪১:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬

গাজীপুরের হাইটেক সিটি পার্ক রেলস্টেশন—দৃষ্টিনন্দন নকশা, আধুনিক সুবিধা আর বিলাসবহুল অবকাঠামো—সব মিলিয়ে এটি উন্নত বিশ্বের কোনো স্টেশনের মতোই মনে হয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন। প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই স্টেশনটি এখন কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

পরিকল্পনা আর বাস্তবতার ফারাক

২০১৯ সালে চালু হওয়া এই স্টেশনটির লক্ষ্য ছিল প্রতিদিন গাজীপুর, টঙ্গী, সাভার শিল্পাঞ্চল এবং উত্তরবঙ্গের প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার যাত্রী পরিবহন করা। কিন্তু বাস্তবে সেখানে যাত্রী থাকলেও ট্রেন থামে না। ফলে স্টেশনটি ব্যবহারহীন হয়ে পড়েছে।

যাত্রীরা জানাচ্ছেন, টিকিট কাউন্টার প্রায়ই বন্ধ থাকে। কেউ টিকিট কাটতে এসে ফিরে যাচ্ছেন হতাশ হয়ে। যাত্রী উপস্থিত থাকলেও ট্রেন না থামায় পুরো ব্যবস্থাটিই অচল হয়ে গেছে।

দিনে মাত্র একটি ট্রেন, সীমিত টিকিট

গাজীপুরে শত কোটি টাকায় বানানো স্টেশনে থামে মাত্র ...

স্থানীয়দের অভিযোগ, সারাদিনে মাত্র একটি ট্রেন স্টেশনে থামে এবং তাতেও টিকিট বরাদ্দ থাকে মাত্র ২২টি। ফলে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও স্টেশনটি কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।

এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, স্টেশনটি এখন অনেকটা বিনোদনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিকেলের দিকে মানুষ এখানে ভিড় করেন, অনেকে ভিডিও তৈরি করেন। কিন্তু যাত্রীসেবার উদ্দেশ্যটি একেবারেই অনুপস্থিত।

অব্যবহৃত আধুনিক সুবিধা

স্টেশনটিতে আধুনিক টিকিট কাউন্টার, ভিআইপি বিশ্রামাগার, উন্নত সিগন্যাল কক্ষ ও রিলে রুম রয়েছে। কিন্তু এসব এখন ব্যবহার না হওয়ায় অবহেলায় পড়ে আছে। এমনকি কিছু স্থানে রেলকর্মীরাই বসবাস করছেন।

দায়িত্বশীলদের তথ্য অনুযায়ী, স্টেশনটির মাসিক পরিচালন ব্যয় প্রায় ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা হলেও কোনো আয় নেই। যন্ত্রপাতি সচল থাকলেও ট্রেন না থামায় সেগুলো কার্যত নিষ্ক্রিয়।

অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্টেশনটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না হওয়ার পেছনে অবকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। ঢাকা অভিমুখী প্ল্যাটফর্মের পাশে একটি লেভেল ক্রসিং গেট এবং টাঙ্গাইল প্রান্তে একটি ছোট ব্রিজ থাকার কারণে প্রয়োজনীয় ক্লিয়ারিং স্ট্যান্ডিং লেংথ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে নিয়মিত ট্রেন থামানো যাচ্ছে না।

৫২ কোটি টাকার স্টেশন কিন্তু ট্রেন থামে দিনে মাত্র একটি

রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের প্রশ্ন

বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন প্রকল্প রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা বলছেন, কেন এমন পরিকল্পনা করা হলো এবং কোথায় ভুল হয়েছে—তা দ্রুত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

যোগাযোগ খাতের বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বিভিন্ন স্থানে গুরুত্বপূর্ণ অনেক স্টেশন বন্ধ পড়ে থাকলেও সেগুলো সংস্কার না করে এ ধরনের বিলাসবহুল কিন্তু অচল অবকাঠামো নির্মাণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।

রেলখাতে দীর্ঘমেয়াদি সংকট

বঙ্গবন্ধু হাই-টেক সিটি রেল স্টেশন: ৩৮ ট্রেনের মধ্যে থামছে মাত্র একটি,  ভোগান্তিতে হাজারো যাত্রী | The Business Standard

গত এক দশকের বেশি সময়ে শতাধিক লোকাল ও কমিউটার ট্রেন বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে দেশের বহু প্রয়োজনীয় স্টেশন বন্ধ রয়েছে। কিন্তু সেগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ না নিয়ে নতুন ব্যয়বহুল প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, যা বাস্তবে কাজে আসছে না।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এ ধরনের অপরিকল্পিত বিনিয়োগ চলতে থাকলে বাংলাদেশ রেলওয়ে আরও বড় আর্থিক সংকটে পড়তে পারে।

গাজীপুরের এই স্টেশনটি তাই শুধু একটি স্থাপনা নয়, বরং পরিকল্পনা ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের বিচ্ছিন্নতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।