০৭:৩০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রপ্তানি বাড়ছে, অর্ডার কমছে—বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের মুনাফা যাচ্ছে কোথায়? ‘Belonging: A Journey of Love’: সোনিয়া গান্ধীর বহুল আলোচিত স্মৃতিকথা ১০ নভেম্বর ভারতে প্রকাশ সিলেটে প্রতিমন্ত্রীর অনুষ্ঠান বয়কট সাংবাদিকদের, বিএনপির বিরুদ্ধেও হয়রানির অভিযোগ বিএনপির মন্ত্রীদের মান্নার কড়া বার্তা: ‘সত্য বলুন, দম্ভ দেখাবেন না’ ভারী বৃষ্টিতে দিল্লি অচল, কনট প্লেস থেকে বিমানবন্দর পানির নিচে বিশ্বে খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ, বাড়ছে সরবরাহ ঝুঁকি বেলুচিস্তানে ৭২ ঘণ্টার অভিযানে ৪৮ ‘সন্ত্রাসী’ নিহত, দাবি পাকিস্তানের হৃদয় থেকে রান্না, স্বাস্থ্য থেকে মানুষের পাশে: উদ্ভিদভিত্তিক খাবারে বদলের গল্প চট্টগ্রামে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, ব্যবসায়ীকে ‘ছেলেমেয়ের লাশ ফেলে রাখার’ হুমকি ইসলামী ব্যাংকে এস আলম-সংশ্লিষ্ট ৮১.৯২ শতাংশ শেয়ার ফ্রিজের নির্দেশ হাইকোর্টের

জাপানের পারমাণবিক প্রত্যাবর্তন, বিদ্যুৎ চাহিদা আর ফুকুশিমার ক্ষত

জাপান আবার পারমাণবিক বিদ্যুতের পথে ফিরছে। পরিচ্ছন্ন শক্তির তীব্র চাহিদা আর ২০১১ সালের ফুকুশিমা বিপর্যয় স্মৃতি—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে দাঁড়িয়ে আজকের জাপান। পনেরো বছর আগের সেই ধ্বংসের অভিজ্ঞতা এখনও বহু মানুষের মনে দগদগে, অথচ বাড়তে থাকা বিদ্যুৎ প্রয়োজন সরকার ও বিদ্যুৎ সংস্থাগুলিকে ঠেলে দিচ্ছে পরমাণুর দিকেই।

ফুকুশিমা থেকে নিইগাতা, এক নারীর জীবনের গল্প
২০১১ সালে ফুকুশিমা দাইইচি বিদ্যুৎকেন্দ্রে তিনটি চুল্লি গলে যাওয়ার পর বাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়েছিল আয়াকো ওগাকে। তেজস্ক্রিয় ধুলোয় ঢেকে গিয়েছিল পূর্ব জাপানের বিস্তীর্ণ এলাকা। আয়াকো ওগার মতো এক লক্ষ ষাট হাজারের বেশি মানুষ দেশজুড়ে পুনর্বাসিত হন। তিনি আশ্রয় নেন জাপানের পশ্চিম উপকূলের শান্ত কৃষিভিত্তিক প্রদেশ নিইগাতায়। তখন সেখানকার পারমাণবিক কেন্দ্রও বন্ধ ছিল, আর বাতাসের গতিপথের কারণে এই অঞ্চল বড় বিপদের হাত থেকে বেঁচে যায়।

কৃষক আয়াকো ওগা মাটির তেজস্ক্রিয়তা পরীক্ষা করে দেখেন, তা দুর্যোগের আগের ফুকুশিমার মতোই স্বাভাবিক। ছোট এক খণ্ড জমিতে গাজর সহ নানা সবজি চাষ শুরু করেন। বাড়তি ফসল বিক্রি করেন রাস্তার ধারের বাজারে। তাঁর কণ্ঠে এখনও প্রশান্তি, এই জায়গাটা সুন্দর, আবার চাষবাসে ফিরতে পেরে তিনি সুখী।

পনেরো বছর পর বদলাচ্ছে জাপানের মনোভাব
৮ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প আর সুনামির ধাক্কায় ফুকুশিমা বিপর্যয়ের পনেরো বছর পর জাপানে সেই ভয়ের স্মৃতি ধীরে ধীরে ঝাপসা হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত তথ্যকেন্দ্র, আধুনিক কারখানা আর চব্বিশ ঘণ্টার বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে জাপান এখন কার্বনমুক্ত শক্তির দিকে ঝুঁকছে। সেই তালিকায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ আবার গুরুত্ব পাচ্ছে।

এই সপ্তাহে টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি কাশিওয়াজাকি কারিওয়া কমপ্লেক্সের ষষ্ঠ ইউনিট চালু করে। এটি বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোর একটি। তবে শুরুটা নির্বিঘ্ন হয়নি। পরীক্ষার সময় সুরক্ষা অ্যালার্ম না বাজায় একদিন দেরি হয়, চালু হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবার অ্যালার্ম বেজে চুল্লি বন্ধ করতে হয়। পরে সংস্থাটি জানায়, কেন্দ্র স্থিতিশীল রয়েছে এবং বাইরে কোনও তেজস্ক্রিয় প্রভাব নেই।

Kashiwazaki-Kariwa Nuclear Reactor Restarts after Delay; TEPCO Plans to  Begin Commercial Operation in February - The Japan News

শহরের জন্য বিদ্যুৎ, গ্রামের জন্য ঝুঁকি
কাশিওয়াজাকি কেন্দ্রটি আয়াকো ওগার বাড়ি থেকে প্রায় পঁয়ষট্টি কিলোমিটার দূরে। এই পুনরায় চালু হওয়া তাঁর মনে নতুন ভয় জাগিয়েছে। তাঁর কথায়, আবার প্রতিদিন সতর্কতার মধ্যে বাঁচতে হবে। তিনি স্বীকার করেন, ভয় পাচ্ছেন, তবু এখানেই তাঁর শিকড় গেড়েছে।

এই অনুভূতি জাপানের বহু গ্রামীণ এলাকার বাস্তবতা। শহরের জন্য বিদ্যুৎ যায়, অথচ ঝুঁকি বহন করে গ্রাম। ফুকুশিমাতেও এমনটাই হয়েছিল বলে মনে করেন অনেকে।

অর্থনীতি, জলবায়ু আর পারমাণবিক নির্ভরতা
ফুকুশিমার আগে জাপানের বিদ্যুতের প্রায় ত্রিশ শতাংশ আসত পারমাণবিক উৎস থেকে। এখনো তেত্রিশটি চুল্লির মধ্যে মাত্র পনেরোটি চালু হয়েছে, কারণ স্থানীয় ও প্রাদেশিক সরকারের কঠোর অনুমোদন প্রক্রিয়া। নবায়নযোগ্য শক্তি বাড়াতে জাপান এখনও হিমশিম খাচ্ছে। ফলে প্রয়োজনের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ জ্বালানি আসে আমদানি করা গ্যাস ও কয়লা থেকে। গত বছরই এই খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে।

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, কার্বন নিরপেক্ষতার লক্ষ্যে পৌঁছাতে বাস্তবসম্মত বিকল্প এখন পারমাণবিক শক্তিই। সরকার চায় ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের প্রায় এক পঞ্চমাংশ আসুক এই উৎস থেকে।

বিশ্বাসের সংকট আর স্থানীয় আপত্তি
তবু পথে বড় বাধা রয়েছে। বিদ্যুৎ সংস্থাগুলোর ওপর মানুষের আস্থা কম, বিশেষ করে টেপকোর মতো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে। নিইগাতার এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বেশিরভাগ মানুষ মনে করেন পুনরায় চালুর শর্ত এখনও পূরণ হয়নি। ভূমিকম্পের সঙ্গে দুর্ঘটনা ঘটলে সরিয়ে নেওয়া অসম্ভব হবে বলেও আশঙ্কা রয়েছে, বিশেষ করে শীতকালে তুষারপাতে রাস্তা অচল হয়ে পড়ে।

গভর্নর অনুমোদন দিলেও অনেকের চোখে এটি গণতন্ত্রের অবমাননা। তাঁদের মতে, ভর্তুকি আর অনুদানের প্রভাবে স্থানীয় মতামত চাপা পড়ে যাচ্ছে, আর ঝুঁকি বইতে হচ্ছে স্থানীয় মানুষকেই।

জলবায়ু পরিবর্তনের যুক্তি
কাশিওয়াজাকির মেয়র অবশ্য ভিন্ন ছবি দেখছেন। তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখানকার মানুষও অনুভব করছেন। পাহাড়ে বরফ কমছে, নদীতে স্যামন মাছ ফিরছে না। এই পরিস্থিতিতে স্থিতিশীল, কার্বনমুক্ত বিদ্যুৎ ছাড়া উপায় নেই। আপাতত পারমাণবিক শক্তিকেই তিনি প্রয়োজনীয় বলে মনে করেন।

জনপ্রিয় সংবাদ

রপ্তানি বাড়ছে, অর্ডার কমছে—বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের মুনাফা যাচ্ছে কোথায়?

জাপানের পারমাণবিক প্রত্যাবর্তন, বিদ্যুৎ চাহিদা আর ফুকুশিমার ক্ষত

১০:৪৯:৫৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬

জাপান আবার পারমাণবিক বিদ্যুতের পথে ফিরছে। পরিচ্ছন্ন শক্তির তীব্র চাহিদা আর ২০১১ সালের ফুকুশিমা বিপর্যয় স্মৃতি—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে দাঁড়িয়ে আজকের জাপান। পনেরো বছর আগের সেই ধ্বংসের অভিজ্ঞতা এখনও বহু মানুষের মনে দগদগে, অথচ বাড়তে থাকা বিদ্যুৎ প্রয়োজন সরকার ও বিদ্যুৎ সংস্থাগুলিকে ঠেলে দিচ্ছে পরমাণুর দিকেই।

ফুকুশিমা থেকে নিইগাতা, এক নারীর জীবনের গল্প
২০১১ সালে ফুকুশিমা দাইইচি বিদ্যুৎকেন্দ্রে তিনটি চুল্লি গলে যাওয়ার পর বাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়েছিল আয়াকো ওগাকে। তেজস্ক্রিয় ধুলোয় ঢেকে গিয়েছিল পূর্ব জাপানের বিস্তীর্ণ এলাকা। আয়াকো ওগার মতো এক লক্ষ ষাট হাজারের বেশি মানুষ দেশজুড়ে পুনর্বাসিত হন। তিনি আশ্রয় নেন জাপানের পশ্চিম উপকূলের শান্ত কৃষিভিত্তিক প্রদেশ নিইগাতায়। তখন সেখানকার পারমাণবিক কেন্দ্রও বন্ধ ছিল, আর বাতাসের গতিপথের কারণে এই অঞ্চল বড় বিপদের হাত থেকে বেঁচে যায়।

কৃষক আয়াকো ওগা মাটির তেজস্ক্রিয়তা পরীক্ষা করে দেখেন, তা দুর্যোগের আগের ফুকুশিমার মতোই স্বাভাবিক। ছোট এক খণ্ড জমিতে গাজর সহ নানা সবজি চাষ শুরু করেন। বাড়তি ফসল বিক্রি করেন রাস্তার ধারের বাজারে। তাঁর কণ্ঠে এখনও প্রশান্তি, এই জায়গাটা সুন্দর, আবার চাষবাসে ফিরতে পেরে তিনি সুখী।

পনেরো বছর পর বদলাচ্ছে জাপানের মনোভাব
৮ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প আর সুনামির ধাক্কায় ফুকুশিমা বিপর্যয়ের পনেরো বছর পর জাপানে সেই ভয়ের স্মৃতি ধীরে ধীরে ঝাপসা হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত তথ্যকেন্দ্র, আধুনিক কারখানা আর চব্বিশ ঘণ্টার বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে জাপান এখন কার্বনমুক্ত শক্তির দিকে ঝুঁকছে। সেই তালিকায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ আবার গুরুত্ব পাচ্ছে।

এই সপ্তাহে টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি কাশিওয়াজাকি কারিওয়া কমপ্লেক্সের ষষ্ঠ ইউনিট চালু করে। এটি বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোর একটি। তবে শুরুটা নির্বিঘ্ন হয়নি। পরীক্ষার সময় সুরক্ষা অ্যালার্ম না বাজায় একদিন দেরি হয়, চালু হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবার অ্যালার্ম বেজে চুল্লি বন্ধ করতে হয়। পরে সংস্থাটি জানায়, কেন্দ্র স্থিতিশীল রয়েছে এবং বাইরে কোনও তেজস্ক্রিয় প্রভাব নেই।

Kashiwazaki-Kariwa Nuclear Reactor Restarts after Delay; TEPCO Plans to  Begin Commercial Operation in February - The Japan News

শহরের জন্য বিদ্যুৎ, গ্রামের জন্য ঝুঁকি
কাশিওয়াজাকি কেন্দ্রটি আয়াকো ওগার বাড়ি থেকে প্রায় পঁয়ষট্টি কিলোমিটার দূরে। এই পুনরায় চালু হওয়া তাঁর মনে নতুন ভয় জাগিয়েছে। তাঁর কথায়, আবার প্রতিদিন সতর্কতার মধ্যে বাঁচতে হবে। তিনি স্বীকার করেন, ভয় পাচ্ছেন, তবু এখানেই তাঁর শিকড় গেড়েছে।

এই অনুভূতি জাপানের বহু গ্রামীণ এলাকার বাস্তবতা। শহরের জন্য বিদ্যুৎ যায়, অথচ ঝুঁকি বহন করে গ্রাম। ফুকুশিমাতেও এমনটাই হয়েছিল বলে মনে করেন অনেকে।

অর্থনীতি, জলবায়ু আর পারমাণবিক নির্ভরতা
ফুকুশিমার আগে জাপানের বিদ্যুতের প্রায় ত্রিশ শতাংশ আসত পারমাণবিক উৎস থেকে। এখনো তেত্রিশটি চুল্লির মধ্যে মাত্র পনেরোটি চালু হয়েছে, কারণ স্থানীয় ও প্রাদেশিক সরকারের কঠোর অনুমোদন প্রক্রিয়া। নবায়নযোগ্য শক্তি বাড়াতে জাপান এখনও হিমশিম খাচ্ছে। ফলে প্রয়োজনের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ জ্বালানি আসে আমদানি করা গ্যাস ও কয়লা থেকে। গত বছরই এই খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে।

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, কার্বন নিরপেক্ষতার লক্ষ্যে পৌঁছাতে বাস্তবসম্মত বিকল্প এখন পারমাণবিক শক্তিই। সরকার চায় ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের প্রায় এক পঞ্চমাংশ আসুক এই উৎস থেকে।

বিশ্বাসের সংকট আর স্থানীয় আপত্তি
তবু পথে বড় বাধা রয়েছে। বিদ্যুৎ সংস্থাগুলোর ওপর মানুষের আস্থা কম, বিশেষ করে টেপকোর মতো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে। নিইগাতার এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বেশিরভাগ মানুষ মনে করেন পুনরায় চালুর শর্ত এখনও পূরণ হয়নি। ভূমিকম্পের সঙ্গে দুর্ঘটনা ঘটলে সরিয়ে নেওয়া অসম্ভব হবে বলেও আশঙ্কা রয়েছে, বিশেষ করে শীতকালে তুষারপাতে রাস্তা অচল হয়ে পড়ে।

গভর্নর অনুমোদন দিলেও অনেকের চোখে এটি গণতন্ত্রের অবমাননা। তাঁদের মতে, ভর্তুকি আর অনুদানের প্রভাবে স্থানীয় মতামত চাপা পড়ে যাচ্ছে, আর ঝুঁকি বইতে হচ্ছে স্থানীয় মানুষকেই।

জলবায়ু পরিবর্তনের যুক্তি
কাশিওয়াজাকির মেয়র অবশ্য ভিন্ন ছবি দেখছেন। তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখানকার মানুষও অনুভব করছেন। পাহাড়ে বরফ কমছে, নদীতে স্যামন মাছ ফিরছে না। এই পরিস্থিতিতে স্থিতিশীল, কার্বনমুক্ত বিদ্যুৎ ছাড়া উপায় নেই। আপাতত পারমাণবিক শক্তিকেই তিনি প্রয়োজনীয় বলে মনে করেন।