অ্যাপলের নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন আসছে। দীর্ঘ সময় প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব সামলানোর পর টিম কুক এবার কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। তাঁর জায়গায় প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছেন জন টার্নাস। স্টিভ জবসের উত্তরসূরি হিসেবে কুক যেমন নিজের নেতৃত্বের ধরন তৈরি করেছিলেন, তেমনি টার্নাসকেও এবার নিজের মতো করে অ্যাপলের সাফল্যের নতুন সংজ্ঞা তৈরি করতে হবে।
জবসের ছায়া থেকে বেরিয়ে কুকের নিজস্ব পথ
২০১১ সালে স্টিভ জবস টিম কুককে প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব দিয়ে যান। তখন অনেকেই মনে করেছিলেন, কুক হয়তো জবসের মতো দূরদর্শী নেতা হতে পারবেন না। তাঁর পরিচিতি ছিল মূলত কৌশল ও পরিচালন দক্ষতার মানুষ হিসেবে। পণ্য নকশার ক্ষেত্রেও তাঁর অভিজ্ঞতা জবসের মতো ছিল না।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে কুক প্রমাণ করেছেন, একজন প্রধান নির্বাহীর সাফল্যকে শুধু নতুন পণ্য তৈরির ক্ষমতা দিয়ে বিচার করা যায় না। তাঁর সময়ে অ্যাপল সংগীত, বেতার কানের যন্ত্র, স্মার্টঘড়ি, মিশ্র বাস্তবতার যন্ত্র, ছোট যন্ত্র শনাক্তকারী, ডিজিটাল অর্থ পরিশোধসহ নানা সেবা ও পণ্য তৈরি করেছে। একই সঙ্গে নিজেদের নকশা করা চিপ তৈরির সক্ষমতাও শক্তিশালী করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
কুকের নেতৃত্বে গোপনীয়তা, পরিবেশ এবং কর্মক্ষেত্রে বৈচিত্র্য ও প্রতিনিধিত্বের মতো বিষয়ও অ্যাপলের করপোরেট সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
জবসের বিদায়ের সময় অ্যাপলের মূল্য ছিল প্রায় ৩৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কুকের বিদায়ের সময়ে প্রতিষ্ঠানটির মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে। ফলে শুধু ‘পণ্যকেন্দ্রিক মানুষ নন’—এই পুরোনো ধারণা দিয়ে কুকের সাফল্য বিচার করলে অ্যাপলের গত দেড় দশকের পরিবর্তনের বড় অংশই উপেক্ষিত থেকে যায়।
সাফল্যের সংজ্ঞা নিজের মতো করেই তৈরি করতে হয়
স্টিভ জবস একসময় বলেছিলেন, মাঝেমধ্যে এমন বিপ্লবী পণ্য আসে, যা সবকিছু বদলে দেয়। ম্যাক, আইপড ও আইফোনকে তিনি এমন পরিবর্তনকারী পণ্যের উদাহরণ হিসেবে দেখেছিলেন।
কিন্তু বিপ্লবী পণ্য নিয়মিতভাবে তৈরি হয় না। কুকও সেটি বুঝেছিলেন। নতুন ধরনের পণ্য তৈরি করতে গিয়ে তাঁর সময়েও নানা চ্যালেঞ্জ এসেছে। বিশেষ করে মিশ্র বাস্তবতার যন্ত্র এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে প্রত্যাশা পূরণ করা সহজ হয়নি।
তবু কুক জবসকে অনুকরণ করার চেষ্টা করেননি। বরং নিজের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে অ্যাপলের বিদ্যমান ভিত্তিকে আরও বড় করেছেন। নগদ অর্থের বদলে ডিজিটাল অর্থ পরিশোধের অভ্যাস জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রেও অ্যাপলের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্রের মুঠোফোনভিত্তিক ডিজিটাল মানিব্যাগ ব্যবহারকারীদের মধ্যে অ্যাপলের ডিজিটাল অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা এখন বিপুল অংশজুড়ে রয়েছে।
অর্থাৎ কুকের সাফল্যকে শুধু নতুন যন্ত্রের সংখ্যা দিয়ে মাপলে তাঁর নেতৃত্বের প্রকৃত প্রভাব বোঝা যাবে না।
এবার প্রশ্ন জন টার্নাসকে নিয়ে
এখন সবার দৃষ্টি জন টার্নাসের দিকে। তিনি কেমন প্রধান নির্বাহী হবেন, সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
সহকর্মীদের বর্ণনায় টার্নাস সহযোগিতাপ্রবণ, শান্ত স্বভাবের এবং পণ্যের সূক্ষ্ম উন্নয়নে অত্যন্ত মনোযোগী। অ্যাপলের বিখ্যাত নকশা বিভাগকে আরও শক্তিশালী করার কাজেও তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
হার্ডওয়্যার প্রকৌশলে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে টার্নাসের। কয়েক বছর ধরেই তাঁকে নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছিল। তবে তাঁর ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের ধরন সম্পর্কে এখনো খুব বেশি তথ্য প্রকাশ্যে নেই। বরং তাঁকে মূলত ‘পণ্যকেন্দ্রিক নেতা’ হিসেবেই সামনে আনা হচ্ছে।
আর ঠিক এমন এক সময়ে তিনি দায়িত্ব নিচ্ছেন, যখন অ্যাপল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে আরও গভীরভাবে প্রবেশ করতে যাচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে নতুন পণ্যের দৌড়
টার্নাসের সময়ে অ্যাপলের সামনে একের পর এক নতুন পণ্য আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে ভাঁজ করা আইফোন, ২০২৭ সালের আইফোনের ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে নতুন নকশার যন্ত্র, নতুন ম্যাক এবং বিভিন্ন স্মার্ট গৃহস্থালি পণ্য রয়েছে।
অ্যাপলের লক্ষ্য হতে পারে নিজেদের আবারও একটি শক্তিশালী পণ্য উদ্ভাবনকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। আর সেই পুরো পরিকল্পনার কেন্দ্রে থাকবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
তবে প্রতিযোগিতা সহজ হবে না। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে ওপেনএআইসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অ্যাপলের প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে পারে। একই সময়ে কুক পরিচালনা পর্ষদে থাকায় টার্নাস তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও কৌশলগত দক্ষতার সহায়তাও পাবেন।
জবস বা কুকের সঙ্গে তুলনা নয়
অ্যাপলের নেতৃত্ব বদলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্ভবত এটিই—টার্নাসকে জবস বা কুকের সঙ্গে তুলনা করে বিচার করা উচিত নয়।
জবসের সময়ে অ্যাপল ছিল মূলত দূরদর্শী ও বিপ্লবী পণ্যের প্রতিষ্ঠান। কুকের সময়ে সেটি পরিণত হয়েছে বিশাল বৈশ্বিক ব্যবসায়িক শক্তিতে। টার্নাসের সময়ে প্রতিষ্ঠানটি হয়তো নতুনভাবে পণ্য উদ্ভাবন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও হার্ডওয়্যারের সমন্বয়ের দিকে এগোবে।
তাই তাঁর সাফল্যের মানদণ্ডও অন্য রকম হবে।
কুক যেমন জবসের অনুকরণ না করে নিজের শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে অ্যাপলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, টার্নাসের ক্ষেত্রেও একই শিক্ষা প্রযোজ্য। শেষ পর্যন্ত তাঁকে সফল হতে হলে নিজের সময়ের বাস্তবতা বুঝে নিজের নেতৃত্বের সংজ্ঞা তৈরি করতে হবে।
ক্ষুধার্ত থাকো, নতুন কিছু করার সাহস রাখো, আর যা পেয়েছ তাতেই থেমে যেও না—অ্যাপলের নতুন অধ্যায়ে এই দর্শনই হয়তো জন টার্নাসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















