থাই খাবারকে ‘আসল’ বা ‘অথেনটিক’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা কতটা সম্ভব—এই প্রশ্ন ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। বিদেশে থাই খাবারের জনপ্রিয়তা বাড়াতে সরকার যেমন নানা উদ্যোগ নিয়েছে, তেমনি কোন খাবারকে প্রকৃত থাই খাবার বলা যাবে, সেটি নিয়েও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। কিন্তু থাইল্যান্ডের খাবারের ইতিহাসই বলছে, এই পরিচয় এতটা সরল নয়।
২০১৪ সালে থাইল্যান্ড সরকার ‘ই-ডেলিশাস’ নামে একটি অদ্ভুত খাবার পরীক্ষার যন্ত্র তৈরি করেছিল। বিভিন্ন সেন্সরের মাধ্যমে খাবারের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করে সেটিকে সরকারের অনুমোদিত মানের সঙ্গে তুলনা করা হতো। কোনো খাবার ৮০ শতাংশের কম মিললে সেটিকে ‘অথেনটিক’ থাই খাবার হিসেবে গণ্য করা হতো না। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বিদেশে নিম্নমানের থাই খাবার নিয়ে অভিযোগ থেকেই সরকারি অর্থায়নে তৈরি হয়েছিল এই যন্ত্র।
থাই খাবারের ‘আসল’ স্বাদ নিয়ে সরকারি উদ্যোগ
বিদেশে থাই খাবারের প্রচার ও মান নির্ধারণের এই প্রচেষ্টা অবশ্য নতুন নয়। ১৯৯৮ সালে থাইল্যান্ড ‘থাই সিলেক্ট’ কর্মসূচি চালু করে। বিদেশে থাই রেস্তোরাঁকে প্রচারের পাশাপাশি সেখানে ‘অথেনটিক থাই ফ্লেভার’ নিশ্চিত করাও ছিল কর্মসূচিটির অন্যতম লক্ষ্য।

কিন্তু থাই খাবারের সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক শুধু সরকারি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। থাই সেলিব্রিটি শেফ ভাচারাভি ভিসেটপোচানাটিপ, যিনি ‘শেফ কেন্ট’ নামে পরিচিত, বিদেশের রেস্তোরাঁয় থাই খাবার রান্নার পদ্ধতি নিয়ে সমালোচনা করেছেন। তার মতে, ঐতিহ্য ও খাবারের ইতিহাস না বুঝে উপকরণ বদলে ফেললে খাবারের মূল বৈশিষ্ট্য নষ্ট হয়।
তবে এই ‘আসল’ খাবারের ধারণার মধ্যেই রয়েছে বড় ধরনের ঐতিহাসিক জটিলতা।
প্যাড থাইয়ের পেছনে চীনা ইতিহাস
বিদেশে থাইল্যান্ডের জাতীয় খাবার হিসেবে সবচেয়ে বেশি পরিচিত প্যাড থাই। অথচ থাইল্যান্ডের ভেতরে এটি বিদেশের মতো জনপ্রিয় নয়। খাবারটির নামের অর্থ ‘থাই স্টির-ফ্রাই’ হলেও এর শিকড় চীনা রান্নায়।
থাই সরকারের প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৩০-এর দশকে প্রধানমন্ত্রী ফিল্ড মার্শাল প্লেক ফিবুনসংখ্রামের বাড়ির এক গৃহকর্মী প্যাড থাই তৈরি করেন। ফিবুন এটি জাতীয় পরিচয় নির্মাণের প্রচারণার অংশ হিসেবে জনপ্রিয় করেন।
তবে খাবারটির পুরোনো নাম ছিল ‘গুয়াই তিয়াও প্যাড থাই’, যেখানে ‘গুয়াই তিয়াও’ তেওচিউ চীনা ভাষায় নুডলস বোঝায়। সে সময় ব্যাংককের প্রায় অর্ধেক মানুষই চীনা বংশোদ্ভূত ছিলেন। ফিবুন নিজেও চীনা বংশোদ্ভূত হলেও তার শাসনামলে চীনা জনগোষ্ঠীকে থাই নাম গ্রহণ ও থাই ভাষা ব্যবহারে বাধ্য করার মতো কঠোর একীভূতকরণ নীতি চালু ছিল।
আরেক ইতিহাসবিদের মতে, ফিবুন নুডলস খাওয়ার প্রচলন বাড়ালেও বর্তমান পরিচিত প্যাড থাই আসলে ১৯৬০-এর দশকে বিকশিত হয়। ওই সময় থাইল্যান্ডে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ায় বিদেশিদের কাছে বাজারজাত করার জন্য একটি ‘জাতীয় খাবার’-এর প্রয়োজন তৈরি হয়েছিল।
থাই খাবারের সীমানা কোথায়?

থাইল্যান্ডের খাবারকে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলা কঠিন। কেন্দ্রীয়, দক্ষিণাঞ্চলীয়, উত্তরাঞ্চলীয় এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ইসান—প্রতিটি অঞ্চলের রান্নার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আবার সীমান্ত ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের কারণে থাই খাবারে বিদেশি প্রভাবও দীর্ঘদিনের।
দক্ষিণের শুকনো গরুর মাংসের কারি ‘রাওয়াং’-এর সঙ্গে মালয়েশিয়ার ‘রেনডাং’-এর মিল রয়েছে। ইসানের ‘লাব’-এর শিকড় লাও সংস্কৃতিতে। অর্থাৎ থাই খাবারের ইতিহাস নিজেই বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও সংস্কৃতির দীর্ঘ আদান-প্রদানের ফল।
ব্যাংকের শেফ প্রিন পোলসুক তাই খাবারকে শুধু ‘থাই’ বলে চিহ্নিত করতে চান না। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হারিয়ে যেতে বসা স্থানীয় খাবার খুঁজে এনে তিনি নিজের রেস্তোরাঁয় নতুনভাবে পরিবেশন করেন। তার ভাষায়, এগুলো ‘থাই খাবার’ নয়, ‘মানুষের খাবার’।
আধুনিক থাই রান্নায় বদল
অন্যদিকে, থাই খাবারের সীমারেখা নিয়ে রক্ষণশীলতার প্রবণতাও রয়েছে। ব্যাংকের শেফ ডিলান ইথারংয়ের মতে, থাই রান্নার ইতিহাসে এত বিদেশি প্রভাব রয়েছে যে এর জন্য কঠোর একটি সীমানা নির্ধারণ করা অর্থহীন।
একসময় উচ্চবিত্ত থাইদের কাছে ফরাসি, ইতালীয় বা জাপানি খাবার বেশি মর্যাদাপূর্ণ মনে হলেও পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের থাই শেফদের মধ্যে নিজস্ব রান্নার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। তবে সেই আগ্রহের অর্থ আবার পুরোনো রেসিপি হুবহু অনুসরণ করা নয়। বরং অনেক শেফ ঐতিহ্যবাহী খাবারকে আধুনিকভাবে পুনর্নির্মাণ করছেন।
ফলে থাই খাবারের ভবিষ্যৎ হয়তো ‘আসল’ স্বাদের কঠোর সংজ্ঞায় নয়, বরং নিজের ইতিহাস সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী হয়ে সেই সীমারেখা নতুন করে আঁকার মধ্যেই নিহিত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















