নাটোরে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে জনজীবন ও বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, গত তিন মাস ধরে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ মিলছে। এতে একদিকে যেমন দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল পেশাজীবীদের আয়ও কমে গেছে। অনেকের অভিযোগ, বিদ্যুৎ সরবরাহ অর্ধেকে নেমে এলেও বিল বরং বেড়েছে।
কাপড় ইস্ত্রির কাজেও ধস
গুরুদাসপুর থানা চত্বরে লন্ড্রি দোকান চালান আজগর আলী। লোডশেডিংয়ের কারণে তার কাপড় ইস্ত্রির কাজ অর্ধেকে নেমে এসেছে। আগে সকাল ৯টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত কাজ করে প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৫০টি কাপড় ইস্ত্রি করতে পারতেন। এতে দিনে প্রায় ১ হাজার টাকা আয় হতো।
এখন দিনে ৫০টি কাপড়ও ইস্ত্রি করতে পারছেন না। আয় কমে দাঁড়িয়েছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়। অথচ তার মাসিক বিদ্যুৎ বিল আগে প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকা হলেও এখন ৩ হাজার টাকার বেশি আসছে। ফলে সংসারের খরচ চালানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
গরমে অতিষ্ঠ জনজীবন
ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় শুধু ব্যবসা নয়, সাধারণ মানুষের জীবনও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। নাটোর সদর উপজেলার দিঘাপতিয়া এলাকার কুমকুম আক্তার জানান, দিনে-রাতে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়ায় স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে রাতে ঘুমাতেও সমস্যা হচ্ছে।
লালপুরের বিলমারিয়া ও নলডাঙ্গার মাধনগর এলাকার বাসিন্দারাও স্বল্প সময় বিদ্যুৎ পেলেও বেশি বিল আসার অভিযোগ করেছেন। অভিযোগ জানিয়েও প্রতিকার না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন তারা।
স’মিল ও শ্রমিকদের আয় কমেছে
নাটোরে লাইসেন্সধারী কয়েক শ স’মিলে শত শত শ্রমিক কাজ করেন। বিদ্যুৎ সংকটে এসব মিলে কাঠ থাকলেও তা চেরাই করা যাচ্ছে না। ফলে চুক্তিভিত্তিক ও মাসিক বেতনে কাজ করা শ্রমিকদের আয় কমেছে। মিল মালিকদেরও বিদ্যুৎ বিল ও শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
চালকলেও উৎপাদন ব্যাহত
জেলায় সরকারি হিসাবে চুক্তিবদ্ধ চালকল রয়েছে ১৩৮টি। এর বাইরে আরও কয়েক শ চালকল রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বিদ্যুতের অভাবে এসব মিলে ধান সেদ্ধ ও চাল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ব্যবসা কমে যাওয়ায় কিছু মিল মালিক শ্রমিক ছাঁটাইও করেছেন।
নাটোর জেলা চালকল মালিক সমিতির সভাপতি আবদুর রউফ চৌধুরী জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর চাল উৎপাদন কমেছে। সরকারি চাহিদার ১৬ হাজার ৬৭৫ মেট্রিক টন চাল দেওয়ার সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে উৎপাদন প্রায় বন্ধ। এতে মিল মালিকদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শ্রমিকরাও সংকটে পড়েছেন।
চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কম
নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর জেনারেল ম্যানেজার টিএম মেসবাহ উদ্দিন জানান, তাদের আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা ১৪৫ থেকে ১৫০ মেগাওয়াট। বিপরীতে নাটোর ও কাটাখালি গ্রিড থেকে সর্বোচ্চ ১১০ থেকে ১১৫ মেগাওয়াট পাওয়া যাচ্ছে। এই ঘাটতির কারণেই লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, লোডশেডিং কমাতে সরকারি প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে এবং ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নাটোরের বিদ্যুৎ সংকট
নাটোরে দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে বিদ্যুৎনির্ভর পেশাজীবী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ গ্রাহকদের জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি দ্রুত কাটিয়ে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফেরানোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















