০২:২৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
‘Belonging: A Journey of Love’: সোনিয়া গান্ধীর বহুল আলোচিত স্মৃতিকথা ১০ নভেম্বর ভারতে প্রকাশ সিলেটে প্রতিমন্ত্রীর অনুষ্ঠান বয়কট সাংবাদিকদের, বিএনপির বিরুদ্ধেও হয়রানির অভিযোগ বিএনপির মন্ত্রীদের মান্নার কড়া বার্তা: ‘সত্য বলুন, দম্ভ দেখাবেন না’ ভারী বৃষ্টিতে দিল্লি অচল, কনট প্লেস থেকে বিমানবন্দর পানির নিচে বিশ্বে খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ, বাড়ছে সরবরাহ ঝুঁকি বেলুচিস্তানে ৭২ ঘণ্টার অভিযানে ৪৮ ‘সন্ত্রাসী’ নিহত, দাবি পাকিস্তানের হৃদয় থেকে রান্না, স্বাস্থ্য থেকে মানুষের পাশে: উদ্ভিদভিত্তিক খাবারে বদলের গল্প চট্টগ্রামে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, ব্যবসায়ীকে ‘ছেলেমেয়ের লাশ ফেলে রাখার’ হুমকি ইসলামী ব্যাংকে এস আলম-সংশ্লিষ্ট ৮১.৯২ শতাংশ শেয়ার ফ্রিজের নির্দেশ হাইকোর্টের ফুলবাড়ীর ১০৯ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৭২টিতেই নেই প্রধান শিক্ষক, নৈশপ্রহরী শূন্য ৮০টিতে

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-৬৩)

  • Sarakhon Report
  • ১১:০০:১৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৮ নভেম্বর ২০২৪
  • 103

সরিতুল্লা হাজী

মেছের মোল্লার বাড়ির পাশেই ছিল সরিতুল্লা হাজীর বাড়ি। দুইধার তিনি মক্কা শরিফ যাইয়া হজ করিয়া আসিয়াছেন। বৃদ্ধ বয়সে তাঁহার শখ হইল সোনাভানের পুঁথি পড়িবেন। তাঁর অনা কোনো কাজ ছিল না। সারাদিন পুথিখানা সামনে লইয়া পড়িতে চেষ্টা করিতেন। কিন্তু পড়িবেন কেমন করিয়া? অক্ষর-পরিচয় তো হয় নাই। বাড়ির কাছ দিয়া গেলেই ডাক দিয়াছেন, “ও কে যায় ও. জসী নাকি? এখানে আইস ভাই।” কাছে গেলে সোনাভানের পুঁথিখানা আওগাইয়া ধরেন। “বল ত ভাই। এখানটিতে কি লেখা আছে?” কয়েক মাস পাঠশালায় যাইয়া আমি নতুন পড়ুয়া। এমন বয়স্ক ছাত্র পাইয়া বেশ গৌরবের সঙ্গে তাঁহাকে পড়া বলিয়া দিতাম। একখানা পুরাতন কাঁথার উপরে বসিয়া তিনি পড়াশুনা করিতেন। মক্কা শরিফ হইতে কিনিয়া আনা আলখেল্লাটি তাঁহার ঘরের বেড়ায় টাঙানো থাকিত।

আমি ছাড়া পাড়ার যত স্কুলে-পাঠশালায়-পড়া ছেলে, তাঁর বাড়ির কাছ দিয়া গেলেই তিনি তাহাদিগকে ধরিয়াছেন পাঠ বলিয়া দিতে। তাহাদের কাছে আবার নতুন পড়া লইয়া দিনের পর দিন চলিত তাঁহার পুঁথি পড়ার সাধনা। যেদিন আমাদের কাজ থাকিত তাঁহার বাড়ির কাছ দিয়া চুপে চুপে যাইতাম। তখন শুনিতাম বৃদ্ধ তাঁহার ভাঙা গলায় সুর করিয়া সোনাভানের পুঁথি পড়িতেছেন। বৃদ্ধের একটি নাতনি ছিল। আমার চাইতে দু’এক বৎসর বড়। সে-ই রান্নাবান্না করিয়া তাঁহাকে খাওয়াইত। একমাত্র পুঁথি পড়া অভ্যাস করা ছাড়া তাঁহার আর কোনো কাজ ছিল না। গ্রামের কারও বাড়ি নিমন্ত্রণের দিনে মক্কা শরিফের খিলকাটি পরিয়া পাথরের একটি তসবিহ গলায় দিয়া তিনি সেখানে যাইতেন। সমবেত লোকেরা তাঁহার সঙ্গে হাত মিলাইয়া বিশেষ গৌরব বোধ করিত।

দুই-তিন বৎসরের অক্লান্ত চেষ্টায় সরিতুল্লা হাজী পুঁথি পড়া শিখিয়া ফেলিলেন। ইহাতে তাঁহার কি লাভ হইয়াছিল জানি না। সোনাভানের পুঁথি শেষ করিয়া তিনি আরও কোনো পুঁথি পড়িয়াছিলেন কি না তাহারও খোঁজ রাখি নাই। কিন্তু আমার মুরব্বিরা প্রায়ই আমাকে বলিতেন, দেখ, আশি বৎসরের বৃদ্ধ সরিতুল্লা হাজী নিজের চেষ্টায় কেমন পুঁথি পড়া শিখিয়া ফেলিলেন। আর এত সুযোগ-সুবিধা থাকিতে তোমরা তেমন পড়াশুনা করিতেছ না।

প্রথম পাঠ

আগেই বলিয়াছি আমি এবং আমার চাচাতো ভাই নেহাজদ্দীন শোভারামপুর অম্বিকা মাস্টারের পাঠশালায় যাইয়া ভর্তি হইলাম। পাঠশালাটি ছিল ছোট গাঙের ওপারে। বাঁশের সাঁকো পার হইয়া সেখানে যাইতে হইত। গ্রীষ্মের ছুটির পর এই ছোটগাত্ ফুলিয়া ফাঁপিয়া বড় হইয়া উঠিল। তখন সেখানে যাইয়া প্রতিদিন লেখাপড়া করা আমাদের বয়সের ছোটদের পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। আমার পিতা একদিন আমাদিগকে সঙ্গে করিয়া তাঁহার নিজের স্কুলে আনিয়া ভর্তি করিয়া দিলেন। এই স্কুলের কথা আগেও কিছুটা বলিয়াছি।

চলবে…

জনপ্রিয় সংবাদ

‘Belonging: A Journey of Love’: সোনিয়া গান্ধীর বহুল আলোচিত স্মৃতিকথা ১০ নভেম্বর ভারতে প্রকাশ

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-৬৩)

১১:০০:১৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৮ নভেম্বর ২০২৪

সরিতুল্লা হাজী

মেছের মোল্লার বাড়ির পাশেই ছিল সরিতুল্লা হাজীর বাড়ি। দুইধার তিনি মক্কা শরিফ যাইয়া হজ করিয়া আসিয়াছেন। বৃদ্ধ বয়সে তাঁহার শখ হইল সোনাভানের পুঁথি পড়িবেন। তাঁর অনা কোনো কাজ ছিল না। সারাদিন পুথিখানা সামনে লইয়া পড়িতে চেষ্টা করিতেন। কিন্তু পড়িবেন কেমন করিয়া? অক্ষর-পরিচয় তো হয় নাই। বাড়ির কাছ দিয়া গেলেই ডাক দিয়াছেন, “ও কে যায় ও. জসী নাকি? এখানে আইস ভাই।” কাছে গেলে সোনাভানের পুঁথিখানা আওগাইয়া ধরেন। “বল ত ভাই। এখানটিতে কি লেখা আছে?” কয়েক মাস পাঠশালায় যাইয়া আমি নতুন পড়ুয়া। এমন বয়স্ক ছাত্র পাইয়া বেশ গৌরবের সঙ্গে তাঁহাকে পড়া বলিয়া দিতাম। একখানা পুরাতন কাঁথার উপরে বসিয়া তিনি পড়াশুনা করিতেন। মক্কা শরিফ হইতে কিনিয়া আনা আলখেল্লাটি তাঁহার ঘরের বেড়ায় টাঙানো থাকিত।

আমি ছাড়া পাড়ার যত স্কুলে-পাঠশালায়-পড়া ছেলে, তাঁর বাড়ির কাছ দিয়া গেলেই তিনি তাহাদিগকে ধরিয়াছেন পাঠ বলিয়া দিতে। তাহাদের কাছে আবার নতুন পড়া লইয়া দিনের পর দিন চলিত তাঁহার পুঁথি পড়ার সাধনা। যেদিন আমাদের কাজ থাকিত তাঁহার বাড়ির কাছ দিয়া চুপে চুপে যাইতাম। তখন শুনিতাম বৃদ্ধ তাঁহার ভাঙা গলায় সুর করিয়া সোনাভানের পুঁথি পড়িতেছেন। বৃদ্ধের একটি নাতনি ছিল। আমার চাইতে দু’এক বৎসর বড়। সে-ই রান্নাবান্না করিয়া তাঁহাকে খাওয়াইত। একমাত্র পুঁথি পড়া অভ্যাস করা ছাড়া তাঁহার আর কোনো কাজ ছিল না। গ্রামের কারও বাড়ি নিমন্ত্রণের দিনে মক্কা শরিফের খিলকাটি পরিয়া পাথরের একটি তসবিহ গলায় দিয়া তিনি সেখানে যাইতেন। সমবেত লোকেরা তাঁহার সঙ্গে হাত মিলাইয়া বিশেষ গৌরব বোধ করিত।

দুই-তিন বৎসরের অক্লান্ত চেষ্টায় সরিতুল্লা হাজী পুঁথি পড়া শিখিয়া ফেলিলেন। ইহাতে তাঁহার কি লাভ হইয়াছিল জানি না। সোনাভানের পুঁথি শেষ করিয়া তিনি আরও কোনো পুঁথি পড়িয়াছিলেন কি না তাহারও খোঁজ রাখি নাই। কিন্তু আমার মুরব্বিরা প্রায়ই আমাকে বলিতেন, দেখ, আশি বৎসরের বৃদ্ধ সরিতুল্লা হাজী নিজের চেষ্টায় কেমন পুঁথি পড়া শিখিয়া ফেলিলেন। আর এত সুযোগ-সুবিধা থাকিতে তোমরা তেমন পড়াশুনা করিতেছ না।

প্রথম পাঠ

আগেই বলিয়াছি আমি এবং আমার চাচাতো ভাই নেহাজদ্দীন শোভারামপুর অম্বিকা মাস্টারের পাঠশালায় যাইয়া ভর্তি হইলাম। পাঠশালাটি ছিল ছোট গাঙের ওপারে। বাঁশের সাঁকো পার হইয়া সেখানে যাইতে হইত। গ্রীষ্মের ছুটির পর এই ছোটগাত্ ফুলিয়া ফাঁপিয়া বড় হইয়া উঠিল। তখন সেখানে যাইয়া প্রতিদিন লেখাপড়া করা আমাদের বয়সের ছোটদের পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। আমার পিতা একদিন আমাদিগকে সঙ্গে করিয়া তাঁহার নিজের স্কুলে আনিয়া ভর্তি করিয়া দিলেন। এই স্কুলের কথা আগেও কিছুটা বলিয়াছি।

চলবে…