০৪:৩৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রপ্তানি বাড়ছে, অর্ডার কমছে—বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের মুনাফা যাচ্ছে কোথায়? ‘Belonging: A Journey of Love’: সোনিয়া গান্ধীর বহুল আলোচিত স্মৃতিকথা ১০ নভেম্বর ভারতে প্রকাশ সিলেটে প্রতিমন্ত্রীর অনুষ্ঠান বয়কট সাংবাদিকদের, বিএনপির বিরুদ্ধেও হয়রানির অভিযোগ বিএনপির মন্ত্রীদের মান্নার কড়া বার্তা: ‘সত্য বলুন, দম্ভ দেখাবেন না’ ভারী বৃষ্টিতে দিল্লি অচল, কনট প্লেস থেকে বিমানবন্দর পানির নিচে বিশ্বে খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ, বাড়ছে সরবরাহ ঝুঁকি বেলুচিস্তানে ৭২ ঘণ্টার অভিযানে ৪৮ ‘সন্ত্রাসী’ নিহত, দাবি পাকিস্তানের হৃদয় থেকে রান্না, স্বাস্থ্য থেকে মানুষের পাশে: উদ্ভিদভিত্তিক খাবারে বদলের গল্প চট্টগ্রামে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, ব্যবসায়ীকে ‘ছেলেমেয়ের লাশ ফেলে রাখার’ হুমকি ইসলামী ব্যাংকে এস আলম-সংশ্লিষ্ট ৮১.৯২ শতাংশ শেয়ার ফ্রিজের নির্দেশ হাইকোর্টের

পশ্চিমা আধিপত্য: বিশ্বকল্যাণের নেতৃত্ব, নাকি বৈষম্যের স্থায়ী কাঠামো?

বিশ্ব রাজনীতিতে পশ্চিমা নেতৃত্বকে দীর্ঘদিন এমন এক বাস্তবতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যার বিকল্প ভাবাই যেন অযৌক্তিক। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থা গণতন্ত্র, মানবাধিকার, মুক্তবাজার, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে দাঁড়িয়েছে—এটাই প্রচলিত বয়ান। কিন্তু কোনো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নৈতিকতা তার ঘোষিত উদ্দেশ্যে নয়, বরং তার বাস্তব ফলাফলে বিচার করা উচিত।

সেই জায়গা থেকেই প্রশ্নটি অস্বস্তিকর হলেও জরুরি: পশ্চিমা আধিপত্য কি সত্যিই বিশ্বকে আরও সমৃদ্ধ, ন্যায়সংগত ও নিরাপদ করেছে?

২০২৩ সালে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘মার্কিন আধিপত্য ও তার বিপদ’ শিরোনামে একটি নথি প্রকাশ করে। সেখানে অভিযোগ করা হয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও স্নায়ুযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং সামরিক শক্তির ব্যবহারও বেড়েছে। এই বক্তব্যকে শুধু চীনা প্রচারণা হিসেবে বাতিল করা সহজ। কিন্তু সহজ উত্তর সবসময় সঠিক উত্তর নয়। বরং পশ্চিমা ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই করতে হলে একই প্রশ্ন পশ্চিমের কাছেও ফিরিয়ে দিতে হবে—এই ব্যবস্থার সুফল কারা পেয়েছে, আর এর মূল্য কে দিয়েছে?

আধিপত্য কীভাবে কাজ করে

আধিপত্যকে শুধু শক্তিশালী রাষ্ট্রের দুর্বল রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বাস্তবে একটি আধিপত্যশীল রাষ্ট্রের সঙ্গে অন্য রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক অনেক বেশি জটিল। মিত্র রাষ্ট্রগুলো প্রায়ই নিজেদের স্বার্থেই শক্তিশালী রাষ্ট্রের নেতৃত্ব মেনে নেয়, কারণ জোটের ভেতরে থাকার ফলে তারা নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সুবিধা কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব পেতে পারে।

এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিমা ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় শক্তি। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এর পরিধি উন্নত ও উচ্চ আয়ের রাষ্ট্রগুলোকে ঘিরে; সামরিক ক্ষেত্রে ন্যাটো দীর্ঘদিন এর প্রধান স্তম্ভ। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও জাপানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চতুর্পক্ষীয় নিরাপত্তা সহযোগিতাও এই বৃহত্তর কৌশলগত কাঠামোর গুরুত্ব দেখায়।

কিন্তু এখানেই সমস্যার সূত্রপাত। যে রাষ্ট্রগুলো ব্যবস্থার ভেতরে আছে, তারা সুবিধা পেতে পারে; যারা বাইরে, তারা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়তে পারে। ফলে আধিপত্য শুধু ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নয়—এটি সুযোগেরও অসম বণ্টন।

বিশ্ব অর্থনীতির লাভ কার?

পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দাবিগুলোর একটি হলো—এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং কোটি কোটি মানুষের জীবনমান উন্নত করেছে। এ দাবির পক্ষে পরিসংখ্যানও রয়েছে। ১৯৮৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর মাথাপিছু আয় প্রায় আট গুণ বেড়েছে। একই সময়ে উচ্চ আয়ের দেশগুলোর বৃদ্ধি ছিল প্রায় দ্বিগুণ।

কিন্তু শতাংশের হিসাব দিয়ে বৈশ্বিক বৈষম্য বোঝা যায় না।

একই সময়ের দৈনিক মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনের পরিবর্তন দেখলে ব্যবধানটি অনেক বেশি স্পষ্ট হয়। উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে বৃদ্ধি ছিল ৫৪ দশমিক ৯১ ডলার, নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে মাত্র ৪ দশমিক ৩১ ডলার। জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধি ছিল মাত্র ২ দশমিক ৭০ ডলার।

অর্থাৎ দরিদ্র দেশগুলো হয়তো দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু ধনী দেশগুলো যে সম্পদগত সুবিধা নিয়ে শুরু করেছে, তার ব্যবধান কমছে না—বরং অনেক ক্ষেত্রে আরও বড় হচ্ছে।

এখানেই ‘নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা’ নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন ওঠে। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বৈশ্বিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। কিন্তু এগুলোর কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধনী রাষ্ট্রগুলোর প্রভাব যদি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে, তাহলে দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোর প্রয়োজন কতটা সমান গুরুত্ব পায়?

উন্নয়ন শুধু প্রবৃদ্ধির সংখ্যা নয়। প্রশ্ন হলো, প্রবৃদ্ধির ফল কে পাচ্ছে এবং কে পিছিয়ে থাকছে।Has Western hegemony harmed human welfare and increased global inequality?  Drawing on China's 2023 Ministry of Foreign Affairs document U.S. Hegemony  and Its Perils, Robert Walker, Emeritus Fellow of Green Templeton College,

মানবাধিকার: সর্বজনীন নাকি পশ্চিমা ব্যাখ্যা?

পশ্চিমা আধিপত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী নৈতিক যুক্তি মানবাধিকার। ব্যক্তি স্বাধীনতা, মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন থেকে সুরক্ষা আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। কিন্তু মানবাধিকারের ধারণাটিকেও যদি ইতিহাসের বাইরে রাখা হয়, তাহলে আমরা এর রাজনৈতিক বিবর্তনকে ভুলে যাব।

১৯৪৮ সালের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার সঙ্গে এলিনর রুজভেল্টের নাম ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। কিন্তু এর বুদ্ধিবৃত্তিক নির্মাণে চীনা কূটনীতিক পেং চুন চ্যাংয়ের ভূমিকাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি চেয়েছিলেন মানবাধিকারের ভাষা যেন কোনো একটি ধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। তাঁর দৃষ্টিতে মানুষের ‘বেঁচে থাকার অধিকার’ শুধু প্রাণধারণ নয়; একটি মর্যাদাপূর্ণ ও ভালো জীবনযাপনের অধিকারও এর অংশ।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে পশ্চিমা মানবাধিকার ভাবনায় ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ক্রমশ কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে, আর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের প্রশ্ন তুলনামূলকভাবে দুর্বল অবস্থানে চলে যায়। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের আন্তর্জাতিক আইনি স্বীকৃতিও ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত প্রতিরোধের মুখে ছিল। উন্নয়নের অধিকারকে আইনি মর্যাদা দেওয়ার ক্ষেত্রেও পশ্চিমা অনীহা ছিল।

এখানে একটি মৌলিক নৈতিক প্রশ্ন রয়েছে। একজন মানুষকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দেওয়া হলো, কিন্তু তাকে যদি দারিদ্র্য, বৈষম্য ও সুযোগের অভাব থেকে মুক্ত করার কোনো সামাজিক নিশ্চয়তা না দেওয়া হয়, তাহলে তার স্বাধীনতার বাস্তব মূল্য কতটা?

মানবাধিকার কি কেবল রাষ্ট্রের হাত থেকে ব্যক্তিকে রক্ষা করার বিষয়, নাকি এমন সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরির দায়িত্বও এর মধ্যে পড়ে, যেখানে মানুষ মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারে?

মানবিক হস্তক্ষেপের নামে কতটা মানবিকতা?

পশ্চিমা শক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি হলো—কখনো কখনো মানবাধিকার রক্ষায় সামরিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। কিন্তু এখানেই উদ্দেশ্য ও ফলাফলের সংঘাত সবচেয়ে নির্মমভাবে দেখা যায়।

কসোভো, লিবিয়া, বসনিয়া, ইরাক ও আফগানিস্তানে সামরিক হস্তক্ষেপের সঙ্গে ব্যাপক বেসামরিক প্রাণহানির হিসাব যুক্ত হয়েছে। এসব সংখ্যার নির্দিষ্টতা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু মূল প্রশ্নটি সংখ্যার হিসাবের চেয়েও বড়: মানবাধিকার রক্ষার নামে এমন সামরিক পদক্ষেপ কি নৈতিকভাবে বৈধ, যার পরিণতিতে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু ও দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়?

কোনো যুদ্ধকে মানবিক বলা হলে তার মানবিক ফলাফলও পরিমাপ করতে হবে। শুধু ঘোষিত উদ্দেশ্য দিয়ে সামরিক শক্তির ব্যবহারকে ন্যায্যতা দেওয়া যায় না।

কারণ একটি দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়া, সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়া কিংবা সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হওয়া যদি হস্তক্ষেপের পরিণতি হয়, তাহলে ‘মানবিক হস্তক্ষেপ’ শব্দবন্ধটি নিজেই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

শক্তির নতুন ক্ষেত্র: প্রযুক্তি ও তথ্য

আধিপত্যের পুরোনো মাপকাঠি ছিল সেনাবাহিনী, অর্থ ও ভূখণ্ড। আজ তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তি। উন্নত প্রযুক্তি, তথ্য, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ এখন আন্তর্জাতিক ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

কোনো দেশকে প্রযুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করা, নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা কিংবা বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ সীমিত করার ক্ষমতা সামরিক শক্তির মতোই কার্যকর রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।

ফলে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা শুধু কে বেশি অস্ত্র বানায়, তা দিয়ে নির্ধারিত হবে না। কে প্রযুক্তি তৈরি করে, কে তার মান নির্ধারণ করে এবং কে অন্যদের সেই প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ দেয়—সেটিও নির্ধারণ করবে ক্ষমতার ভারসাম্য।

আধিপত্যের পতন মানেই ন্যায়বিচারের জয় নয়

সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি এখানেই। পশ্চিমা আধিপত্যের কাঠামো দুর্বল হচ্ছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্য যে বদলাচ্ছে, তা অস্বীকার করা কঠিন। চীনের উত্থান, এশিয়ার অর্থনৈতিক গুরুত্ব এবং পশ্চিমা জোটগুলোর ভেতরের স্বার্থগত টানাপোড়েন পুরোনো বিশ্বব্যবস্থাকে নতুন প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

কানাডার মতো পশ্চিমা বিশ্বের ঘনিষ্ঠ অংশীদারদের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের প্রকৃতি নিয়ে নতুন বিতর্ক দেখা দিয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে পুরোনো জোটগুলো ভেঙে পড়ছে। বরং এর অর্থ হলো, শক্তিশালী রাষ্ট্রের নেতৃত্ব মেনে নেওয়া আর তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিঃশর্তভাবে মেনে নেওয়া—এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হচ্ছে।

তবে এখানেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। পশ্চিমা আধিপত্য দুর্বল হলেই বিশ্ব ন্যায়সংগত হয়ে যাবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। একটি আধিপত্যের জায়গায় আরেকটি আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলে শুধু ক্ষমতার মালিক বদলাবে, কাঠামো বদলাবে না।

তাই ভবিষ্যতের প্রশ্ন ‘পশ্চিম না চীন’ নয়

আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো বিশ্বকে দুই শিবিরের সরল প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখা। প্রশ্নটি আসলে আরও মৌলিক।

বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলো কি এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে পারবে, যেখানে উন্নয়ন কেবল ধনী রাষ্ট্রগুলোর সম্পদ বৃদ্ধির নাম হবে না; যেখানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অপেক্ষাকৃত দুর্বল অর্থনীতির জন্যও ন্যায্য সুযোগ তৈরি করবে; যেখানে মানবাধিকার ব্যক্তির রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদাকেও গুরুত্ব দেবে; এবং যেখানে সামরিক শক্তি কূটনীতির বিকল্প হয়ে উঠবে না?

চীন ‘মানবজাতির অভিন্ন ভবিষ্যৎ’-এর যে ধারণা সামনে এনেছে, তার বাস্তব মূল্যায়নও এই একই মানদণ্ডে হওয়া উচিত। শুধু পশ্চিমের সমালোচনা করলেই কোনো নতুন ব্যবস্থা ন্যায়সংগত হয়ে যায় না। নতুন শক্তিকেও প্রমাণ করতে হবে যে তারা পুরোনো ক্ষমতার রাজনীতির পুনরাবৃত্তি করবে না।

অবশেষে প্রশ্নটি তাই চীন সঠিক কি না, পশ্চিম সঠিক কি না—এটি নয়। প্রশ্ন হলো, কোন বৈশ্বিক ব্যবস্থা মানুষের জন্য বেশি ন্যায়, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে পারে।

যদি কোনো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সাফল্যের মাপকাঠি হয় কেবল তার শক্তিশালী সদস্যদের সমৃদ্ধি, তাহলে সেটি বিশ্বব্যবস্থা হতে পারে, কিন্তু বিশ্বকল্যাণের ব্যবস্থা নয়।

আর পশ্চিমা আধিপত্যের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা সম্ভবত এখানেই।

জনপ্রিয় সংবাদ

রপ্তানি বাড়ছে, অর্ডার কমছে—বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের মুনাফা যাচ্ছে কোথায়?

পশ্চিমা আধিপত্য: বিশ্বকল্যাণের নেতৃত্ব, নাকি বৈষম্যের স্থায়ী কাঠামো?

০৭:৫১:০১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিশ্ব রাজনীতিতে পশ্চিমা নেতৃত্বকে দীর্ঘদিন এমন এক বাস্তবতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যার বিকল্প ভাবাই যেন অযৌক্তিক। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থা গণতন্ত্র, মানবাধিকার, মুক্তবাজার, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে দাঁড়িয়েছে—এটাই প্রচলিত বয়ান। কিন্তু কোনো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নৈতিকতা তার ঘোষিত উদ্দেশ্যে নয়, বরং তার বাস্তব ফলাফলে বিচার করা উচিত।

সেই জায়গা থেকেই প্রশ্নটি অস্বস্তিকর হলেও জরুরি: পশ্চিমা আধিপত্য কি সত্যিই বিশ্বকে আরও সমৃদ্ধ, ন্যায়সংগত ও নিরাপদ করেছে?

২০২৩ সালে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘মার্কিন আধিপত্য ও তার বিপদ’ শিরোনামে একটি নথি প্রকাশ করে। সেখানে অভিযোগ করা হয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও স্নায়ুযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং সামরিক শক্তির ব্যবহারও বেড়েছে। এই বক্তব্যকে শুধু চীনা প্রচারণা হিসেবে বাতিল করা সহজ। কিন্তু সহজ উত্তর সবসময় সঠিক উত্তর নয়। বরং পশ্চিমা ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই করতে হলে একই প্রশ্ন পশ্চিমের কাছেও ফিরিয়ে দিতে হবে—এই ব্যবস্থার সুফল কারা পেয়েছে, আর এর মূল্য কে দিয়েছে?

আধিপত্য কীভাবে কাজ করে

আধিপত্যকে শুধু শক্তিশালী রাষ্ট্রের দুর্বল রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বাস্তবে একটি আধিপত্যশীল রাষ্ট্রের সঙ্গে অন্য রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক অনেক বেশি জটিল। মিত্র রাষ্ট্রগুলো প্রায়ই নিজেদের স্বার্থেই শক্তিশালী রাষ্ট্রের নেতৃত্ব মেনে নেয়, কারণ জোটের ভেতরে থাকার ফলে তারা নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সুবিধা কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব পেতে পারে।

এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিমা ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় শক্তি। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এর পরিধি উন্নত ও উচ্চ আয়ের রাষ্ট্রগুলোকে ঘিরে; সামরিক ক্ষেত্রে ন্যাটো দীর্ঘদিন এর প্রধান স্তম্ভ। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও জাপানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চতুর্পক্ষীয় নিরাপত্তা সহযোগিতাও এই বৃহত্তর কৌশলগত কাঠামোর গুরুত্ব দেখায়।

কিন্তু এখানেই সমস্যার সূত্রপাত। যে রাষ্ট্রগুলো ব্যবস্থার ভেতরে আছে, তারা সুবিধা পেতে পারে; যারা বাইরে, তারা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়তে পারে। ফলে আধিপত্য শুধু ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নয়—এটি সুযোগেরও অসম বণ্টন।

বিশ্ব অর্থনীতির লাভ কার?

পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দাবিগুলোর একটি হলো—এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং কোটি কোটি মানুষের জীবনমান উন্নত করেছে। এ দাবির পক্ষে পরিসংখ্যানও রয়েছে। ১৯৮৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর মাথাপিছু আয় প্রায় আট গুণ বেড়েছে। একই সময়ে উচ্চ আয়ের দেশগুলোর বৃদ্ধি ছিল প্রায় দ্বিগুণ।

কিন্তু শতাংশের হিসাব দিয়ে বৈশ্বিক বৈষম্য বোঝা যায় না।

একই সময়ের দৈনিক মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনের পরিবর্তন দেখলে ব্যবধানটি অনেক বেশি স্পষ্ট হয়। উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে বৃদ্ধি ছিল ৫৪ দশমিক ৯১ ডলার, নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে মাত্র ৪ দশমিক ৩১ ডলার। জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধি ছিল মাত্র ২ দশমিক ৭০ ডলার।

অর্থাৎ দরিদ্র দেশগুলো হয়তো দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু ধনী দেশগুলো যে সম্পদগত সুবিধা নিয়ে শুরু করেছে, তার ব্যবধান কমছে না—বরং অনেক ক্ষেত্রে আরও বড় হচ্ছে।

এখানেই ‘নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা’ নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন ওঠে। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বৈশ্বিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। কিন্তু এগুলোর কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধনী রাষ্ট্রগুলোর প্রভাব যদি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে, তাহলে দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোর প্রয়োজন কতটা সমান গুরুত্ব পায়?

উন্নয়ন শুধু প্রবৃদ্ধির সংখ্যা নয়। প্রশ্ন হলো, প্রবৃদ্ধির ফল কে পাচ্ছে এবং কে পিছিয়ে থাকছে।Has Western hegemony harmed human welfare and increased global inequality?  Drawing on China's 2023 Ministry of Foreign Affairs document U.S. Hegemony  and Its Perils, Robert Walker, Emeritus Fellow of Green Templeton College,

মানবাধিকার: সর্বজনীন নাকি পশ্চিমা ব্যাখ্যা?

পশ্চিমা আধিপত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী নৈতিক যুক্তি মানবাধিকার। ব্যক্তি স্বাধীনতা, মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন থেকে সুরক্ষা আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। কিন্তু মানবাধিকারের ধারণাটিকেও যদি ইতিহাসের বাইরে রাখা হয়, তাহলে আমরা এর রাজনৈতিক বিবর্তনকে ভুলে যাব।

১৯৪৮ সালের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার সঙ্গে এলিনর রুজভেল্টের নাম ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। কিন্তু এর বুদ্ধিবৃত্তিক নির্মাণে চীনা কূটনীতিক পেং চুন চ্যাংয়ের ভূমিকাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি চেয়েছিলেন মানবাধিকারের ভাষা যেন কোনো একটি ধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। তাঁর দৃষ্টিতে মানুষের ‘বেঁচে থাকার অধিকার’ শুধু প্রাণধারণ নয়; একটি মর্যাদাপূর্ণ ও ভালো জীবনযাপনের অধিকারও এর অংশ।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে পশ্চিমা মানবাধিকার ভাবনায় ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ক্রমশ কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে, আর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের প্রশ্ন তুলনামূলকভাবে দুর্বল অবস্থানে চলে যায়। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের আন্তর্জাতিক আইনি স্বীকৃতিও ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত প্রতিরোধের মুখে ছিল। উন্নয়নের অধিকারকে আইনি মর্যাদা দেওয়ার ক্ষেত্রেও পশ্চিমা অনীহা ছিল।

এখানে একটি মৌলিক নৈতিক প্রশ্ন রয়েছে। একজন মানুষকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দেওয়া হলো, কিন্তু তাকে যদি দারিদ্র্য, বৈষম্য ও সুযোগের অভাব থেকে মুক্ত করার কোনো সামাজিক নিশ্চয়তা না দেওয়া হয়, তাহলে তার স্বাধীনতার বাস্তব মূল্য কতটা?

মানবাধিকার কি কেবল রাষ্ট্রের হাত থেকে ব্যক্তিকে রক্ষা করার বিষয়, নাকি এমন সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরির দায়িত্বও এর মধ্যে পড়ে, যেখানে মানুষ মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারে?

মানবিক হস্তক্ষেপের নামে কতটা মানবিকতা?

পশ্চিমা শক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি হলো—কখনো কখনো মানবাধিকার রক্ষায় সামরিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। কিন্তু এখানেই উদ্দেশ্য ও ফলাফলের সংঘাত সবচেয়ে নির্মমভাবে দেখা যায়।

কসোভো, লিবিয়া, বসনিয়া, ইরাক ও আফগানিস্তানে সামরিক হস্তক্ষেপের সঙ্গে ব্যাপক বেসামরিক প্রাণহানির হিসাব যুক্ত হয়েছে। এসব সংখ্যার নির্দিষ্টতা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু মূল প্রশ্নটি সংখ্যার হিসাবের চেয়েও বড়: মানবাধিকার রক্ষার নামে এমন সামরিক পদক্ষেপ কি নৈতিকভাবে বৈধ, যার পরিণতিতে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু ও দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়?

কোনো যুদ্ধকে মানবিক বলা হলে তার মানবিক ফলাফলও পরিমাপ করতে হবে। শুধু ঘোষিত উদ্দেশ্য দিয়ে সামরিক শক্তির ব্যবহারকে ন্যায্যতা দেওয়া যায় না।

কারণ একটি দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়া, সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়া কিংবা সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হওয়া যদি হস্তক্ষেপের পরিণতি হয়, তাহলে ‘মানবিক হস্তক্ষেপ’ শব্দবন্ধটি নিজেই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

শক্তির নতুন ক্ষেত্র: প্রযুক্তি ও তথ্য

আধিপত্যের পুরোনো মাপকাঠি ছিল সেনাবাহিনী, অর্থ ও ভূখণ্ড। আজ তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তি। উন্নত প্রযুক্তি, তথ্য, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ এখন আন্তর্জাতিক ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

কোনো দেশকে প্রযুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করা, নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা কিংবা বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ সীমিত করার ক্ষমতা সামরিক শক্তির মতোই কার্যকর রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।

ফলে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা শুধু কে বেশি অস্ত্র বানায়, তা দিয়ে নির্ধারিত হবে না। কে প্রযুক্তি তৈরি করে, কে তার মান নির্ধারণ করে এবং কে অন্যদের সেই প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ দেয়—সেটিও নির্ধারণ করবে ক্ষমতার ভারসাম্য।

আধিপত্যের পতন মানেই ন্যায়বিচারের জয় নয়

সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি এখানেই। পশ্চিমা আধিপত্যের কাঠামো দুর্বল হচ্ছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্য যে বদলাচ্ছে, তা অস্বীকার করা কঠিন। চীনের উত্থান, এশিয়ার অর্থনৈতিক গুরুত্ব এবং পশ্চিমা জোটগুলোর ভেতরের স্বার্থগত টানাপোড়েন পুরোনো বিশ্বব্যবস্থাকে নতুন প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

কানাডার মতো পশ্চিমা বিশ্বের ঘনিষ্ঠ অংশীদারদের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের প্রকৃতি নিয়ে নতুন বিতর্ক দেখা দিয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে পুরোনো জোটগুলো ভেঙে পড়ছে। বরং এর অর্থ হলো, শক্তিশালী রাষ্ট্রের নেতৃত্ব মেনে নেওয়া আর তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিঃশর্তভাবে মেনে নেওয়া—এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হচ্ছে।

তবে এখানেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। পশ্চিমা আধিপত্য দুর্বল হলেই বিশ্ব ন্যায়সংগত হয়ে যাবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। একটি আধিপত্যের জায়গায় আরেকটি আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলে শুধু ক্ষমতার মালিক বদলাবে, কাঠামো বদলাবে না।

তাই ভবিষ্যতের প্রশ্ন ‘পশ্চিম না চীন’ নয়

আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো বিশ্বকে দুই শিবিরের সরল প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখা। প্রশ্নটি আসলে আরও মৌলিক।

বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলো কি এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে পারবে, যেখানে উন্নয়ন কেবল ধনী রাষ্ট্রগুলোর সম্পদ বৃদ্ধির নাম হবে না; যেখানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অপেক্ষাকৃত দুর্বল অর্থনীতির জন্যও ন্যায্য সুযোগ তৈরি করবে; যেখানে মানবাধিকার ব্যক্তির রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদাকেও গুরুত্ব দেবে; এবং যেখানে সামরিক শক্তি কূটনীতির বিকল্প হয়ে উঠবে না?

চীন ‘মানবজাতির অভিন্ন ভবিষ্যৎ’-এর যে ধারণা সামনে এনেছে, তার বাস্তব মূল্যায়নও এই একই মানদণ্ডে হওয়া উচিত। শুধু পশ্চিমের সমালোচনা করলেই কোনো নতুন ব্যবস্থা ন্যায়সংগত হয়ে যায় না। নতুন শক্তিকেও প্রমাণ করতে হবে যে তারা পুরোনো ক্ষমতার রাজনীতির পুনরাবৃত্তি করবে না।

অবশেষে প্রশ্নটি তাই চীন সঠিক কি না, পশ্চিম সঠিক কি না—এটি নয়। প্রশ্ন হলো, কোন বৈশ্বিক ব্যবস্থা মানুষের জন্য বেশি ন্যায়, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে পারে।

যদি কোনো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সাফল্যের মাপকাঠি হয় কেবল তার শক্তিশালী সদস্যদের সমৃদ্ধি, তাহলে সেটি বিশ্বব্যবস্থা হতে পারে, কিন্তু বিশ্বকল্যাণের ব্যবস্থা নয়।

আর পশ্চিমা আধিপত্যের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা সম্ভবত এখানেই।