০৪:০১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রপ্তানি বাড়ছে, অর্ডার কমছে—বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের মুনাফা যাচ্ছে কোথায়? ‘Belonging: A Journey of Love’: সোনিয়া গান্ধীর বহুল আলোচিত স্মৃতিকথা ১০ নভেম্বর ভারতে প্রকাশ সিলেটে প্রতিমন্ত্রীর অনুষ্ঠান বয়কট সাংবাদিকদের, বিএনপির বিরুদ্ধেও হয়রানির অভিযোগ বিএনপির মন্ত্রীদের মান্নার কড়া বার্তা: ‘সত্য বলুন, দম্ভ দেখাবেন না’ ভারী বৃষ্টিতে দিল্লি অচল, কনট প্লেস থেকে বিমানবন্দর পানির নিচে বিশ্বে খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ, বাড়ছে সরবরাহ ঝুঁকি বেলুচিস্তানে ৭২ ঘণ্টার অভিযানে ৪৮ ‘সন্ত্রাসী’ নিহত, দাবি পাকিস্তানের হৃদয় থেকে রান্না, স্বাস্থ্য থেকে মানুষের পাশে: উদ্ভিদভিত্তিক খাবারে বদলের গল্প চট্টগ্রামে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, ব্যবসায়ীকে ‘ছেলেমেয়ের লাশ ফেলে রাখার’ হুমকি ইসলামী ব্যাংকে এস আলম-সংশ্লিষ্ট ৮১.৯২ শতাংশ শেয়ার ফ্রিজের নির্দেশ হাইকোর্টের

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনা মোতায়েন, ফিলিস্তিনি বাড়ি ঘিরে সহিংসতা তীব্র

পশ্চিম তীরের কুসরা গ্রামে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের সঙ্গে কয়েক দিন ধরে চলা উত্তেজনা ও সহিংসতার মধ্যে বৃহস্পতিবার বিপুলসংখ্যক ইসরায়েলি সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। এর ফলে গ্রামটির বেশ কয়েকটি এলাকা কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। একই সময়ে ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর বাড়িঘর ঘিরে বসতিস্থাপনকারীদের হামলা এবং তাদের চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, কুসরা ও জালুদ গ্রামের কাছে বসতিস্থাপনকারীদের তৈরি দুটি অবৈধ ঘাঁটি তারা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এসব এলাকা পশ্চিম তীরের এমন একটি অংশে অবস্থিত, যেখানে ফিলিস্তিনি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং ইসরায়েলিদের সেখানে প্রবেশের কথা নয়। অবৈধ ঘাঁটি উচ্ছেদের সময় বসতিস্থাপনকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর একাধিকবার সংঘর্ষ হয়। ঘটনায় একজন ইসরায়েলিকে আটক করা হয়েছে।

তিনটি বাড়ি ঘিরে বসতিস্থাপনকারীদের অবরোধ

রোববার কুসরা গ্রামের প্রান্তে তিনটি ফিলিস্তিনি বাড়ির বাইরে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীরা তাঁবু গেড়ে অবস্থান নেয়। তারা বাড়িগুলোতে থাকা মানুষদের বাইরে যেতে এবং অন্যদের ভেতরে ঢুকতে বাধা দেয়। প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের এই গ্রামটি নাবলুস শহরের কাছে অবস্থিত।

অবরোধের শিকার বাড়িগুলোর অন্তত একটির মালিক একজন মার্কিন নাগরিক। ফলে ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সরাসরি সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে।

ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি জানিয়েছেন, জেরুজালেমে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস বিষয়টিতে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি মোকাবিলা করে অবরোধকারীদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে বলেও তিনি জানান।

হাকাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেন, একটি পরিবারকে ভয় দেখানো ও হয়রানি করার উদ্দেশ্যে যারা এমন ভয়াবহ কর্মকাণ্ড চালিয়েছে, তাদের আচরণ অত্যন্ত নিন্দনীয়।

পানি ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নের অভিযোগ

অবরুদ্ধ বাড়িগুলোর ভেতরে দুটি ফিলিস্তিনি পরিবার এবং তাদের পরিচিত পাঁচজন ইতালীয় নাগরিক আটকা পড়েছিলেন। তাদের মধ্যে থাকা ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, বসতিস্থাপনকারীরা কাছের একটি প্রবেশপথ বন্ধ করে দেয় এবং বাড়িগুলোর পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

কুসরার বাসিন্দা কুসাই আবু রিদি জানান, তিনটি বাড়িতে বসতিস্থাপনকারীরা ঘেরাও করার সময় মোট ১৪ জন আটকা পড়েছিলেন। এর মধ্যে দুটি বাড়ি হাসান পরিবারের এবং তৃতীয় বাড়িটি আবু রিদির ভাইয়ের, যিনি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন।

হাসান পরিবারের এক ভাই রিজক তার মা ও বোনের সঙ্গে একটি বাড়িতে থাকতেন। অন্য ভাই ইউসুফ তার স্ত্রী ও দুই ছোট মেয়েকে নিয়ে পাশের বাড়িতে থাকতেন। ইউসুফের স্ত্রী ও দুই মেয়েকে সোমবার অ্যাম্বুলেন্সে করে সরিয়ে নেওয়া হয়।

এরপর ১১ জন—ছয়জন ফিলিস্তিনি ও পাঁচজন ইতালীয়—বাড়ির ভেতরে খাবার ভাগ করে খেয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন।

আবু রিদি বলেন, পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। তারা বাড়ির ভেতরে আটকা থাকা অবস্থায় বসতিস্থাপনকারীরা বাড়িতে পাথর ছুড়ছিল।

রাতের আঁধারে বারবার হামলার অভিযোগ

কুসরার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক কয়েক মাসে গ্রামটি বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। কাছের এশ কোদেশ বসতি এলাকার অবৈধ ঘাঁটিগুলো থেকে আসা ইসরায়েলিরা নিয়মিত কুসরায় ঢুকে পড়ছে, সম্পত্তি নষ্ট করছে এবং স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের হয়রানি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

গত মাসেই বসতিস্থাপনকারীদের হামলার একটি ধারাবাহিক ঘটনার মধ্যে একটি নতুন নির্মিত মসজিদে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এর আগে কাছের তেল শহরে প্রাণঘাতী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল।

কিছু সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা মনে করেন, এসব সহিংসতা ফিলিস্তিনিদের নিজেদের জমি থেকে সরিয়ে দেওয়ার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ।

কুসরা গ্রামের প্রান্তে থাকা বাড়িগুলো এ ধরনের হামলার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। আবু রিদি জানান, গত দুই মাসে বসতিস্থাপনকারীরা বারবার রাতে এলাকায় ঢুকে বিদ্যুতের খুঁটিতে উঠে তার কেটে দিয়েছে। গ্রামবাসীরা প্রতিবার তার মেরামত করার পরও তারা আবার ফিরে এসে সেগুলো কেটে দিয়েছে।

পরিস্থিতি আরও সহিংস হয়ে উঠতে পারে—এই আশঙ্কায় আবু রিদির স্ত্রী কিছুদিন আগে শহরের ভেতরে থাকা পরিবারের অন্য একটি বাড়িতে চলে যান। সেখানে তিনি তুলনামূলক নিরাপদ থাকবেন বলে পরিবারটি মনে করেছিল।

কিন্তু ৪৮ বছর বয়সী আবু রিদি এবং তার ১৮ বছর বয়সী ছেলে নিজেদের বাড়ি পাহারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বসতিস্থাপনকারীরা যদি বাড়িটি অবরোধ করে, সেই আশঙ্কায় তারা মটরশুঁটি, সার্ডিন ও টুনার মতো সংরক্ষণযোগ্য খাবারও মজুত করে রাখেন।

রোববার সেই আশঙ্কাই বাস্তবে পরিণত হয়।

সেদিন আবু রিদির পাঁচজন ইতালীয় বন্ধু, যারা বিভিন্ন মানবাধিকার কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত, তাকে ও তার পরিবারকে সমর্থন জানাতে বাড়িতে এসেছিলেন। কিন্তু তারাও অবরোধের মধ্যে আটকা পড়েন।

Israel must stop killings and home demolitions in occupied West Bank | OHCHR

ভোরে সেনা অভিযান, বাড়ি ছাড়ার নির্দেশ

বৃহস্পতিবার ভোরের আগে আবু রিদি দেখতে পান, ইসরায়েলি সেনারা এলাকায় ব্যাপকভাবে ঢুকে পড়েছে এবং বসতিস্থাপনকারীদের অবৈধ ঘাঁটিগুলো ভেঙে ফেলতে শুরু করেছে।

স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সেনারা তার বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ে এবং তাকে ৩০ মিনিটের মধ্যে বাড়ি ছেড়ে যেতে বলে বলে আবু রিদি জানান।

তিনি কয়েক দিনের কাপড়, কিছু খাবার এবং বিদ্যুৎ সংরক্ষণের যন্ত্র একটি ব্যাগে ভরে পাশের রিজকের বাড়িতে চলে যান। সেখানে আগে থেকেই থাকা অন্য ১১ জনের সঙ্গে তাকেও আটকে থাকতে হয়।

কয়েক ঘণ্টা পর সেনাবাহিনী তাকে পরিবারের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেয়। আবু রিদির দাবি, ফিরে গিয়ে তারা দেখতে পান বাড়ির ভেতরের জিনিসপত্র তছনছ করা হয়েছে এবং বাড়ির নিরাপত্তা ক্যামেরাটিও অচল করে দেওয়া হয়েছে।

তবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ফিলিস্তিনিদের বাড়ি ছাড়ার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য, সেনাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যাতে বাসিন্দারা নিজেদের বাড়িতেই থাকেন। একই সঙ্গে ভেঙে দেওয়া বসতিস্থাপনকারীদের ঘাঁটির কাছের কোনো ফিলিস্তিনি বাড়ির ভেতরে সেনারা অভিযান চালাবে না বলেও নির্দেশ ছিল।

অবৈধ ঘাঁটি উচ্ছেদে সেনা-বসতিস্থাপনকারী সংঘর্ষ

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, বুধবার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত একটি পদাতিক ব্যাটালিয়ন এলাকায় পাঠানো হয়েছিল। একটি ব্যাটালিয়নে সাধারণত কয়েক শ সেনা থাকে। তাদের দায়িত্ব ছিল এলাকায় টহল দেওয়া এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

অবৈধ ঘাঁটি ভাঙতে গিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বসতিস্থাপনকারীদের কয়েক দফা সংঘর্ষ হয়।

ইসরায়েলি সরকারের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, বসতিস্থাপনকারীদের এ ধরনের আচরণ ইসরায়েল মেনে নেয় না এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে সেনাবাহিনী কাজ করছে।

তবে কুসরায় কয়েক দিন ধরে চলা অবরোধ এবং তা ঠেকাতে সেনাবাহিনীর কথিত ব্যর্থতা ইসরায়েলের ভেতরেও বিরল সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

সেনাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন

রোববার ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন বেতসেলেমের প্রকাশ করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ফিলিস্তিনি বাড়িগুলোর বাইরে বসতিস্থাপনকারীদের সঙ্গে ইসরায়েলি সেনারাও ইহুদি ধর্মীয় প্রার্থনায় অংশ নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এই দৃশ্যকে কেউ কেউ বসতিস্থাপনকারীদের প্রতি সেনাদের সহানুভূতির প্রমাণ হিসেবে দেখেছেন।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ভিডিওটির বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

পশ্চিম তীরে সম্প্রতি দায়িত্ব পালন করে ফেরা এক ইসরায়েলি রিজার্ভ সেনাও পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তার ভাষ্য, কর্তৃপক্ষ সমস্যাটিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে দিয়েছে। এর ফলে শেষ পর্যন্ত সাধারণ সেনাদের ওপরই বাড়তি চাপ পড়ছে।

তিনি বলেন, মানুষকে যা খুশি করতে দেওয়া হচ্ছে, আর শেষ পর্যন্ত সেই পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে সেনাবাহিনীকে।

বসতি সম্প্রসারণ ঘিরে বাড়ছে সংকট

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিরোধ ও সমালোচনা রয়েছে। কুসরার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই পুরোনো উত্তেজনাকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এখনো এসব ঘটনার বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। তার সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন মন্ত্রী নিজেরাই বসতিস্থাপনকারী এবং পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের প্রক্রিয়ায় তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

এদিকে কুসরায় ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর বাড়ি ঘেরাও, পানি ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নের অভিযোগ, পাথর নিক্ষেপ এবং সেনা মোতায়েন—সব মিলিয়ে পশ্চিম তীরে পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে উঠেছে। অবৈধ বসতি উচ্ছেদে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর পদক্ষেপ আপাতত উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা হলেও, স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ এবং বসতিস্থাপনকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষ পরিস্থিতির গভীর সংকটকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

রপ্তানি বাড়ছে, অর্ডার কমছে—বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের মুনাফা যাচ্ছে কোথায়?

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনা মোতায়েন, ফিলিস্তিনি বাড়ি ঘিরে সহিংসতা তীব্র

০৭:০৯:১৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬

পশ্চিম তীরের কুসরা গ্রামে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের সঙ্গে কয়েক দিন ধরে চলা উত্তেজনা ও সহিংসতার মধ্যে বৃহস্পতিবার বিপুলসংখ্যক ইসরায়েলি সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। এর ফলে গ্রামটির বেশ কয়েকটি এলাকা কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। একই সময়ে ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর বাড়িঘর ঘিরে বসতিস্থাপনকারীদের হামলা এবং তাদের চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, কুসরা ও জালুদ গ্রামের কাছে বসতিস্থাপনকারীদের তৈরি দুটি অবৈধ ঘাঁটি তারা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এসব এলাকা পশ্চিম তীরের এমন একটি অংশে অবস্থিত, যেখানে ফিলিস্তিনি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং ইসরায়েলিদের সেখানে প্রবেশের কথা নয়। অবৈধ ঘাঁটি উচ্ছেদের সময় বসতিস্থাপনকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর একাধিকবার সংঘর্ষ হয়। ঘটনায় একজন ইসরায়েলিকে আটক করা হয়েছে।

তিনটি বাড়ি ঘিরে বসতিস্থাপনকারীদের অবরোধ

রোববার কুসরা গ্রামের প্রান্তে তিনটি ফিলিস্তিনি বাড়ির বাইরে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীরা তাঁবু গেড়ে অবস্থান নেয়। তারা বাড়িগুলোতে থাকা মানুষদের বাইরে যেতে এবং অন্যদের ভেতরে ঢুকতে বাধা দেয়। প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের এই গ্রামটি নাবলুস শহরের কাছে অবস্থিত।

অবরোধের শিকার বাড়িগুলোর অন্তত একটির মালিক একজন মার্কিন নাগরিক। ফলে ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সরাসরি সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে।

ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি জানিয়েছেন, জেরুজালেমে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস বিষয়টিতে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি মোকাবিলা করে অবরোধকারীদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে বলেও তিনি জানান।

হাকাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেন, একটি পরিবারকে ভয় দেখানো ও হয়রানি করার উদ্দেশ্যে যারা এমন ভয়াবহ কর্মকাণ্ড চালিয়েছে, তাদের আচরণ অত্যন্ত নিন্দনীয়।

পানি ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নের অভিযোগ

অবরুদ্ধ বাড়িগুলোর ভেতরে দুটি ফিলিস্তিনি পরিবার এবং তাদের পরিচিত পাঁচজন ইতালীয় নাগরিক আটকা পড়েছিলেন। তাদের মধ্যে থাকা ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, বসতিস্থাপনকারীরা কাছের একটি প্রবেশপথ বন্ধ করে দেয় এবং বাড়িগুলোর পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

কুসরার বাসিন্দা কুসাই আবু রিদি জানান, তিনটি বাড়িতে বসতিস্থাপনকারীরা ঘেরাও করার সময় মোট ১৪ জন আটকা পড়েছিলেন। এর মধ্যে দুটি বাড়ি হাসান পরিবারের এবং তৃতীয় বাড়িটি আবু রিদির ভাইয়ের, যিনি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন।

হাসান পরিবারের এক ভাই রিজক তার মা ও বোনের সঙ্গে একটি বাড়িতে থাকতেন। অন্য ভাই ইউসুফ তার স্ত্রী ও দুই ছোট মেয়েকে নিয়ে পাশের বাড়িতে থাকতেন। ইউসুফের স্ত্রী ও দুই মেয়েকে সোমবার অ্যাম্বুলেন্সে করে সরিয়ে নেওয়া হয়।

এরপর ১১ জন—ছয়জন ফিলিস্তিনি ও পাঁচজন ইতালীয়—বাড়ির ভেতরে খাবার ভাগ করে খেয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন।

আবু রিদি বলেন, পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। তারা বাড়ির ভেতরে আটকা থাকা অবস্থায় বসতিস্থাপনকারীরা বাড়িতে পাথর ছুড়ছিল।

রাতের আঁধারে বারবার হামলার অভিযোগ

কুসরার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক কয়েক মাসে গ্রামটি বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। কাছের এশ কোদেশ বসতি এলাকার অবৈধ ঘাঁটিগুলো থেকে আসা ইসরায়েলিরা নিয়মিত কুসরায় ঢুকে পড়ছে, সম্পত্তি নষ্ট করছে এবং স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের হয়রানি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

গত মাসেই বসতিস্থাপনকারীদের হামলার একটি ধারাবাহিক ঘটনার মধ্যে একটি নতুন নির্মিত মসজিদে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এর আগে কাছের তেল শহরে প্রাণঘাতী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল।

কিছু সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা মনে করেন, এসব সহিংসতা ফিলিস্তিনিদের নিজেদের জমি থেকে সরিয়ে দেওয়ার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ।

কুসরা গ্রামের প্রান্তে থাকা বাড়িগুলো এ ধরনের হামলার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। আবু রিদি জানান, গত দুই মাসে বসতিস্থাপনকারীরা বারবার রাতে এলাকায় ঢুকে বিদ্যুতের খুঁটিতে উঠে তার কেটে দিয়েছে। গ্রামবাসীরা প্রতিবার তার মেরামত করার পরও তারা আবার ফিরে এসে সেগুলো কেটে দিয়েছে।

পরিস্থিতি আরও সহিংস হয়ে উঠতে পারে—এই আশঙ্কায় আবু রিদির স্ত্রী কিছুদিন আগে শহরের ভেতরে থাকা পরিবারের অন্য একটি বাড়িতে চলে যান। সেখানে তিনি তুলনামূলক নিরাপদ থাকবেন বলে পরিবারটি মনে করেছিল।

কিন্তু ৪৮ বছর বয়সী আবু রিদি এবং তার ১৮ বছর বয়সী ছেলে নিজেদের বাড়ি পাহারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বসতিস্থাপনকারীরা যদি বাড়িটি অবরোধ করে, সেই আশঙ্কায় তারা মটরশুঁটি, সার্ডিন ও টুনার মতো সংরক্ষণযোগ্য খাবারও মজুত করে রাখেন।

রোববার সেই আশঙ্কাই বাস্তবে পরিণত হয়।

সেদিন আবু রিদির পাঁচজন ইতালীয় বন্ধু, যারা বিভিন্ন মানবাধিকার কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত, তাকে ও তার পরিবারকে সমর্থন জানাতে বাড়িতে এসেছিলেন। কিন্তু তারাও অবরোধের মধ্যে আটকা পড়েন।

Israel must stop killings and home demolitions in occupied West Bank | OHCHR

ভোরে সেনা অভিযান, বাড়ি ছাড়ার নির্দেশ

বৃহস্পতিবার ভোরের আগে আবু রিদি দেখতে পান, ইসরায়েলি সেনারা এলাকায় ব্যাপকভাবে ঢুকে পড়েছে এবং বসতিস্থাপনকারীদের অবৈধ ঘাঁটিগুলো ভেঙে ফেলতে শুরু করেছে।

স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সেনারা তার বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ে এবং তাকে ৩০ মিনিটের মধ্যে বাড়ি ছেড়ে যেতে বলে বলে আবু রিদি জানান।

তিনি কয়েক দিনের কাপড়, কিছু খাবার এবং বিদ্যুৎ সংরক্ষণের যন্ত্র একটি ব্যাগে ভরে পাশের রিজকের বাড়িতে চলে যান। সেখানে আগে থেকেই থাকা অন্য ১১ জনের সঙ্গে তাকেও আটকে থাকতে হয়।

কয়েক ঘণ্টা পর সেনাবাহিনী তাকে পরিবারের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেয়। আবু রিদির দাবি, ফিরে গিয়ে তারা দেখতে পান বাড়ির ভেতরের জিনিসপত্র তছনছ করা হয়েছে এবং বাড়ির নিরাপত্তা ক্যামেরাটিও অচল করে দেওয়া হয়েছে।

তবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ফিলিস্তিনিদের বাড়ি ছাড়ার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য, সেনাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যাতে বাসিন্দারা নিজেদের বাড়িতেই থাকেন। একই সঙ্গে ভেঙে দেওয়া বসতিস্থাপনকারীদের ঘাঁটির কাছের কোনো ফিলিস্তিনি বাড়ির ভেতরে সেনারা অভিযান চালাবে না বলেও নির্দেশ ছিল।

অবৈধ ঘাঁটি উচ্ছেদে সেনা-বসতিস্থাপনকারী সংঘর্ষ

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, বুধবার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত একটি পদাতিক ব্যাটালিয়ন এলাকায় পাঠানো হয়েছিল। একটি ব্যাটালিয়নে সাধারণত কয়েক শ সেনা থাকে। তাদের দায়িত্ব ছিল এলাকায় টহল দেওয়া এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

অবৈধ ঘাঁটি ভাঙতে গিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বসতিস্থাপনকারীদের কয়েক দফা সংঘর্ষ হয়।

ইসরায়েলি সরকারের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, বসতিস্থাপনকারীদের এ ধরনের আচরণ ইসরায়েল মেনে নেয় না এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে সেনাবাহিনী কাজ করছে।

তবে কুসরায় কয়েক দিন ধরে চলা অবরোধ এবং তা ঠেকাতে সেনাবাহিনীর কথিত ব্যর্থতা ইসরায়েলের ভেতরেও বিরল সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

সেনাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন

রোববার ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন বেতসেলেমের প্রকাশ করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ফিলিস্তিনি বাড়িগুলোর বাইরে বসতিস্থাপনকারীদের সঙ্গে ইসরায়েলি সেনারাও ইহুদি ধর্মীয় প্রার্থনায় অংশ নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এই দৃশ্যকে কেউ কেউ বসতিস্থাপনকারীদের প্রতি সেনাদের সহানুভূতির প্রমাণ হিসেবে দেখেছেন।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ভিডিওটির বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

পশ্চিম তীরে সম্প্রতি দায়িত্ব পালন করে ফেরা এক ইসরায়েলি রিজার্ভ সেনাও পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তার ভাষ্য, কর্তৃপক্ষ সমস্যাটিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে দিয়েছে। এর ফলে শেষ পর্যন্ত সাধারণ সেনাদের ওপরই বাড়তি চাপ পড়ছে।

তিনি বলেন, মানুষকে যা খুশি করতে দেওয়া হচ্ছে, আর শেষ পর্যন্ত সেই পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে সেনাবাহিনীকে।

বসতি সম্প্রসারণ ঘিরে বাড়ছে সংকট

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিরোধ ও সমালোচনা রয়েছে। কুসরার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই পুরোনো উত্তেজনাকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এখনো এসব ঘটনার বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। তার সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন মন্ত্রী নিজেরাই বসতিস্থাপনকারী এবং পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের প্রক্রিয়ায় তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

এদিকে কুসরায় ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর বাড়ি ঘেরাও, পানি ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নের অভিযোগ, পাথর নিক্ষেপ এবং সেনা মোতায়েন—সব মিলিয়ে পশ্চিম তীরে পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে উঠেছে। অবৈধ বসতি উচ্ছেদে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর পদক্ষেপ আপাতত উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা হলেও, স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ এবং বসতিস্থাপনকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষ পরিস্থিতির গভীর সংকটকেই সামনে নিয়ে এসেছে।